Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

যৌতুককে না বলুন

আ ব ম খোরশিদ আলম খান | প্রকাশের সময় : ৯ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

বিয়ের সময় বা আগে-পরে কনে পক্ষ থেকে জোরাজুরি করে টাকা ও নানা জিনিস বর পক্ষ কর্তৃক গ্রহণ করার নামই হচ্ছে যৌতুক। এই যৌতুক প্রথা আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যৌতুকবিরোধী আইন আছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা ও ফাঁক-ফোকরও রয়েছে। যৌতুকবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়ায় যৌতুকের অভিশাপ থেকে নিষ্কৃতি মিলছে না। যৌতুকের গøানি থেকে দেশ, সমাজ ও লাখো গরিব কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে মুক্তি দিতে আজ থেকে দশ বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে যৌতুকবিরোধী আন্দোলন ও গণসচেতনতা সৃষ্টির বড় জিম্মাদারি নিজ কাঁধে নেন দেশের প্রথিতযশা বরেণ্য আলেমে দ্বীন পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরী (মুজিআ)। আজ চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে ১০ম বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আল্লামা নূরীর আহŸানে যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ।
অনেকেই বলে থাকেন, চট্টগ্রাম সবার আগে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চট্টগ্রাম দেশ ও জাতিকে পথ দেখিয়েছে। পাকিস্তানি জান্তা সরকারের হাতে গ্রেফতার হবার আগে ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম বেতার থেকেই প্রচারিত হয়েছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনেও চট্টগ্রাম ছিল পথিকৃতের ভূমিকায়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় সুন্নি উলামায়ে কেরাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরাসরি অবদান রাখেন। চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিকতার পীঠস্থান মাইজভাÐার দরবার শরিফ ছিল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মুক্তিকামী মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাইজভাÐারী মাশায়েখ ও মহাত্মাগণ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি হিসেবে দেশবাসীকে প্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে সামাজিক ব্যাধি যৌতুকবিরোধী ও নারী নিগ্রহবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে চট্টগ্রামের নাম নতুন করে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। আর এই ইতিহাসের অনুঘটক হলেন কীর্তিমান আলেমে দ্বীন ও বক্তা পীরে তরিকত আল্লামা মুহাম্মদ আবুল কাশেম নূরী (মজিআ)। তাঁর সূচিত যৌতুকবিরোধী আন্দোলন ও গণসচেতনতা তৈরির এ গণমুখী গরিববান্ধব পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে জনপ্রশংসা কুড়াচ্ছে। আল্লামা নূরী হয়ে উঠেছেন লাখো গরিব মানুষের পথ নির্দেশক। তাঁর আহŸানে সাড়া দিয়ে এই দশ বছরে হাজার হাজার যুবক যৌতুকমুক্ত বিয়ে সম্পন্ন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় প্রতিনিয়ত হাজার হাজার গরিব পরিবারে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ-দুর্দশা নেমে আসছে। দেশে প্রতিদিন শত শত সংসার ভাঙছে। যৌতুকের শিকার অসংখ্য কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারের কান্না-আহাজারি কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। গরিব ঘরের মেয়েদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায়। অথচ বিয়ের পিঁড়িতে বসার সুযোগ তাদের হয় না। গরিব মা-বাবারা নিজেদের মেয়েকে সঠিক সময়ে উপযুক্ত পাত্রের হাতে পাত্রস্থ করতে না পেরে গভীর মর্মপীড়ায় ভুগলেও এর প্রতিকার মেলে না। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সামর্থ্য নেই গরিব মা-বাবাদের। ফলে নিত্য আহাজারি-আর্তনাদ চলছে ঘরে ঘরে। যৌতুকের অভিশাপে গরিব পরিবারে নেমে আসে ঘোর অনিশ্চয়তা ও গাঢ় অমানিশা। সমাজ বা রাষ্ট্র এই গরিব পরিবারগুলোকে উদ্ধারে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। তবে আশার কথা, যৌতুকের এই সামাজিক ব্যাধি থেকে অসহায় ও বিপর্যস্ত গরিব পরিবারগুলোকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন আল্লামা আবুল কাশেম নূরী (মুজিআ)। দ্বীনি কর্তব্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক দায়িত্ব পালনের তাগাদা থেকেই সূচিত আল্লামা নূরীর এ যৌতুকবিরোধী আন্দোলন দেশে বেশ সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
যৌতুক দেয়া-নেয়া বিরাট একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও কেউ বাধ্য হয়ে যৌতুক দিচ্ছে। কেউ জোরাজুরির মাধ্যমে কনেপক্ষ থেকে যৌতুক আদায় করে নিচ্ছে। ধরুন, আপনার পরিবারে তিনজন ছেলে আছে। আছে তিনজন মেয়ে। ছেলের বিয়ের সময় কনে পক্ষ থেকে যৌতুক নেবেন ভালো কথা। কিন্তু আপনারও তো কন্যা সন্তান আছে। মেয়ের বিয়ের সময় পাত্র পক্ষ যদি আপনার কাছ থেকে যৌতুক দাবি করে আপনি কী হাসিমুখে যৌতুক দিতে প্রস্তুত থাকবেন? নিশ্চয়ই আপনি যৌতুক দিতে চাইবেন না। ছেলের বাবা-মা হয়ে ছেলের ক্ষেত্রে যৌতুক চাইবেন, আর মেয়েকে যখন পাত্রস্থ করতে চাইবেন, তখন কীভাবে যৌতুক না দেয়া যায় এই ফন্দি-ফিকির করবেনÑ তা তো কখনো মেনে নেয়া যায় না। এই দ্বিমুখী আচরণ কেন? অতএব, যৌতুক দেয়া-নেয়াকে ঘৃণা করতে শিখুন। ‘যৌতুক দেবো না, যৌতুক নেবো না’Ñ এই দৃপ্ত শপথ নিন। যৌতুকমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা গড়তে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখুন। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে আল্লামা নূরীর আহŸানে এবং তাঁরই হাতে গড়া সংগঠন আনজুমানে রজভীয়া নূরীয়া বাংলাদেশ-এর ব্যবস্থাপনায় প্রথম যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। মহাসমাবেশ থেকে বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়ে আসছেন আল্লামা নূরী (মুজিআ)। যৌতুকবিহীন বিয়েকে উৎসাহিত করতে সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ম্যারেজ ফান্ড গঠন, যৌতুকবিহীন বিয়েতে আগ্রহী যুবকদের জন্য সরকারি ব্যাংক থেকে বিনা সুদে পাঁচ বছর মেয়াদে দুই/তিন লাখ টাকা ঋণ প্রদান, বরের সামর্থ্য অনুযায়ী মোহরানা নির্ধারণ এবং বিয়ের সময় স্ত্রীকে নগদে মোহরানা পরিশোধের ব্যবস্থা করা, লোক দেখানো অপরিশোধযোগ্য ২০/৩০ লাখ টাকা মোহরানা নির্ধারণের প্রচলিত প্রথা বর্জন, কনের বাড়িতে হাজার হাজার বরযাত্রীর ভোজন পরিহার করা এবং ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী বর পক্ষ কর্তৃক সামর্থ্য অনুযায়ী ওয়ালিমার বিধান জারি, দেশের গণমাধ্যমে তথা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় যৌতুক, নারী নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন ও মাদকের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া, এসব সামাজিক কুসংস্কার সম্পর্কে মসজিদে মসজিদে ইমাম খতিব কর্তৃক মুসল্লিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, যৌতুকমুক্ত বিয়ে সম্পাদনকারী ছেলে-মেয়েদের সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার প্রদান, ইউনিয়ন পরিষদ, ওয়ার্ড ও সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে যৌতুকমুক্ত বিয়ে সম্পাদনকারীদের জন্য বিশেষ সনদ প্রদানের ব্যবস্থা আজ জনদাবিতে রূপ নিয়েছে। উক্ত সামাজিক কুসংস্কারসমূহ বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং যুগোপযোগী বাস্তবানুগ আইন প্রণয়নের দাবি আজ জোরালো হয়ে উঠেছে।
যৌতুকবিরোধী আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়–ক এবং অসহায় গরিব পরিবারগুলোর নীরব ক্রন্দন ও আহাজারি থামাতে আল্লামা আবুল কাশেম নূরীর মতো প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষসহ অন্যান্য আলেমরাও এগিয়ে আসবে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যৌতুক

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
২ জানুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন