Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬, ১৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

মৃতপ্রায় নবগঙ্গা! চলছে দখলের মহোৎসব

আতিয়ার রহমান, নড়াইল থেকে : | প্রকাশের সময় : ২১ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৩ এএম | আপডেট : ১২:১৩ এএম, ২১ মার্চ, ২০১৯

স্নিগ্ধ স্রোতস্বিণী নবগঙ্গার সেই জৌলুস আর নেই। নেই তার তর্জন-গর্জন। দখল, দূষণ আর নাব্য সঙ্কটে পড়ে নবগঙ্গা নদী অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। পরিনত হয়েছে সরু খালে। চলছে ধান ও পাটের চাষাবাদ। দেশের আইন-কানুন নবগঙ্গার জন্য কার্যকর হয় না। অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে নবগঙ্গা ধুকছে। মৃতপ্রায় নদীর তালিকায় স্থান পেয়েছে এককালের প্রমত্বা নবগঙ্গা নদী। 

নদীর ইতিহাস থেকে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা মোহনা হতে শুরু হয়ে ঝিনাইদহ ও মাগুরা হয়ে নড়াইলের ওপর দিয়ে লোহাগড়ার শেষ প্রান্ত মহাজন বাজারে মধুমতি নদীতে মিশেছে নবগঙ্গা। নবগঙ্গার মোট দৈর্ঘ্য ২৩০ কিলোমিটার। মাগুরা থেকে প্রবাহমান হয়ে তৎকালীন নড়াইল জেলার বৃহৎ নলদী পরগনায় মিঠাপুরের মধ্যে দিয়ে গাঢ় নীল রংয়ের পানির নবগঙ্গা নদী প্রবাহিত হয়।
নলদী-লোহাগড়া হয়ে একমুখ মধুমতির সাথে এবং আরেক মুখ বড়দিয়া কালিয়া হয়ে চিত্রার সাথে মিশে প্রবাহমান নবগঙ্গা একসময়ে এই অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুখের সাথী হয়েই ছিলো।
গত ৩৫ বছরের মধ্যে সরকারি নানা প্রকল্প আর এলাকার সুবিধাবাদী মানুষের ক্ষপ্পড়ে পড়ে সরু থেকে সরু হতে থাকে এক সময়ের ¯্রােতস্বিনী নবগঙ্গা। বর্তমানে মহাজন, লক্ষীপাশা, নলদী, মিঠাপুর বাজার এলাকায় নদী সচল থাকলেও নবগঙ্গার কুন্দশী এলাকা থেকে মহাজন এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটারের অবস্থা এতটাই সঙ্গীন যে, অনেক এলাকায় নবগঙ্গা শুকিয়ে পায়ে চলা সরু পথে পরিণত হয়ে পড়েছে। বর্ষায় নদী চলাচলের উপযোগী থাকলেও অন্য সময় একবারেই বন্ধ হয়ে যায় ।
নবগঙ্গা নদীর লোহাগড়া বাজারের সেতুর পাশে চর বানিয়ে সরকারিভাবে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সেখানে তৈরি করা হয়েছে নানা প্রতিষ্ঠান, লোহাগড়া পৌরভবন নির্মাণের জন্য বালি ভরাঁ করে জমি তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। লোহাগড়া বাজারের দুই পাড়ে টোং ঘর তুলে নদী দখল করে ব্যবসা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এছাড়া নদীর জায়গায় ঘর তুলে বসবাসও করছেন অনেকে। নদীর বিভিন্ন এলাকায় মরে যাওয়া অংশে সরকারিভাবে গড়ে উঠেছে আশ্রায়ন প্রকল্প।
নদীর জায়গায় এই আশ্রয়ন প্রকল্প গড়ে উঠার ব্যপারে স্থানীয়ভাবে বাধা দিলেও সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের ক্ষমতার কাছে হার মেনেছে নবগঙ্গা পাড়ের মানুষেরা! নদীর জায়গার আরো কয়েকটি স্থানে শ্রেণি পরিবর্তন করে তৈরি হয়েছে আশ্রায়ন প্রকল্পের বাড়ি আর গুচ্ছগ্রাম। এভাবে নবগঙ্গা নদী বাঁচাতে স্থানীয়ভাবে চেষ্টা চালালেও নদী পাড়ের ভ‚মিখেকোদের দখলে দিন দিন অস্থিত্ব হারাতে বসেছে এক সময়ের খর¯্রােতা নবগঙ্গা।
নদী শাসন করে অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে বসতবাড়িসহ কাঁচা-পাকা বিভিন্ন স্থাপনা। নদীর মাঝখান পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে নদী থেকে মাটি কেটে ভরাট করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। প্রভাবশালীরা ঘের বানিয়ে করছেন মাছ চাষ।
নদীর বুকে নানা স্থাপনা গড়ে তুলছেন যে যার ইচ্ছেমতো। সম্প্রতি নবগঙ্গা নদীর চর-মল্লিপুর নামক স্থানে ৫ একর জায়গা জুড়ে বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করছেন একজন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা। নদীর মধ্যে খাসজমি দখল করে তিনি আলাদাভাবে পাড় বেঁধে সেখানে বড় বড় পাঁচটি পুকুর কেটে ২কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প তৈরি করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পাড়ে সরকারিভাবে ভ‚মিহীনদের ইজারা দেয়া জমি স্বল্পমূল্যে ক্রয় করেছেন পুলিশ কর্মকর্তার ভাই। তার দাবি তিনি ব্যক্তি মালিকানার জমি ক্রয় করে বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নদীর জমিসহ ভিতরে থাকা ২০ ফুট দীর্ঘ হালট (রাস্তা)সহ সকল জমি দখল করে নির্মাণ কাজ করে চলেছে এই চক্রটি। পার্কের মালিক পুলিশ কর্মকর্তা হলেও নির্মাণ কাজ দেখাশোনা করেন ছোটভাই মাসুদুর রহমান। তিনি জানান, আমি আমাদের ক্রয়কৃত এবং পৈত্রিক জমিতে কাজ করছি, কোন অনৈতিক কাজ করছি না।
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অবঃ শিক্ষক শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা অর্থের দাপটে নদী দখল করে নানা কিছু করতে চাচ্ছেন। এতে করে স্থায়ীভাবে নদী দখল হয়ে গেলে তা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
নদীর জায়গা দখল করে পার্ক নির্মাণ বিষয়ে স্থানীয়রা লোহাগড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) এম এম আরাফাত হোসেনকে জানালে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, এটা নিয়ে অনেক রাজনৈতিক চাপ আছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মহোৎসব


আরও
আরও পড়ুন