Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

শেতাঙ্গ বর্ণবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৭ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৪ এএম


নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটো মসজিদে ব্রাশফায়ার করে মুসলমানদের হত্যার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী ব্রেন্টন ট্যারান্টকে আদালতে হাজির করলে তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং তাকে উদ্ধত এবং অহংকারি হিসেবে দেখা যায়। হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় তাকে আদালতে হাজির করা হলেও সে হাসছিল এবং আঙ্গুল দিয়ে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণবাদী প্রতীক দেখায়। মানুষের মধ্যে শেতাঙ্গরা শ্রেষ্ঠ, এটা যারা মনে করে, তারা আঙ্গুলের মাধ্যমে বিশেষ চিহ্ন তৈরি করে প্রতীক হিসেবে তার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বৃদ্ধা ও তর্জনি আঙ্গুল বৃত্তাকারে একসঙ্গে যুক্ত করলে ইংরেজি অক্ষর ‘পি’-এর আকৃতি হয়, যা দিয়ে পাওয়ার বা শক্তি বোঝানো হয়। আর বাকি তিনটি আঙ্গুল তখন ‘ডবিøও’- এর রূপ নেয়, যা দিয়ে বোঝানো হয় হোয়াইট বা সাদা। ২৮ বছর বয়সী ট্যারান্টকে আদালতে হাজির কারার পর সে এই অহংকার প্রকাশ করে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে মসজিদে ঢুকে ব্রাশফায়ার করে নির্বিচারে উল্লাসের মাধ্যমে মুসলমান হত্যার এমন ঘটনা দেখা যায়নি। হত্যাকারী ঠান্ডা মাথায় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হত্যাযজ্ঞের পুরো ঘটনা ফেইসবুকে সরাসরি স¤প্রচার করাসহ ইন্টারনেটে ছড়িয়েছে বর্ণবাদী, অভিবাসী বিদ্বেষী, উগ্র ডানপন্থি বার্তা। হামলা চালানোর আগে ট্যারেন্ট তার টুইটার অ্যাকাউন্টে ৭৩ পৃষ্ঠার একটি কথিত ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে। সেখানে সে নিজেকে বর্ণনা করেছে ভাষায়, সংস্কৃতিতে, রাজনৈতিক বিশ্বাস আর দর্শনে, আত্মপরিচয়ে এবং বংশপরিচয়ে একজন ইউরোপীয় হিসেবে। ম্যানিফেস্টোতে সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রা¤পকে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছে। হামলার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে নিজের অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে। নিজেকে এথনোন্যাশনালিস্ট এবং ফ্যাসিস্ট হিসেবেও বর্ণনা করেছে। এই মাইন্ডসেটের মানুষ ইউরোপসহ শেতাঙ্গ বিশ্বে যে আরো অনেক রয়েছে, পূর্ব লন্ডনের একটি মসজিদের বাইরে একজন মুসল্লীকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার ঘটনা তার প্রমাণ। নিউজিল্যান্ডের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর শেতাঙ্গ দুর্বৃত্তরা সেখানে এ হামলা চালায়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান বিশ্বে মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি হত্যা, গণহত্যা, নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অন্য কোনো সম্প্রদায়কে এতো বেশি বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে না। হত্যাকারীরা যেন টার্গেটই করেছে পৃথিবী থেকে মুসলমানদের নাম-নিশানা মিটিয়ে ফেলার। গত প্রায় দু’ বছর ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ইতিহাসের যে বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে, তার নজর নেই। এ ঘটনা নিয়ে সারাবিশ্বে তীব্র প্রতিবাদ উঠলেও মিয়ানমার সরকার কোনো তোয়াক্কা করছে না। এ পরিস্থিতির মধ্যেই নিউজিল্যান্ডে ঘটল ইতিহাসের আরেক ঘৃণ্যতম মুসলমান নিধনের ঘটনা। হত্যাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্ট মসজিদে হামলা চালিয়ে মুসলমানদের হত্যা করে গর্ববোধ করছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন পৈশাচিক ঘটনা এখন যেন অনেকটা নিয়মিত হয়ে উঠছে। বিশ্বের প্রভাবশালী কিছু দেশ আবার মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য একশ্রেণীর বিপদগামী মুসলমানদের দিয়ে মুসলমান নিধনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বহুল আলোচিত আইএস সৃষ্টির পেছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে, এটি এখন ওপেন সিক্রেট। আবার নিউজিল্যান্ডে মসজিদে যে সন্ত্রাসী ব্রাশফায়ার করে মুসলমানদের হত্যা করল, সে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শ্বেতাঙ্গ নীতি এবং অভিবাসনবিরোধী নীতির অনুসারী। উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল নীতি ছিল উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদকে জাগিয়ে দেয়া এবং অভিবাসীদের বিতাড়ন এবং ঢুকতে না দেয়া। বলা যায়, তার বর্ণবিদ্বেষী ও অভিবাসনবিরোধী নীতি এক উগ্রবাদের জন্ম ও ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়েছে। তার এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রসহ সারাবিশ্বের শ্বেতাঙ্গদের মধ্য উগ্রবাদী সন্ত্রাসে উৎসাহ যোগাচ্ছে। তারই ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া এখন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র শ্বেতাঙ্গরা তাদের আভিজাত্য প্রকাশ করতে বর্ণবাদের আশ্রয় নিয়ে অশ্বেতাঙ্গদের ওপর হামলা ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। সর্বশেষ নিউজিল্যাণ্ডের ঘটনা ঘটল। বলা বাহুল্য, সারাবিশ্বে এখন উগ্র ডানপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টানদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বিশ্বের বিভিন্ন সরকার প্রধান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উগ্রবাদী নীতি। তাদের বক্তব্য এবং নীতি দ্বারা একশ্রেণীর ধর্মান্ধ কিংবা বর্ণবাদী প্রভাবিত হচ্ছে। আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও মিয়ানমারের দিকে তাকাই তবে দেখা যাবে দেশগুলোর সরকার প্রধানদের নীতি ও বক্তব্যে উগ্রবাদীরা বিশেষভাবে উৎসাহী ও অনুপ্রাণিত হয়ে উঠছে এ প্রবণতা যদি চলতে থাকে তবে সারাবিশ্বে উগ্রবাদীদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ কোনোভাবেই বন্ধ হবে না।
যে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে সন্ত্রাসী হামলা বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। এটা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের পারস্পরিক সহবস্থান এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে বিনষ্ট ও ধ্বংস করে। হিংসা, বিদ্বেষ, সন্দেহ, অরাজকতা বাড়িয়ে দেয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানদের মুখ থেকে শান্তির বাণী উচ্চারিত হতে হবে এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু তাদের কথা দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়, তাই তাদের উচিত হবে এমন নীতি গ্রহণ না করা যা উগ্রবাদকে উস্কে দেয়। তারা এগিয়ে না এলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। তাই অনতিবিলম্বে এ ব্যাপারে তাদের কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। বহু বছর ধরেই সারাবিশ্বে মুসলমানরা উগ্রবাদীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে প্রভাবশালী মুসলমান দেশগুলো খুব একটা কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেনি। নেতৃত্বে দুর্বল তাই এর কারন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোগান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলমানদের প্রতিনিধি হয়ে উঠার ভূমিকায় রয়েছেন। তবে তার একার ভূমিকা যথেষ্ট নয়। অন্যান্য প্রভাবশালী মুসলমান দেশের রাষ্ট্র প্রধানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। যে কোনো ধরনের উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সন্ত্রাস


আরও
আরও পড়ুন