Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬, ১৬ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

ভারতীয় জি চ্যানেল বন্ধ এবং আমাদের টেলিভিশন শিল্পের করণীয়

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

আকাশ সংস্কৃতির যুগে বিদেশি চ্যানেলের মাধ্যমে ভিনদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিয়ে অতীতে আলোচনা-সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বিদেশি চ্যানেলের আগ্রাসনে আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্ম নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে বিদেশি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, এমন কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত। বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা চ্যানেলগুলো আমাদের দেশে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, দেশীয় চ্যানেল থেকে অসংখ্য দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলোর ডেইলি সোপ নামের ধারাবাহিক, হিন্দি ডাব করা কার্টুন, রিয়েলিটি শো থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রতি তারা ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা হতে না হতে এসব অনুষ্ঠানের প্রতি অনেক দর্শক সব কাজ ফেলে চ্যানেলগুলো দেখতে বসেন। এমন ঘটনাও রয়েছে, ঢাকা থেকে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, এ সময় একটি সিরিয়ালের সময় হয়ে গেছে, সে সময়ও তারা ট্রেন স্টেশন বা বাস স্টেশনের ওয়েটিং রুমে সিরিয়াল দেখার জন্য বসে পড়েছে। কিংবা দাওয়াতে কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় গিয়েছে, সেখানেও সময়মতো ভারতীয় বাংলা সিরিয়াল দেখতে বসেছে। নেশার মতো সিরিয়ালগুলো তাদের আসক্ত করে ফেলেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপেও দেখা যায়, ভারতের চ্যানেলগুলোর দর্শক বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর চেয়ে বেশি। দর্শকদের এই ব্যাপক আসক্তির কথা দেশের বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করেই জানে। জানে বলেই তারা তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য ভারতের চ্যানেলগুলোতে অতিরিক্ত মূল্যে বিজ্ঞাপন প্রচার করা শুরু করে। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়ায়, নিজ দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন অন্যদেশের চ্যানেলের মাধ্যমে নিজ দেশেরই দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে বছরে শত শত কোটি টাকা ভারতে চলে যাচ্ছে বলে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকজন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ তোলে। ফলে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মালিকদের সংগঠনসহ অন্যরা বিদেশি তথা ভারতীয় চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন প্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করে। বিপুল অংকের অর্থ যে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা সরকারও জানে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ স্বয়ং জানিয়েছেন, বিদেশে বিজ্ঞাপন প্রচার করার কারণে বছরে ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। দেশের টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠনের দাবির মুখে অবশেষে গত ১ এপ্রিল থেকে ভারতীয় চ্যানেল জি নেটওয়ার্কের সবগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন অনুযায়ী সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৬ সালে প্রণীত এই আইনের উপধারা ১৯(১৩)-তে রয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি কোনো চ্যানেলে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপান প্রচার করা যাবে না। শুধু দেশীয় বিজ্ঞাপন নয়, অন্য কোনো বিজ্ঞাপনও দেখানো যাবে না। ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের ক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, সরকার কোনো বিদেশি চ্যানেল বন্ধ করেনি। দেশীয় টেলিভিশন শিল্পকে বাঁচাতে বিদেশি চ্যানেলে দেশীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন বন্ধে সরকার প্রচলিত আইন প্রয়োগ শুরু করেছে। ১ এপ্রিল যে চ্যানেলগুলো বন্ধ করা হয়েছে, এ চ্যানেলগুলো বিদেশি বিজ্ঞাপন নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রচার করে আসছিল।
দুই.
আমাদের দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, মূল্যবোধ অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে যেসব বিদেশি বা পর্যটক আসেন তারাও স্বীকার করেন, এমন চমৎকার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দেশ বিশ্বে খুব কম দেশেই রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা থেকে শুরু করে কথাবার্তা ও আচার-আচরণে তারা বরাবরই মুগ্ধ হন। আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলের অবাধ প্রচারের পর থেকে আমাদের সংস্কৃতিতে বড় ধরনের আঘাত শুরু হয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব পড়তে থাকে। বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলের বিভিন্ন ধরনের সিরিয়াল, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচরণ তাদেরকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে শুরু করে। এমনকি সিরিয়ালগুলোতে যেসব গল্প এবং অপরাধমূলক ঘটনা দেখাতে শুরু করে, এসব ঘটনায় বিভ্রান্ত হয়ে কেউ কেউ সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগও শুরু করে। তখন থেকে সচেতন মানুষ এসব চ্যানেল বন্ধের দাবী জানাতে থাকে। অন্যদিকে কিছু মানুষ আকশ সংস্কৃতির যুগের দোহাই দিয়ে এবং ভিনদেশি সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ও বিনিময়ের যুক্তি দেখিয়ে এগুলোর পক্ষাবলম্বন করে। বাস্তবতা হচ্ছে, এসব চ্যানেলের কুপ্রভাবই আমাদের সংস্কৃতিতে এখন শেকড় গেঁড়ে বসেছে। পরকীয়া, পারিবারিক দ্ব›দ্ব, পারস্পরিক সুসম্পর্কে চিঁড় ধরানো থেকে শুরু করে নানা অনৈতিক কর্মকাÐ চ্যানেলগুলোর সিরিয়াল থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অবাধে প্রদর্শিত হতে থাকে। নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণকে পুঁজি করে চ্যানেলগুলোও তাদের অনুষ্ঠানে তা প্রচার করতে থাকে। ভারতীয় সিরিয়ালগুলোর নেতিবাচকতা নিয়ে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী পর্যন্ত মুখ খুলেছিলেন। এসব অনুষ্ঠান নৈতিক মূল্যবোধে আঘাত হানছে, এমন মন্তব্য করেছিলেন। তাতেও চ্যানেলগুলোর কোনো টনক নড়েনি। বাংলাদেশে এসব চ্যানেলের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অবগত। তাদের চ্যানেলের চাহিদা ধরে রাখার জন্য আরও বেশি করে এসব অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে থাকে। মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির কথা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কথা বলে যারা যুক্তি দেখান, তাদেরকে কখনো আমাদের দেশের চ্যানেল ভারতে প্রচারের জন্য জোর দাবী করেন না কিংবা এ নিয়ে আন্দোলনও করেন না। ভারতও তার দেশে বাংলাদেশের কোনো চ্যানেল প্রচারের অনুমতি দেয়নি, এখনও দিচ্ছে না। দেশটির কেবল অপারেটররা বাংলাদেশের চ্যানেল প্রচারের ক্ষেত্রে এমন ফি ও শর্ত দিয়ে রেখেছে যে, তা পূরণ করা আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোর পক্ষে অসম্ভব। অন্যদিকে ভারতের চ্যানেল আমাদের দেশে খুবই কম মূল্যে এমনকি বিনামূল্যেও দেখার সুযোগ রয়েছে। টিভির সাথে একটি সেটবক্স লাগিয়ে নিলেই শত শত চ্যানেল দেখা যায়। ভারত নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে দাবী করলেও তাদের চ্যানেলগুলোতে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। বরং তারা তাদের হিন্দু ধর্মের নানা পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে একের পর এক সিরিয়াল নির্মাণ ও প্রচার করছে। এসব সিরিয়ালও বাংলাদেশের দর্শক দেখছে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বর্তমান নাটক বা সিনেমায় আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন কোনো দৃশ্যই দেখা যায় না। নির্মাতারা সচেতনভাবেই তা এড়িয়ে যায়। কারণ তারা জানে, আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন কোনো নাটক নির্মাণ করলে কিছু ধর্মনিরপেক্ষবাদী ঐ নির্মাতাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। এমনকি চ্যানেল কর্তৃপক্ষও তার নাটক বা অনুষ্ঠান প্রচার করবে না। ফলে নির্মাতারা নিজেদের বিতর্কমুক্ত রাখতে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের যে কৃষ্টি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধÑএগুলো এড়িয়ে যায়। এর জন্য মূলত চ্যানেল কর্তৃপক্ষই দায়ী। চ্যানেলের মালিকরা যদি নির্মাতাদের এ ধরনের নাটক বা সিরিয়াল নির্মাণ এবং প্রচারে সহায়তা দেয়, তবে নিশ্চিতভাবেই নির্মাতারাও তা করবেন। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং এর ধারা অব্যাহত রাখতে চ্যানেল কর্তৃপক্ষের এগিয়ে আসা উচিত। ভারতীয় সিরিয়াল বা অনুষ্ঠানের অনুকরণ, অনুসরণ বা নকল না করে নিজ সংস্কৃতির মধ্যে থেকে নির্মাতাদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ করলে আমাদের দর্শকদের ভারতীয় অনুষ্ঠান দেখার প্রয়োজন পড়বে না। এক্ষেত্রে যেসব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এতদিন ভারতীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান স্পন্সর ও বিজ্ঞাপন দিয়ে সহায়তা করে আসছে, তাদের উচিত দেশের নির্মাতাদের দিয়ে আমাদের সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণে সহায়তা করা। এতে আমাদের দর্শক ধরার জন্য তাদের ভারতের অনুষ্ঠানের সহায়তা নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
তিন.
আমাদের সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ এবং নির্মাতারা কতটা মেধাদীপ্ত তা যুগ যুগ ধরে প্রমাণিত হয়ে আসছে। যখন স্যাটেলাইট চ্যানেলের যুগ ছিল না, এমনকি ভারতে এর সূচনা হয়নি, সেই আশির দশকে বাংলাদেশের বিটিভি দেখার জন্য ভারতের দর্শকরা মুখিয়ে থাকত। সে সময় আসকার ইবনে শাইখ, বেগম মমতাজ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মমতাজ উদ্দিন আহমদ, মামুনুর রশীদ, হূমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আফজাল হোসেনের মতো লেখক-নির্মাতাদের যেসব অসাধারণ নাটক বিটিভিতে প্রচার হতো, তা কলকাতার দর্শকরা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। বিটিভি দেখার জন্য তারা সীমান্তের কাছাকাছি এন্টেনায় ঘটি-বাটি লাগিয়ে রাখত। সকাল সন্ধ্যা, ভাঙনের শব্দ শুনি, সময়-অসময়, শুকতারা, কোথাও কেউ নেই, যুবরাজের মতো বিটিভির অসাধারণ সব নাটক দেখার জন্য ভারত-বাংলাদেশের দর্শকদের আগ্রহের সীমা ছিল না। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের লেখক-নির্মাতারা বারবার প্রমাণ করেছেন, তাদের মেধার মূল্যায়ন করলে তারা আমাদের কৃষ্টি-কালচার নিয়ে কালজয়ী নাটক, সিনেমা নির্মাণ করতে পারেন। যুগের পরিবর্তন এবং আকাশ সংস্কৃতির কালে এসে যেন আমরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। তাল মেলাতে না পেরে, নিজস্ব সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে আকাশ সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েছি। অথচ আমাদের টেলিভিশন শিল্পের চেয়ে ভারতের টেলিভিশন মাধ্যম পিছিয়ে থাকা সত্তে¡ও তারা যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে তাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করে এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে আমরা তাল মিলাতে না পেরে পিছিয়ে পড়েছি। এটা কি মেধার ঘাটতির কারণে হয়েছে? না, মেধার ঘাটতির কারণে হয়নি। মেধার অবমূল্যায়ণের কারণে হয়েছে। আমাদের চ্যানেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে এমন প্রবণতা বিরাজমান যে, তারা কম বাজেটে বেশি লাভের প্রত্যাশা করেন। তারা মনে করেন, তাদের মতো করে যে কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করলেই দর্শক তা দেখতে বাধ্য। নির্মাতারাও স্বল্প বাজেটের কারণে তাদের সৃষ্টিশীল চিন্তায় ছেদ টেনে শুধু রোজগার করার জন্য কাজ করে যান। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ভাবেন না, পুরো বিশ্ব এখন খোলা জানালা, দর্শক চাইলেই যে কোনো চ্যানেল দেখতে পারেন। তাদের সামনে হাজারো বিকল্প রয়েছে। এই যে আমাদের দর্শক ভারতের চ্যানেলগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে, এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে, আমাদের চ্যানেলগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। জরিপ করলে দেখা যাবে জি বাংলার একেকটি সিরিয়ালের যত দর্শক, আমাদের দেশের অনেক চ্যানেলের তা নেই। আমাদের চ্যানেলগুলোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় শ’ খানেক সিরিয়াল প্রচার হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কতজন দর্শক এসব সিরিয়ালের নাম জানেন? যদি জি বাংলা বা ভারতের অন্য চ্যানেলের সিরিয়ালের নাম জিজ্ঞেস করা হয়, তবে অসংখ্য দর্শক একবাক্যে তা মুখস্ত বলে দিতে পারবে। এমনকি কোন পর্বে কি ঘটেছে, তাও গড়গড় করে বলে দেবে। এখন এসব ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালের চ্যানেল বন্ধ হওয়ায় তাদের মাথায় যেন বাজ পড়েছে। তবে এসব সিরিয়ালের মানুষের নেতিবাচক চরিত্রের প্রকাশ যে তাদের মনোজগতে অত্যন্ত কুপ্রভাব ফেলেছে, তা তারা নিজেরাও হয়তো জানে না। এ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরিবার, সমাজ ও সংসার যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা উপলব্ধি করতে পারছে না। এসব চ্যানেল বন্ধের দাবী আমাদের নির্মাতা থেকে শুরু করে সচেতন শ্রেণী দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিল। এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তেমন একটা কান দেয়নি। দেশীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া নিয়ে আমাদের চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষের আন্দোলন-সংগ্রামে সরকারে টনক নড়েছে। অবশেষে যে কারণেই হোক আমাদের সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর এসব চ্যানেল নীতিমালা ও আইন অনুযায়ী সরকার বন্ধ করেছে। বলা যায়, দেরিতে হলেও এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে এ কথাও বলা দরকার, ভারতীয় এসব চ্যানেল বন্ধের পর আমাদের দেশীয় চ্যানেলগুলোর দায়িত্ব বেড়ে গেছে। যেসব দর্শক এসব চ্যানেল দেখত, তাদেরকে নিজেদের চ্যানেলের প্রতি ফিরিয়ে আনতে আমাদের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধসম্পন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে। কারণ, একটি চ্যানেল দর্শকপ্রিয় করতে খুব বেশি অনুষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে না। একটি-দুটি অনুষ্ঠানই যথেষ্ট। চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে দর্শক জরিপ করে এ ধরনের অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ভাল অনুষ্ঠানের আইডিয়া নিয়ে বসে অনুষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। কম বাজেটের অনুষ্ঠান দিয়ে বেশি লাভের আশা করার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেহেতু ভারতের চ্যানেলগুলোতে দেশীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, তাই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত হবে দেশের চ্যানেলগুলো যাতে ভাল অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে পারেÑএ ব্যাপারে এগিয়ে আসা। শুধু টেলিভিশন অনুষ্ঠানই নয়, দেশের সিনেমা শিল্পেও তাদের অধিক হারে বিনিয়োগ করে দর্শকদের সুস্থ্য বিনোদন দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
চার.
আগেই বলেছি, আমাদের নির্মাতাদের মধ্যে মেধার সংকট নেই। মূল সংকট অনুষ্ঠান নির্মাণের বাজেট। এখন সময় ও প্রযুক্তি এতটাই বদলেছে যে, গতানুগতিক অনুষ্ঠান এবং দুর্বল গল্প ও নির্মাণ নিয়ে দর্শক আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। নির্মাতাদের যদি যথাযথ বাজেট ও সময় দেয়া হয়, তবে তারা অবশ্যই ভাল মানের অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারবে। এক্ষেত্রে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। তাদেরকে ভিনদেশি অনুষ্ঠানের অনুকরণ যেমন করা উচিত নয়, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতাও দেয়া উচিত নয়। চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের উচিত নির্মাতাদের সাথে বসে নাটক, সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান নির্মাণ নিয়ে গবেষণা করা, যা দর্শক আকৃষ্ট করবে। আমাদের দেশে যেসব চ্যানেল রয়েছে, সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ছাড়া বাকিগুলো মিশ্র অনুষ্ঠানের চ্যানেল। একই চ্যানেলে খবর, নাটক, সঙ্গীত, সিনেমাসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। বিশেষায়িত চ্যানেল নেই। জি নেটওয়ার্কের যেসব চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবগুলোই বিষয়ভিত্তিক চ্যানেল। অনুষ্ঠানের মিশ্রতা খুব একটা নেই। কোনোটিতে প্রায় সারাদিনই সিরিয়াল প্রচার করা হয়। মাঝে মাঝে রিয়েলিটি শো থাকে। কোনোটিতে শুধু সিনেমা চালানো হয়। আবার এমন অনেক ভারতীয় চ্যানেল রয়েছে, যেগুলো শুধু কার্টুনভিত্তিক। আমাদের দেশে এ ধরনের বিষয়ভিত্তিক চ্যানেল নেই। বিষয়ভিত্তিক চ্যানেল করা যায় কিনা, তা উদ্যোক্তাদের ভাবা উচিত। এতে দর্শক বুঝতে পারবে, কোন চ্যানেলে কখন কোন সিরিয়াল বা অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে সব অনুষ্ঠানে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমনটি করা হয়ে থাকে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানে। ‘সংস্কৃতি বিনিময়’ বলে যে কথা প্রচলিত তা কোনোভাবেই সঠিক নয়। বিশ্বের কোনো জাতিই তার সংস্কৃতি ছেড়ে অন্য সংস্কৃতি গ্রহণ করে না। প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব সত্ত¡া রয়েছে। এমনকি ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেও তারা নিজ সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের চর্চা করে থাকে। ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা বা পরিচিত হওয়া দোষের কিছু নয়, তবে তা অনুকরণ করা উচিত নয়। কাজেই আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গণে ভিনদেশি সংস্কৃতির অনুকরণের যে প্রবণতা রয়েছে, তা থেকে বের হয়ে নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে এবং বিভিন্ন উপায়ে তা তুলে ধরতে হবে। এ দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের সম্প্রসারণশীল টেলিভিশন শিল্পকে।
darpan.journalist@gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: টেলিভিশন

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ