Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ সফর ১৪৪১ হিজরী

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভা শুরু আজ

গুরুত্ব পাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু

হাসান সোহেল, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে | প্রকাশের সময় : ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৫ এএম


বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের গোপন খবর প্রকাশ করে হইচই ফেলে দেওয়া উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এখন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারের দিন বহুজাতিক সংস্থাা বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন ডেভিড ম্যালপাস। যিনি একসময় বিশ্বব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমের কঠোর সমালোচক ছিলেন। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার এবং ডেভিড ম্যালপাসের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে আজ ওয়াশিংটন ডিসিতে শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বসন্তকালীন সভা। সভায় অংশ নিতে এরইমধ্যে ওয়াশিংটনে পৌছেছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ বিশ্বব্যাংকের সদস্যভুক্ত ১৮৯টি দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। এছাড়া অংশ নিচ্ছে ২ হাজার ৮০০ অতিথি, ৩৫০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ৮০০ সাংবাদিক ও ৫৫০ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। এসব অতিথিদের বরণ করতে নতুন রূপে সাজানো হয়েছে ১৭৭ কিলোমিটার আয়তনের যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিকে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের এবারের বসন্তকালীন সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হবে মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে সহযোগিতা ও তাদেরকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে। এছাড়া বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত বিশ্বের সহযোগিতার যে প্রতিশ্রæতি রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়েও। পাশাপাশি জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) উন্নত বিশ্বেও সহযোগিতার বিষয়টিও।
এবারের বসন্তকালীন সভায় সাইবার ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ব নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে এসব ইস্যু। এছাড়া বাংলাদেশসহ সকল দেশের প্রবৃদ্ধিকে আরও টেকসই করা. যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধে উদ্বেগ কমিয়ে আনার কৌশলও খুঁজে বের করা হবে সভা থেকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংশি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা ও বিশ্বাসকে শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে।
সভা সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মনোয়ার আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরা হবে বৈঠকে। আসছে বর্ষায় টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ঘরবাড়ি ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে তাদের ঘর তৈরি করে দিয়েছে। নতুন করে ঘর ধস হলে তা তৈরি করতে অর্থের প্রয়োজন হবে। এ বিষয়টি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের আবাসন সংকট নিরসনে নোয়াখালী ভাসানচরে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বেসরকারি বিনিয়োগ খোঁজা হবে এ বৈঠকে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ যৌথ উদ্যোগে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছে। সেখানে বাংলাদেশসহ এ ধরনের দেশগুলো কিভাবে এসডিজি বাস্তবায়ন করবে, সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ, কারা বিনিয়োগ করবে এ নিয়ে তুলে ধরা হবে বিশ্বের বড় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিইউ ও উদ্যোক্তাদের কাছে। সে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে একটি পেপার উপস্থাপন করা হবে।
জানা গেছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বৈঠকে বিশ্ব অর্থনীতি পরিস্থিাতি নিয়ে আলোচনা বেশি শুরু পাচ্ছে। কারণ আন্তজাতিক মুদ্রা তহিবল(আইএমএফ) সম্প্রতি তাদের পূর্বাভাসে বলছে ২০১৯ এবং ২০২০ সালে কমপক্ষে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমবে বিগত বছরগুলোর তুলনায়। সংস্থাটি বলেছে গত দু’বছর আগেও বিশ্ব অর্থনীতি ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু চলতি বছর আশা করা হচ্ছে ৭৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে নেমে আসবে। এই মূহুর্তে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিচের দিকে যাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক খাতের নেতারা একমত হয়েছেন ২০১৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এই বাণিজ্য উদ্বেগ কিভাবে কমানো যায় সেটি ওঠে আগামী দিনগুলোর চলমান বৈঠকে তুলে ধরা হবে।
বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ, উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান, বেসরকারি অর্থায়নে বিনিয়োগের ইস্যুগুলো তুলে ধরা হবে। বৈঠক চলাকালীন বাংলাদেশের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হবে। এই বৈঠকে অংশ নিতে ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ফজলে কবির, অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার ও আইআরডি সচিবসহ ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল ওয়াসিংটনে পৌঁছেছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যাসহ পাঁচ ইস্যু তুলে ধরা হবে বসন্তকালীন বৈঠকে। কারণ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। তাদের ফেরতের বিষয়টি জাতিসংঘসহ অন্য বা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সমর্থন আদায় করা হবে অন্য দেশের। এ জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এর আগে গত অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরেছিল। ওই সময় বিশ্বব্যাপী সহায়তার আশ্বাসও পাওয়া গেছে। এবার বসন্তকালীন বৈঠকে সমস্যাগুলো তুলে ধরা হবে যাতে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সমর্থন পাওয়া যায়। এ জন্য রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাার উপর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে থাকবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের মোট সংখ্যা, পূর্বের সংখ্যা, বর্তমানে দফায় দফায় আগত রোহিঙ্গা শরনার্থীর সংখ্যা, পূরুষ-মহিলা ও শিশুর তথ্য, প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য) এবং রোহিঙ্গাদের আগমের ফলে স্থাানীয় জনগণ ও অবকাঠামোর ওপর বিরুপ প্রভাব ব্যাখা হবে। এসব তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি আগামী তাদের প্রতিপালনের জন্য চাওয়া হবে প্রয়েজনীয় সহায়তাও।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টেকসই উন্নয়নের ঝুঁকি, দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন, সার্বিক স্বাস্থ্য সেবা এবং গ্রীণ ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থায়ন। এদিকে বসন্তকালীন বৈঠকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সন্ত্রাসী অর্থায়নে প্রতিরোধ, সাইবার ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগলিক মাইগ্রেশন। এখন বিভিন্ন দেশে সাইবার অপরাধ হচ্ছে। ব্যাংক হ্যাকিং হচ্ছে। এক থেকে এসে অন্য দেশে প্রবেশ করে সার্ভার হ্যাকিং করছে। বাংলাদেশও এমন ঘটনার শিকার হয়েছে। বিশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশ মনে করছে এসব ঝুঁকি মোকাবেলা একটি দেশ একা কাজ করা সম্ভব নয়। সম্মলিতভাবে এসব ঝুঁকি মোকাবেলা সকলকে এক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কারণ আর্থিক খাতে এসব ঝুঁকি ভবিষতে আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে অ্যাসোসিয়েশন অব ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের (এএফআই) সদস্যপদ লাভ করেছে। বৃহস্পতিবার ‘১১তম বার্ষিক এএফআই গোল টেবিল বৈঠকে নারীর আর্থিক অন্তর্ভ‚ক্তি ও পলিসি মেকার নিয়ে কথা বলেন গর্ভনর। বৈঠক প্রসঙ্গে গর্ভনর ফজলে কবির বলেন, অর্থমন্ত্রীর সার্বিক তত্ত¡াবধানে বৈঠক নিয়ে ভালো প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বস্তকালীন বৈঠকে সংস্থা দুটির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয় তুলে ধরা হবে। ব্যাংকিংখাতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর অগ্রাধিকার গুরুত্বপাচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কেনিয়া-তানজানিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আর্থিক খাতে বাংলাদেশের মতো এসব দেশে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।
প্রতিবছর বিশ্বে অবৈধভাবে দেড় লাখ কোটি ডলার পাচার বা ব্যয় করা হচ্ছে। এটি বিশ্ব জিডিপির ২ শতাংশ। পাশাপাশি দূর্নীতিও ক্ষতি করছে অর্থনীতিকে। এছাড়া প্রতিটি দেশের জন্য তিনটি নীতির প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় আনা হবে। এগুলো হচ্ছে ‘অভ্যন্তরীণ নীতিই বড় সহায়ক হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য’, ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য দু’ দেশের সীমান্ত নীতি এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যৌথ উদ্যোগ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রোহিঙ্গা


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ