Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

নতুন লোগোয় মুছে গেল কংগ্রেস, ম্লান গেরুয়া

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২২ মার্চ, ২০১৯, ৮:২১ পিএম

দেওয়াল লিখন, পোস্টার, ফ্লেক্স, ব্যানারে আস্তে আস্তে ভরে উঠছে পশ্চিমবঙ্গের মহল্লা, রাস্তাঘাট, বাজার। সর্বাগ্রে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারার সুবাদে সে লড়াইয়ে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে এগিয়ে তৃণমূল। আর তৃণমূলের প্রচারে উজ্জ্বল ভাবে লক্ষণীয় এক বড়সড় পরিবর্তন। বদলে গিয়েছে তৃণমূলের লোগো। তেরঙা দাপট ঘুচিয়ে নীল-সাদা আভা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে জোড়াফুল প্রতীকটাকে ঘিরে। সযত্নে বাড়ানো হয়েছে সবুজ রঙের উপস্থিতি। আর দলের জন্মের একুশ বছরের মাথায় লোগো থেকে খসে গিয়েছে ‘কংগ্রেস’ শব্দটা। মোটা হরফে একটাই শব্দ— তৃণমূল। তার নীচে লেখা হয়েছে ‘আমার, আপনার, বাংলার’।

সচেতন ভাবেই যে বদলানো হয়েছে দলের লোগো, সে বিষয়ে তৃণমূলের প্রায় সব স্তরই কিন্তু ওয়াকিবহাল। ফলে গ্রাম-গ্রামান্তরেও প্রচারে-লিখনে নতুন নকশা ব্যবহার করতে ভুল হচ্ছে না কর্মীদের। ১৯৯৮ সালে দলের আত্মপ্রকাশের সময়ে লোগো তৈরি হয়েছিল যাঁর হাতে, ২১ বছর পরে এই নতুন লোগোর নেপথ্যেও কিন্তু সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়েরই মস্তিষ্ক। সে কাজে তাকে সাহায্য করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই নতুন লোগোর তাৎপর্য অনেক, একসঙ্গে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সর্বাগ্রে চোখে পড়ে দলের লোগো থেকে ‘কংগ্রেস’ শব্দটার হারিয়ে যাওয়া। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু কংগ্রেসের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তিনি ছাড়েননি। দলের নামে এবং প্রতিটি শাখা সংগঠনের নামে কংগ্রেসের সদর্প উপস্থিতি ছিল। বাংলায় তৃণমূলটাই আসল কংগ্রেস— জোর গলায় এ কথাও বলা হত। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন বার বার। কিন্তু দলের পালে বাতাস ধরে রাখার জন্য কংগ্রেসি রাজনীতির প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার প্রয়োজন যে আর নেই, সে কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গিয়েছেন খুব স্পষ্ট ভাবেই। তাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় দলের নাম যা-ই থাক, লোগোয় এখন থেকে শুধুই ‘তৃণমূল’ থাকবে— সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পেরেছেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন আজকের কংগ্রেসের সঙ্গে নিজের দলের পরিচিতি গুলিয়ে যাওয়ার কোনও অবকাশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারেই রাখতে চান না। তৃণমূল যে এখন একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনীতির নাম, তৃণমূল যে এখন একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, যে অস্তিত্বের সর্বাধিনায়িকার নাম সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রিত্বের চর্চাতেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক— সে কথাই বুঝিয়ে দিতে চান তৃণমূল নেতৃত্ব বরং।
কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে কংগ্রেসকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছেন— এমন নেতা বা নেত্রী বিরল। নেহরু-গান্ধী পরিবারের উজ্জ্বল উত্তরাধিকারী ইন্দিরা গান্ধী যে সাফল্য পেয়েছিলেন কংগ্রেস ভেঙে, সেই সাফল্যের উদাহরণ অন্য কোনও পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় নয় বলেই বিশ্লেষকদের মত। ইন্দিরার কংগ্রেসই মূল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাওয়ার পর থেকে যারা কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল গড়েছেন, তারা নিজেদের হালে কতটুকু পানি পেয়েছেন, তা কারও অজানা নয়। এদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। শুধু পালে বাতাস টানতে পারা নয়, নিজের রাজ্যে কংগ্রেসকে বহু যোজন পিছনে ফেলে দিয়েছেন তিনি।
শরদ পওয়ারের মতো দুঁদে রাজনীতিক কংগ্রেস ভেঙে এনসিপি তৈরি করেছিলেন। পওয়ারের নিজের রাজ্য মহারাষ্ট্রে তার দল সাফল্য পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু এনসিপি কখনও মহারাষ্ট্রে কংগ্রেসের চেয়ে বড় দল হয়ে উঠতে পারেনি। বরং অধিকাংশ সময়টাতেই কংগ্রেসের জোটসঙ্গী হয়ে থেকেছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের কংগ্রেস ঘনিষ্ঠতা আরও বেশি করে চোখে পড়েছে।
রাজীব জমানায় কংগ্রেস ছাড়তে প্রায় বাধ্য হয়েছিলেন ইন্দিরার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী প্রণব মুখোপাধ্যায়। ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন প্রণব। কিন্তু কোনও দাগ কাটতে পারেনি সে দল। ১৯৮৯ সালে প্রণব ফিরে যান কংগ্রেসে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ই একমাত্র নেত্রী যিনি নিজের রাজ্যে কংগ্রেসি রাজনীতির প্রধান উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন অত্যন্ত উজ্জ্বল ভাবে। পাঁচ-সাত বছর নয়, টানা ২১ বছর ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে বাংলায় তিনি কংগ্রেসকে বহু পিছনে ফেলে দিতে পেরেছেন। ২০১১ সালে তার দেওয়া শর্তে কংগ্রেসকে জোট গড়তে বাধ্য করেন মমতা এবং ৩৪ বছরের বাম শাসন শেষ করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রিত্বে আসীন হওয়ার পর থেকে কিন্তু অনুচ্চারিত ভাবে নতুন যুগের সূচনা হয়ে গিয়েছে তৃণমূলে। বামপন্থী ঘরানার লোকজনকেও অক্লেশে তৃণমূলে ঠাঁই দিতে শুরু করেছেন মমতা। কখনও স্লোগানে, কখনও সরকারি নীতিতে, কখনও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বাংলার জন্য বিশেষ কিছু আদায়ের তাগিদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান বার বার মিলে যেতে শুরু করেছে বামেদের সঙ্গে। ফলে বামপন্থী হিসেবে পরিচিত বাঙালি বিদ্বজ্জনদের একটা বড় অংশকেই পাশে টানতে সক্ষম হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত আট বছরে সেই বৃত্ত প্রায় সম্পূর্ণ করে বাংলার সব শ্রেণির আশা-আকাঙ্খার প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে তৃণমূল।
নতুন লোগোর নেপথ্যে সম্ভবত ক্রিয়াশীল ছিল সেই চেষ্টাও। ‘আমার, আপনার, বাংলার’— এই স্লোগানেই কিন্তু নিহিত গোটা বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে তৃণমূলকে তুলে ধরার প্রয়াস। বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্খা নিয়ে একমাত্র তৃণমূলই ভাবে, বাংলার সব শ্রেণির নাগরিকদের আশা-আকাঙ্খা পূরণের সক্ষমতা একমাত্র তৃণমূলেরই রয়েছে— এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা তো রয়েইছে। বাংলার জন্য বিজেপি-কে প্রয়োজন নেই, বাঙালি সমাজের অন্তর্লীন চেতনার সঙ্গে বিজেপির ভাবধারা মেলে না, বিজেপি আসলে এ রাজ্যে বহিরাগত এবং মূলত মোদী-শাহের মতো বহিরাগতদের ভরসাতেই বিজেপি বাংলায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে— সুকৌশলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এই বার্তাও। বলছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু তৃণমূল শুধু বাংলায় তো লড়বে না। অসম, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে তৃণমূল প্রার্থী দিচ্ছে। ‘আমার, আপনার, বাংলার’— এই স্লোগান তো ওই সব রাজ্যে চলবে না। সে ক্ষেত্রে লোগো কী রকম হবে? তৃণমূল সূত্রের খবর, দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি মাথায় রেখেই ওই সব রাজ্যের জন্য লোগো তৈরি হবে।
মার্চের প্রথম সপ্তাহেই নতুন লোগোটা প্রকাশ করে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়া পেজের ডিসপ্লে পিকচারে জ্বলজ্বল করে ওঠে নতুন লোগো। একে একে তৃণমূলের সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নতুন রঙে রেঙে উঠতে শুরু করে। সব শেষে প্রার্থীতালিকা প্রকাশের দিন কালীঘাটের তৃণমূল দফতরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ারের পিছনের দেওয়ালে বড় করে দেখা দেয় নতুন লোগো, নতুন রং, নতুন স্লোগান। বৈদ্যুতিক ভোটযন্ত্রে দলের নতুন লোগো দেখা যাবে না। সেখানে সাদা-কালো জোড়াফুলই থাকবে। কিন্তু কর্মী-সমর্থকদের কতটা পছন্দ হয়েছে এই নতুন লোগো, তা দেওয়াল লিখন বা ফ্লেক্স-ব্যানারে চোখ রাখলেই স্পষ্ট। নির্বাচনে কতটা ছাপ ফেলে নতুন লোগোর বার্তা, ২৩ মে মিলবে সে উত্তর।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারত


আরও
আরও পড়ুন