Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার বেহাল

এইচ এম আব্দুর রহিম | প্রকাশের সময় : ২৩ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে। সংসদেও কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। তবে এটা দুঃখজনক যে, সংসদে কোনো বিরোধী দল নেই। বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কতটা কার্যকর হয়ে উঠে তা এক বিরাট প্রশ্ন উঠেছে। নামমাত্র বিরোধী দল আছে। সেটাকে বলা যায়, সরকারি বিরোধী দল। দেশের উন্নয়ন যেমন দরকার, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে দেশের সকল কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালিত করতে গেলে গণতন্ত্রও জরুরি। একই সঙ্গে সুশাসনে জোর দিতে হবে। গণতন্ত্র ও সুশাসন একটির সঙ্গে আরেকটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন এসবই জনগণের একান্ত চাওয়া। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত রাজনৈতিক এবং বিরোধী দল হচ্ছে বিএনপি। দলটি নানাভাবে চাপে আছে। ঠিকমত আন্দোলন করতে পারছে না। বিগত দশ বছর এর নেতাকর্মীদের রাস্তায় দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাচনে সাধারণ মানুষের খুব বেশি উৎসাহ আছে কি? বলতে পারি না। কারণ, যে ধরনের একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, এরপর আর কোনো নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা থাকতে পারে না। নির্বাচনের আমেজ উৎসাহ একেবারে কমে গেছে। উপজেলা নির্বাচনে অনেক জায়গায় কোনো প্রতিদ্ব›দ্বী নেই। সেখানে সরকারি দলের প্রার্থীরা এমনিতে জয় পেয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি তো নির্বাচন করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। দুয়েকজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রাথী স্বতন্ত্র পার্থী হিসেবে নির্বাচন করছে। বাংলাদেশে এখন আর গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে না। নির্বাচনী পরিবেশ এখন আর নেই। ফলে ভবিষ্যতে রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে তা বলা যায় না। গণতন্ত্র না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। সার্বিক বিষয় এখন সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে। সুষ্ঠুভাবে এখন গণতান্ত্রিক কোনো কিছু সম্পন্ন হওয়া খুবই কঠিন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে গণতন্ত্র থাকবে। একটির সাথে আর একটির যোগসূত্র ওতপ্রোত। কোনোটাই সেভাবে আর বর্তমানে নেই। দেশ এগিয়ে যাবে। যে যা কিছুই বলুক, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র দরকার। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশ আরো এগিয়ে যাবে। তখন উন্নয়নটা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, আমাদের গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত থাকুক। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ কথা বলার স্বাধীনতা পাবে। রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি আসবে। আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা, আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার গুণগত মান, বিকেন্দ্রীয়করণ, স্থানীয় সরকার, অবাধ তথ্য প্রবাহ ও মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণ ইত্যাদি সুশাসনের অপরিহার্য উপাদান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, সংসদীয় কাঠামো এবং সরকারি প্রশাসনের কার্যকারিতার মধ্যে সুশাসন নিশ্চিত হয়।
ডিসেন্বর অনুুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে এবং এ অনিয়মের প্রতিবাদে সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং বিএনপির ছায়ায় গঠিত জাতীয় ঐক্যফন্টসহ অন্যান্য বিরোধীদল আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে চলমান উপজেলা নির্বাচনে মূলত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই অংশ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান পদে দলীয়ভাবে মনোনয়ন দিলেও ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে কাউকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি। অর্থাৎ দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে ভোটারবিহীনভাবে। এমতাবস্থায় উপজেলা নির্বাচনের পরবর্তী ধাপগুলোতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা সমর্থক প্রার্থীদের অধিক সংখ্যায় বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনে রাজধানীবাসীর মধ্যে কোনো আগ্রহ-উচ্ছ্বাস ছিল না। পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে সেটাই দেখা যাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার ওপর আস্থা হারিয়েছে জনগণ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বহু দলীয় অংশগ্রহনমূলক তথা প্রতিদ্বন্দি¦তামূলক নির্বাচনের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-২০১৮ মেয়াদে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) আইন, ২০১৫; উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) আইন ২০১৫ এবং স্থানীয় সরকার (সিটির্কপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০১৫ এর মাধ্যমে কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতার যোগ্য ঘোষণা করা হয়। তবে উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদকেও এ শ্রেণিভুক্ত করা হয়। ফলে এসব অনুষ্ঠানে নির্দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যের অবসান ঘটে। এসব আইন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকার এসব আইনের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে। অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদে নির্বাচনকে দলীয়করণ করার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সমাজের বিশিষ্টজনেরা। বিএনপি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী পদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ‘সরকারের দুরভিসন্ধি’ বলে আখ্যায়িত করে। নেতিবাচক দিকগুলো বহিঃপ্রকাশ প্রত্যক্ষ করার জন্য বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের সন্ত্রাস, ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদি অনৈতিক কাজ স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্ব নিম্নস্তর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামী লীগ মনোনীত শতাধিক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীকে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া এবং জমা দেয়ার পর তা প্রত্যাহারে বাধ্য করাকে শাসকদল মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য মূলত দায়ী করা হয়। আওয়ামী লীগ প্রণীত জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ (২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সংশোধিত) এর অধীনে ২০১৬ সালের ডিসেন্বরে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের ধাঁচে অনুষ্ঠিত হয় জেলা পরিষদ নির্বাচন। সবশেষে বলতে হয়, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানিকরণ ও বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন- সে নির্বাচন জাতীয়ই হোক আর স্থানীয় পর্যায়েই হোক। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বহু দলীয় ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাবে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সূচকে আমরা পিছিয়ে আছি। লন্ডন ভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রকাশিত ‘ডেমোক্র্যাসি ইন্ডেক্স ২০১৮ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ডেমোক্র্যাসি ইন রিট্রিট; ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ন্ড শীর্ষক প্রতিবেদন বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সূচকে আমাদের পিছিয়ে পড়ার প্রমাণ বহন করে। জাতীয় এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বহুদলীয় ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং দেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্বীকৃত অধিকারগুলো রক্ষার মাধ্যমে আমরা এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে পারি।
লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: গণতন্ত্র

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন