Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

উপভোগ করুন, রকেট স্টিমার ভ্রমণ

মো. ইকরাম | প্রকাশের সময় : ৯ এপ্রিল, ২০১৯, ৯:১৫ পিএম

বাংলাদেশের পরিবহন জগতে রকেট স্টিমারের রয়েছে বিশাল ভুমিকা। প্রায় শত বছর ধরে এগুলো চলাচল করছে। বৃটিশ শাসনামলে এগুলো ঢাকা/বরিশাল, বরিশাল-গোয়ালন্দ যোগাযোগ রক্ষা করতো। তখনকার মানুষ এ স্টিমারে করে গোয়ালন্দ গিয়ে ট্রেনে কোলকাতা যেতো। হাতে মাত্র দুটো তিন থাকলে এ রকেট ষ্টিমারে একটা স্মরনীয় ভ্রমণ করে আসতে পারেন।

প্রায় শত বছর আগে থেকে ইল্যাংন্ড এর রিভার এন্ড স্টিম নেভিগেশন (আরএসএন) কোম্পানীর বিশাল বিশাল সব স্টিমার চলাচল করতো এ ঘাট দিয়ে। বাহারী নাম ছিলো সে সবের- ফ্লেমিংগো, ফ্লোরিকান, বেলুচি ইত্যাদি। বলা হয়ে থাকে বৃটিশ সরকার নাকি বরিশালে রেলপথ সম্প্রসারনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবসা হারানো ভয়ে স্টিমারের মালিকরা বৃটেন বসে কলকাঠি নেড়েছিলো বলে বরিশাল রেলপথ যায়নি। আগে এসব ষ্টিমার কয়লার দ্বারা উৎপাদিত ষ্টিমে চলতো বলে ষ্টিমার বলা হতো। এখন চলে ডিজেলে, তবু নাম রয়ে গেছে ষ্টিমার। আবার কোন এক অজানা কারনে এর অন্য নাম : রকেট সার্ভিস। হয়তো আগের দিনে এটি ছিলো সবচে গতি সম্পন্ন । তাই এ নামকরন।

সারা বিশ্বে হাতে গোনা যে কটি পেডেল স্টিমার আছে তার মধ্যে ৫ টি আছে বাংলাদেশে। এগুলোর নাম হল : মাসহুদ, অস্ট্রিচ, লেপচা, ও টার্ন। এর মধ্যে বড় হল ‘মাসহুদ’ ও ‘অস্ট্রিচ’৷ প্রায় শতবর্ষী পুরনো এ স্টিমার দুটি তৈরি হয়েছিল যথাক্রমে ১৯২৮ ও ১৯৩৮ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে৷ শুরুর দিকে এসব স্টিমারে জ্বালানী হিসেবে কয়লা ব্যবহার করা হতো। আশির দশকের শুরুতে এগুলো ডিজেল ইঞ্জিনে রুপান্তরিত করা হয়। বড় বড় দুটি পেডেল দিয়ে সামনের দিকে এগোয় আর তাই এর অন্য নাম পেডেল স্টিমার।

ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে স্টিমার চাদপুর হয়ে পরদিন সকালে বরিশাল পৌছে। বরিশাল যাত্রাবিরতি করে আধ ঘন্টার মতো। এরপর নলছিটি, ঝালকাঠী, কাউখালী, হুলারহাট (পিরোজপুর), চরখালী, বড় মাছুয়া, সন্নাসী হয়ে মোড়েলগঞ্জ। আগে খুলনা পর্যন্দ যেত কিন্তু নাব্যতা সংকটের কারনে এখন আর যেতে পারেনা।

বিদেশী ট্যুরিষ্টদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এ সার্ভিসটি। প্রায় প্রতিটি ট্যুরিষ্টেই ভ্রমণ তালিকায় পেডেল স্টিমার এর নাম থাকে। অনেক বিদেশী শুধু এটাতে চড়তেই বাংলাদেশে আসেন। গত বেশ কিছু বছর এগুলো ক্রমাগত লোকসান দিয়ে আসছে। এছাড়া এগুলো মেরামতেও কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। তাই সরকার হয়তো একসময় বন্ধ করে দেবে এসব পুরোনো স্টিমার। সেটা করার আগেই একবার ঘুরে আসুন শতবর্ষী এ জাহাজে।

আপনার ভ্রমণটা শুরু হতে পারে এভাবে। কোন এক দিন সন্ধ্যা ৬.৩০ এ ষ্টিমারে উঠে বসলেন। ষ্টিমার ভুউ শব্দ করে সামনে দিকে এগুতে থাকবে। ঢাকা নারায়নগঞ্জ শহরকে পাশ কাটিয়ে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে রকেট যখন মেঘনায় পড়বে তখন রাত ৮/৯ টা বেজে যাবে। যদি চাদনী রাত হয়তো সোনায় সোহাগা। চারদিক ধবল জোসনায় আলোকিত হবে, মেঘনার গভীর জলে চাদের আলোর খেলা জমে উঠবে।

এ আলোর খেলা দেখতে দেখতেই রাত সাড়ে ১১ টার সময় ষ্টিমার চাদপুর ঘাটে ভীড়বে। এসময় দোতলার সামনে চলে যেতে পারেন। কারন চাদপুর থামলেই হুড়মুড় করে অনেক মানষ উঠবে। এসব মানুষ চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চাদপুর এসে অপেক্ষায় থাকে এ ষ্টিমারে করে বরিশাল, পিরোজপুর সহ দক্ষিনবঙ্গের অন্যান্য জায়গায় যেতে। চাদপুর থেকে ছেড়ে দিয়ে রকেট পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মিলনস্থল অতিক্রম করবে। একটা সময় চারদিকে অথৈ জলরাশি ছাড়া কিছুই দেখবেন না।

এক ফাকে বাটলারকে ডেকে রাতের খাবারের অর্ডার করুন। সাধারনত দুধরনের সেট মেন্য থাকে। ভুনা কিচুড়ি, চিকেন, ডিম সহ একটি মেন্য আর সাদাা ভাত চিকেন আর দুটি ভর্তা সহ আরেকটি মেন্যু। যেকোন একটি মেন্যু অর্ডার করতে পারেন। দাম ২০০ টাকা।। এক সময় খুব সুনাম ছিলো ষ্টিমারের বাটলারের রান্নার। তার একটু একোনো অবশিষ্ট আছে। আশা করি আপনিও এদের রান্না করা খাবার মজা করেই খাবেন।

সকালে উঠেই দেখবেন রকেট বরিশাল নোঙর করে আছে। এখান থেকে সকাল ৬ টা য় আবার রওনা দেয়। ঘন্টা দেড়েক চলার পরেই আরেকটি ষ্টপেজ নলসিটি। এভাবেই ১ ঘন্টা পরপর একেকটি ষ্টপেজ আছে, খালাসীদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কুলিরা দৌড়ে ওঠে কোন পণ্য থাকলে সেগুলো নামাবার জন্য। একটু পরেই রকেট গাবখান ক্যানেলে প্রবেশ করে। ছোট্ট একটি ক্যানেল, দুপাশে সারি সারি গাছ পালা, সে অন্য রকম সৌন্দর্য। সকাল সাড়ে ১০ টায় পৌছে যাবেন পিরোজপুরের হহুলারহাট। এখানে বেশ কিচুটা সময় থাকার পর আবার রওনা দেবে দক্ষিনের পথে। এভাবে দুপুর দেড়টার দিকে পৌছাবে বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ এ।

এবার আপনার নামার পালা। মোড়লগঞ্জ এ নেমে বাসে করে চলে যান বাগেরহাট। ১ ঘন্টার মত লাগবে। এরপর ৬০ গম্বুজ মসজিদ দেখে বাসে করে ঢাকা ফিরে আসুন। আরো বিস্তারিত নীচে :

ছাড়ার সময় : প্রতি শনিবার, রবিবার, মঙ্গলবার এবং বুধবার
সময় : সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিট
স্থান : ঢাকা সদরঘাট

ভাড়া :

বরিশাল : ডেক ১৭০ টাকা, ফার্ষ্ট ক্লাস এসি কেবিন ২৩০০ টাকা ( ২ বেড ), সেকেন্ড ক্লাস নন এসি ১২৬০ টাকা ( ২ বেড )
মোড়লগঞ্জ : ডেক ২৮০ টাকা, ফার্ষ্ট ক্লাস এসি কেবিন ৩৭১৫ টাকা ( ২ বেড ), সেকেন্ড ক্লাস নন এসি ২১০০ টাকা ( ২ বেড )

টিকেট : টিকেট অনলাইন এ কাটতে হয়। www.shohoz.com এ গিয়ে ডানদিকে Launch এ ক্লিক করলে একটা ঘর আসে। সেখানে তারিখ বসিয়ে কার্ড বা বি ক্যাশ এ পেমেন্ট করলে টিকেট চলে আসে। টিকেট সাধারনত যাত্রার ৪-৫ দিন আগে দেয়া হয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভ্রমণ


আরও
আরও পড়ুন