Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৫ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে হবে

জালাল উদ্দিন ওমর | প্রকাশের সময় : ৩১ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

খেলাপী ঋণ সময়ের সাথে সাথে কেবল বাড়ছে তো বাড়ছেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে দেশে মোট খেলাপী ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৩৯১১ কোটি টাকা আর একই সময়ে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ ৯,১১,৪৩০ কোটি টাকা। সুতরাং, মোট বিতরণকৃত ঋণের ১০.৩০ % খেলাপী। ২০১৪ সালে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০১৫৫ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ৫১৩৭১ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে এর পরিমাণ ৬২১৭২ কোটি টাকা, আর ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭৪৩০৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে খেলাপী ঋণের হার ছিল ৯.৩১ শতাংশ, সেটা ২০১৮ সালে হয়েছে ১০.৩০ শতাংশ। তাছাড়া ২০১৮ সালে ব্যাংকগুলো প্রায় ২০০০০ কোটি টাকা ঋণ পুন তফশিল করেছে, যা নিয়মিত ঋণ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। তা না হলে খেলাপী ঋণের পরিমাণ আরো বাড়ত। এর বাইরে ব্যাংকগুলোতে রাইট অফ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৫০০০ কোটি টাকা, যা ব্যালেন্সশিটে অন্তর্ভুক্ত নয়। সময়ের সাথে সাথে এই রাইট অফ করা ঋণের পরিমাণ ও বাড়ছে, যা ব্যাংকগুলো আদায় করতে পারছে না। ব্যাংকগুলো প্রতি বছর বিশাল অংকের খেলাপী ঋণকে রাইট অফ করে এবং তা ব্যালেন্সশিট থেকে বাদ দেয়। রাইট অফ করা এই ঋণ ব্যাল্যান্সশিটের অন্তর্ভুক্ত থাকে না বিধায়, তা খেলাপী ঋণ হিসাবে ব্যাংকগুলো প্রকাশ করে না। যদি রিসিডিউল এবং রাইট অফ করা ঋণ হিসাব করা হয়, তাহলে এই খেলাপী ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে। এই খেলাপী ঋণের ভারে ব্যাংকগুলো এখন আক্রান্ত এবং অর্থনীতি মন্দা। খেলাপী ঋণের বোঝা বহন করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ও বাধাগ্রস্থ হয়েছে। তাই যে কোনো মূল্যে খেলাপী ঋণের পরিমাণকে কমিয়ে আনতে হবে।
ব্যাংকসমূহ ঋণ প্রদানের মাধ্যমেই মূলত আয় করে থাকে। কিন্তু গ্রাহক যখন এই ঋণ নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করে না, তখন তা খেলাপী ঋণে পরিণত হয়। এই অবস্থায় ব্যাংকের কোনো আয় তো হয়ই না, অধিকন্তু মূল টাকাটাই গ্রাহকের হাতে আটকে থাকে। ফলে খেলাপী ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যায় এবং ব্যাংকগুলোতে সৃষ্টি হয় দায়বদ্ধতা। খেলাপী ঋণ ব্যাংকগুলোর গতিকে পুরোপুরি স্তিমিত করে রাখে। কারণ এই বিশাল পরিমাণ টাকা থেকে একদিকে ব্যাংক যেমন কোনো প্রকার আয় করতে পারে না, ঠিক তেমনি এই ঋণ অনাদায়ী হবার কারণে তা নতুন করে অন্য কোনো সেক্টরে বিনিয়োগও করতে পারে না। ফলে ব্যাংকের আয় কমে যায়, বিনিয়োগ কমে যায় এবং ব্যাংকের আর্থিক গতিশীলতাও কমে যায়। অপরদিকে এই খেলাপী ঋণের বিপরীতে আয় থেকে প্রভিশন রাখতে হয় বিধায়, ব্যাংকের আয়ের বিশাল একটি অংশ খেলাপী ঋণের ঘাটতি মেটাতে ব্যয় করতে হয়। এক্ষেত্রে খেলাপী ঋণের পরিমাণ যদি ব্যাংকের আয়ের সমান হয় তাহলে আয়ের পুরোটাই প্রভিশন ঘাটতির পিছনে ব্যয় করতে হয়। এ অবস্থায় ব্যাংকের কোনো আয় অবশিষ্ট থাকে না। অপরদিকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ যদি ব্যাংকের আয়ের চেয়ে বেশি হয় সেক্ষেত্রে ব্যাংক ক্ষতির অবস্থানে থাকে। ফলে ব্যাংকসমূহ আয় করেও তা ভোগ করতে পারে না। এ অবস্থায় ব্যাংকের অবস্থা দিন দিন নাজুক থেকে নাজুকতর হতে থাকে। খেলাপী ঋণের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোতে বহুদিন থেকেই স্থবিরতা চলছে। একইভাবে খেলাপী ঋণের কারণে অনেক বেসরকারি ব্যাংক ও সমস্যার মধ্যে আটকা পড়েছে। সুতরাং খেলাপী ঋণ কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে। খেলাপী ঋণের কারণে ব্যাংকের ডিপোজিটররা তাদের ন্যায্য লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ এসব টাকা এদেশের হাজার লক্ষ কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষদের কষ্টার্জিত। আর এসব টাকা আজ গুটি কয়েক মানুষের পকেটে ঢুকে আছে। বাংলাদেশে আজ যত টাকা খেলাপী ঋণ আছে, তা যদি খেলাপী না হতো, তাহলে শুধুমাত্র এই টাকা দিয়ে দেশে হাজারো স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, হাসপাতাল এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেত।
ব্যাংকগুলোর অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, বাচবিচারহীনভাবে ঋণ প্রদান এবং কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের টার্গেট অনেক সময় খেলাপী ঋণ সৃষ্টির জন্য দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের চাপে একটি প্রজেক্টের গুরুত্ব এবং ভবিষ্যত যথাযথভাবে বিবেচনা না করে ঋণ প্রদান করা হয়। অধিকন্তু ঋণ গ্রহীতা ঋণের টাকা পুরোপুরিভাবে ঐ প্রজেক্টের উন্নয়ন এবং পরিচালনায় ব্যয় করছে কিনা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা মনিটরিং করে না। ফলে একজন গ্রাহক তার গ্রহণকৃত ঋণ থেকে বিরাট একটি অংশ অন্য কাজে যেমন জমি কেনা, দামী গাড়ি কেনা এবং বিলাসবহুল বাড়ী তৈরির জন্য ব্যয় করে। ফলে প্রয়োজনীয় এবং পুরোপুরি অর্থ যথাযথভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যয় না হবার কারণে উক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে উৎপাদনে যেতে পারে না। এতে ঐ শিল্প দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঋণগ্রহীতা যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারে না। এ অবস্থায় খেলাপী ঋণের সৃষ্টি হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ গ্রহণ করার সময় ঐ প্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। সুতরাং অতিরিক্ত ঋণ প্রদান শুরুতেই খেলাপী ঋণের সুযোগ সৃষ্টি করে। এদিকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা ও ব্যাংকের পরিচালকদের প্রভাব খেলাপী ঋণ সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী। সরকারি ব্যাংকগুলোতে সিবিএ এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রভাব সৃষ্টি করে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সিবিএ এবং রাজনৈতিক প্রভাব না থাকলেও এখানে প্রভাব বিস্তার করে ব্যাংকের প্রভাবশালী পরিচালকরা। ফলে অনেক সময়ে যথাযথ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান না করে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পিছনে ঋণ প্রদান করা হয়। এইসব ঋণ সময়ের ব্যবধানে খেলাপী ঋণে পরিণত হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া অত্যাধিক মুনাফা অর্জনের টার্গেট এবং মুনাফা অর্জনের অসম প্রতিযোগিতা ও খেলাপী ঋণ সৃষ্টির জন্য দায়ী। তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাবও খেলাপী ঋণ সৃষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ী। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে না, শিল্পকারখানা ঠিকমত চলে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী/শিল্পপতিরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারা ব্যাংকের ঋণ ঠিকমত পরিশোধ করতে পারে না। যার কারণে ঋণখেলাপীর সৃষ্টি হয়। খরা, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ব্যবসায়ীরা যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখনো তার প্রভাবে খেলাপী ঋণের সৃষ্টি হয়। সরকারের ট্যারিফ নীতির কারণেও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে খেলাপী ঋণের সৃষ্টি হয়।
এদিকে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে ঋণ খেলাপীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত আইন নেই। অর্থাৎ আইনের আশ্রয় নিয়ে খেলাপী ঋণ আদায় করাটা কষ্টকর। এ অবস্থায় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংক কর্মকর্তা খেলাপী ঋণ আদায়ের জন্য প্রচন্ড চাপে থাকে। একই সাথে ব্যাংক কর্মকর্তাকে ঋণ গ্রহীতার প্রভাবকে মোকাবেলা করতে হয়, যা আরো কষ্টকর। অধিকন্তু খেলাপী ঋণ আদায়ের জন্য আদালতে মামলা করা হলেও তা চলতেই থাকে এবং মীমাংসা হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। খেলাপী ঋণ আদায়ের জন্য সরকার অর্থ ঋণ আদালত গঠন করলেও তা খেলাপী ঋণ আদায়ে খুব একটা গতি আনতে পারেনি। মামলা বেশি হবার কারণে এখানেও জট লেগে আছে। তাছাড়া অর্থ ঋণ আদালতের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ব্যাংকগুলোতে খেলাপী ঋণ বেড়ে যাবার কারণে অর্থ ঋণ আদালতে মামলার সংখ্যা এখন অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলো খেলাপী ঋণ আদায় করতে পারছে না আর এক্ষেত্রে ঋণখেলাপীরা সুবিধা পাচ্ছে। অপরদিকে নিলামের মাধ্যমে বন্ধকীকৃত সম্পদ বিক্রি করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। বন্ধকীকৃত সম্পত্তি বিক্রির জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিলাম/দরপত্র আহবান করা হলেও তা অধিকারে যেতে পারবে না মনে করে ক্রেতারা কিনতে কম আগ্রহ দেখায়। কোনো ক্রেতা আগ্রহী হলেও তিনি ঐ সম্পত্তির জন্য অপেক্ষাকৃত কম মূল্য দিতে চায়। ফলে খেলাপী ঋণ যথাযথভাবে আদায় করাটা সম্ভব হয় না আর এর পরিমাণ কেবল বাড়তেই থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই), কর্তৃক ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯২ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। একই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২০১৭ সালের ১ মে প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলাপিং কান্ট্রিজ: ২০০৫-২০১৪’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এক অর্থ বছরে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ১০০০ (এক হাজার) কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর জিএফআই কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫৫৮৮ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ২০০৪ সালে ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪১০ কোটি ডলার,২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার,২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার, ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ডলার এবং ২০১৩ সালে ৯৬৭ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এসব অর্থ বাংলাদেশিরা বিদেশে পাচার করেছে। যদি ১ ডলারের গড় মূল্য ৭৫ টাকা হিসাব করা হয়, তাহলে ২০০৪-২০১৩ এই দশ বছরে পাচার হওয়া অর্থের বাংলাদেশি টাকায় পরিমাণ ৪১৯১০০ (চার লক্ষ উনিশ হাজার একশত) কোটি টাকা এবং গড়ে প্রতি বছর পাচার হওয়া অর্থের বাংলাদেশি মান ৪১৯১০ কোটি টাকা। আর শুধুমাত্র ২০১৪ সালে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ১০০০ কোটি ডলার, যার গড় মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ৭৫০০০ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেহেতু প্রতিবছরই অর্থ পাচার হয়েছে। সুতরাং, অর্থ পাচারের এই ধারা ২০১৫-১৬-১৭ সালেও অব্যাহত থাকাটা স্বাভাবিক। এদিকে ২০১৪ সালের জুন মাসে ইউএনডিপি কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির আকারের প্রায় ৩০ শতাংশ। সে হিসাবে গত চার দশকে প্রায় ৩ (তিন) লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই অর্থ যে এদেশের বড় বড় শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীরা পাচার করেছে সে বিষয়ে তো সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কারণ, এদেশের সাধারণ মানুষেরা অর্থ পাচারের কথা কল্পনাও করতে পারে না। এই সব টাকা যে ব্যাংক থেকে গ্রহণ করা ঋণেরই একটি অংশ, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে ব্যাংকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে এবং নতুন খেলাপী ঋণ সৃষ্টির পথকে বন্ধ করতে হবে। এ জন্য নতুন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে এই ঋণকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব, সিবিএ প্রভাব এবং পরিচালকদের প্রভাবমুক্ত না হলে তা কখনো সম্ভব নয়। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। অধিকন্তু অর্থ ঋণ আদালতসহ আইনী প্রক্রিয়াকে আরো উন্নত এবং সংস্কার করতে হবে, যাতে আইনের সাহায্য নিয়ে খেলাপী ঋণ আদায় করা যায় এবং ঋণখেলাপীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। তাছাড়া গ্রাহককে যেন তেন প্রকারে ঋণ প্রদান করে মুনাফা অর্জনের টার্গেট ব্যাংকগুলোকে পরিহার করতে হবে। মুনাফা অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ব্যাংককিং সেক্টরকে বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি করেছে। ব্যাংকগুলোকে তার ঋণ নীতিমালা পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তাদের ঋণকে বিভিন্ন সেক্টরে বণ্টন করতে হবে। তাছাড়া ব্যাংকগুলোর ঋণ/বিনিয়োগের বিপরীতে বিদ্যমান সুদ/মুনাফার হার আরো অনেক কমাতে হবে। বর্তমানে এই হার বছরে ১৪-১৫ %। বাস্তবতা হচ্ছে ১৪-১৫ % সুদ/মুনাফায় ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ গ্রহণ করে ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন করা এবং ব্যাংকের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করা আসলেই একটা কঠিন ব্যাপার। একজন উদ্যোক্তা যদি ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে এবং সুদের হার যদি ১৫%ও হয়, তাহলে বছরে শুধুমাত্র ব্যাংককে তারে পরিশোধ করতে হচ্ছে সুদ বাবদ ১৫ লক্ষ টাকা। তার অফিস ভাড়া মেশিনারী, স্টাফ খরচ, বিদ্যুত, গ্যাস এবং অন্যান্য খরচ তো রয়েছেই। এসব পরিশোধের পর তার আয়। সুতরাং, ঐ উদ্যোক্তাকে টিকে থাকতে হলে কমপক্ষে ৪০% মুনাফা করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে এমন ব্যবসা খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টকর, যেখানে এত বেশি মুনাফা আছে। তাছাড়া ব্যবসায় কিন্তু সবসময় মুনাফা হয় না। সুতরাং ঋণ/বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যাংকের সুদ/মুনাফার হার কমাতে হবে এবং সেটার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০%। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে সৎ এবং যোগ্য ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিতে হবে। কারণ অভিজ্ঞতা সবসময় যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ না হলে এবং অর্থনীতির গতি প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান ও দূরদর্শিতা না থাকলে তাদের পক্ষে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ব্যাংকিং খাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া কখনো সম্ভব নয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ বিষয় সতর্ক না হলে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপী ঋণ কমবে না, ব্যাংকে উন্নয়ন ও গতিশীলতা আসবে না। একই সাথে অর্থনীতির চাকা ও গতিশীল হবে না। তাই ব্যাংকিং সেক্টর ও একই সাথে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে খেলাপী ঋণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : প্রকৌশলী ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ঋণ

১২ জুন, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ