Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০১৯, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৪ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

বনানী ট্র্যাজেডি নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মহিউদ্দিন খান মোহন | প্রকাশের সময় : ৮ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

দুর্ঘটনা আমাদের পিছু ছাড়ছে না। একের পর এক দুর্ঘটনা দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। নিয়তিতে বিশ্বাসীরা মনে করেন, আমরা কোথাও কোনো বড় ধরনের পাপ করে ফেলেছি। তাই বিধাতা আমাদেরকে শাস্তি দিচ্ছেন। যারা বাস্তববাদী তারা বলছেন, কিছু মানুষের অন্যায় অপরাধের অনিবার্য শিকার হচ্ছে নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। এই যে গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ার নামের বহুতল ভবনটিতে আগুন লেগে ২৬ জন আদম সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু হলো, শতাধিক আহত হয়ে মরণযন্ত্রণা ভোগ করল, এজন্য দায়ী কে বা কারা? যে মানুষগুলো আগুনের লেলিহান শিখার শিকার হয়ে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে জীবন দিল, আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানা শুয়ে সে বিভীষিকার কথা ভেবে বারবার আঁৎকে উঠছে, তাদেরই বা কী দোষ ছিল। হ্যাঁ, তাদেরও দোষ ছিল। সেটা তাদের কপাল দোষ। নাহলে ওই অভিশপ্ত দালানে তারা কাজ করতে যাবে কেন? 

এফআর টাওয়ারে কীভাবে আগুন লেগেছিল তা এখনও জানা যায়নি। অগ্নিকান্ডের পর ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের যে তদন্ত কমিটি হয়েছে তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর জানা যাবে এই ভয়াবহ আগুনের কারণ। এ রকমই বলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তা যে কারণেই আগুন লেগে থাকুক, এটা স্পষ্ট যে, আগুন থেকে ওই ভবন ও সেখানে অবস্থানরতদের রক্ষা করার কোনো রকম ব্যবস্থাই সেখানে ছিল না। অবশ্য তদন্তকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবনটির অষ্টম তলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং সম্ভবত তা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে। যে কারণে বা যেভাবেই আগুন লেগে থাকুক, দুর্ঘটনা মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এফআর টাওয়ারে ছিল না। ফায়ার সার্ভিস ও অন্য যেসব কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাগণ অগ্নিকান্ডের পর ভবনটি পরিদর্শন করেছেন, তারা বলেছেন, এ ক্ষেত্রে নির্মানকারী কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা ও উদাসীনতা অমার্জনীয়। ভবনটি নির্মানে যে অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হেেয়ছে তা আর লুকানো নেই। রাজউক ওই জায়গায় ১৮তলা ভবন নির্মানের অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ২৩তলা বানিয়েছে। এখন রাজউক বলছে উপরের পাঁচ তলা নির্মানের ক্ষেত্রে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ন কোনো অনুমতি নেয়নি। তবে, রূপায়নের পক্ষ থেকে কোম্পানিটির মুখপাত্র গত ৩১ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, তারা রাজউকের বৈধ অনুমোদন নিয়েই ২৩ তলা ভবনটি নির্মান করেছেন। তাদের কাছে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আছে বলেও দাবি করেছেন তিনি । কিন্তু তদন্ত দলের বরাত দিয়ে গত ৪ এপ্রিলের পত্রিকার খবরে বলা হয়েে ছ, রূপায়ন কর্তৃপক্ষ ২৩ তলার অনুমোদনের নকশার ফটোকপি জমা দিলেও রাজউকের নথিতে সে নকশার অস্তিত্ব নেই। রূপায়নকে মূল নকশা জমা দেয়ার জন্য বলা হলেও তারা সেটা দেখাতে পারেন নি।
এদিকে দুর্ঘটনার দুইদিন পর গত ৩০ মার্চ রাতে ভবনটির জমির মালিক ইঞ্জিনিয়ার ফারুক ও রূপায়নের কাছ থেকে ২০, ২১ ও ২৩তলার ক্রেতা কাশেম ড্রাই সেল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসবিরুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়নের মালিক লিয়াকত আলী মুকুল অগ্নিকান্ডের পরদিনই সিঙ্গাপুরে চলে গেছেন। লিয়াকত আলী মুকুল কীভাবে দেশত্যাগ করতে পারলো তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। এদিকে, গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে গত ৩১ মার্চ আদালতে হাজির করা হয়েছিল। আদালত তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তদন্তকারী সংস্থার বরাত দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, জমির মালিকের আপত্তি অগ্রাহ্য করে রূপায়ন ভবনটি ১৮ থেকে ২২তলা করেছে। এ নিয়ে তিনি মামলাও করেছেন বলে জানিয়েছেন গ্রেফতারকৃত ফারুক। তবে, তার এ বক্তব্য কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য বিেিবচিত হচ্ছে না। কেননা নির্মানে আপিত্তির কথা বললেও ওই চারটি তলার একটির মালিকানা জমির মালিক ফারুকের দখলে রয়েছে। ফলে এটা পরিষ্কার, সমঝোতার ভিত্তিতেই জমির মালিক ও রূপায়ন ভবনটি ২২তলা বানিয়েছে। এখন বিপদ বুঝে ফারুক তার আপত্তি ও মামলার কথা বলছেন। অপরদিকে ভবনটির অবৈধভাবে নির্মিত দু’টি ফ্লোর কিনে ফেঁসে গেছেন কাশেম ড্রাই সেলের তাসবিরুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, ফ্লোর তিনটি কিনলেও রূপায়ন এখনও পর্যন্ত তা রেজিষ্ট্রি করে দেয়নি। তাসভিরুল ইসলামের এ বক্তব্য সত্য বলে অনেকে মনে করেন। কারণ অবৈধভাবে নির্মিত কোনো ভবন বা ফ্লোরের হস্তান্তরে রাজউক অনুমতি দেয় না। সে হিসেবে এফআর ভবনের ১৯ থেকে ২৩ তলা অনুমোদনহীনভাবে তৈরি করায় রাজউক হয়তো হস্তান্তরের অনুমতি দেয়নি। তবে, তাসবিরুল ইসলাম তার নির্বুদ্ধিতার কারণেই এ জালে জড়িয়েছেন। কেননা, ফ্লোরগুলো কেনার আগে তা বৈধভাবে নির্মিত কি না তা যাচাই করে নেয়া উচিত ছিল। চুরি করা যেমন অপরাধ, চোরাইপণ্য কেনাও তেমনি অপরাধ। কেননা তাতে চোরেকে চুরিতে উৎসাহ দেয়া হয়। অবৈধভাবে নির্মিত ভবনের ফ্লোর ক্রয় করে তাসবিরুল তাই রূপায়নের সমঅপরাধী হয়েছেন। তবে, বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এ ক্ষেত্রে মূল অপরাধী আপাতত পগার পার হয়েছে, ধরা খেয়েছে সহযোগী।
এখন যে প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হচ্ছে তাহলো, রাজউকের অনুমোদন ছাড়া ভবনটি ২৩ তলা করা হলো, অথচ রাজউক কর্তৃপক্ষ তখন বাধা দিল না কেন। তারা তখন আইনের আশ্রয় নিয়ে ভবনটির নির্মানকাজ কেন বন্ধ করে দিল না? রাজউক কর্মকর্তারা কী সে সময় ঘুমিয়ে ছিলেন, নাকি বিশেষ কোনো মহৌষধের দ্বারা তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল ভবন কর্তৃপক্ষ? এটা কোনোমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, রাজউকের অগোচরে এ অবৈধ কাজ হয়েছে। আমাদের দেশে কোনো অবৈধ কাজ করতে যে ধরনের অবৈধ পন্থা অবলম্বন করা হয়ে থাকে, এ ক্ষেত্রেও হয়তো সে পন্থাই অবলম্বন করা হয়ে থাকবে। সে অবৈধ প্রক্রিয়ার সাথে কারা কারা জড়িত ছিল, তা বের করা কঠিন কোনো কাজ নয়। সে সময় ভবন কর্তৃপক্ষ রাজউকের কোন কর্মকর্তার কাছে ভবনটির তলা বৃদ্ধির আবেদন করেছিল, কোন কর্মকর্তা তা নাকচ করে দিয়েছিলেন এবং অবৈধ নির্মান চলছে এটা জেনেও তারা কেন কৃত্রিম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে থেকেছিলেন-এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজলেই থলের সব বিড়াল বেরিয়ে পড়বে। রাজউকসহ বিভিন্ন সরকারি আধাসরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের অফিসগুলোতে কী হয় তা কারো অজানা নেই। ওইসব জায়গায় একটি নীতি খুব ভালোভাবে মেনে চলা হয়। তাহলো ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’। কড়ি ফেলে ঠিকমত তেল মাখতে পারলে যে কোনো অসাধ্য সাধন সম্ভব। নজরানা দিতে পারলে ডোবাও হয়ে যায় খটখটে মাটি সমৃদ্ধ এখনই বাড়ি করার উপযোগী উঁচু ভ‚মি। আর যদি নজরানা না দেয়া হয়, তাহলে ‘সয়েল টেস্টে গোলমাল আছে’- বলে আপনার অনুমোদন হতে থাকবে বিলম্বিত।
কথা উঠেছে ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও। গণমাধ্যম জানিয়েছে, এফআর টাওয়ারে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা যথোপযুক্ত ছিল না। ছিলনা কোনো ইমার্জেন্সি এক্সিট সিঁড়ি। নিয়ম অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এ ধরনের ভবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখার কথা। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ সে দায়িত্ব পালন করেছে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অবশ্য ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল জুলফিকার রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভবনটি পর্যবেক্ষণ করে ইতোপূর্বে মালিকপক্ষকে তিনবার নোটিশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ তা আমলে নেয়নি। এ ধরনের কথা বলে নিজেদের দায় এড়ানো কী সম্ভব? এফআর টাওয়ার কর্তৃপক্ষ যদি ফায়ার সাাির্ভসের নোটিশকে পাত্তা না দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলো না কেন? রূপায়ন কী ফায়ার সার্ভিসের হাত পা বেঁধে রেখেছিল?
পূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম অগ্নিকান্ডের পরে ঘটনাস্থল দেখতে গিয়ে গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন, এটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাÐ। যারা দায়ী তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তার কথায় অনেকেই আশাবাদী হয়েছেন। এতগুলো তরতাজা প্রাণ চিরতরে হারিয়ে যাবার জন্য যারা দায়ী, তাদের উপযুক্ত শাস্তি সবারই কাম্য। কিন্তু ‘আইনের ফাঁক’ বলে একটি কথা আমাদের দেশে চালু আছে। কথাটি বহুল ব্যবহৃত। প্রচলিত আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অনেক সময় অপরাধীরা বেরিয়ে যায় নির্বিঘেœ। আলোচ্য ক্ষেত্রেও যে তা ঘটবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। হয়তো দেখা যাবে কোনো বিশেষ জাদু-মন্ত্রের বলে এফআর টাওয়ারের নির্মান বৈধতা পেয়ে যাবে। আর মুক্তমানব হিসেবে বেরিয়ে আসবেন এই অবৈধ ভবনের নির্মানের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টরা। অতীত থেকে বর্তমান এমনই হয়ে আসছে। ভবিষ্যতে হবে না তাই বা বলি কী করে!
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ