Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৮ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

ইউরোপে প্রথম ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান ওরখান

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

ইসলাম প্রগতি ও শান্তির ধর্ম। বিশ^ময় এর প্রচার-প্রসারে যাদের অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে, তাদের মধ্যে মাশায়েখ, উলামা এবং প্রচারকদের পাশাপাশি সুলতান-বাদশাহগণের ভ‚মিকার আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। 
দুনিয়াময় নানা স্থানের ন্যায় ইউরোপে ইসলাম প্রচারের রাজকীয় দিকটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উসমানীয় তুর্কীরা ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে ইউরোপে সর্ব প্রথম ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এক অসাধারণ গৌরব অর্জন করেন। এ পর্যায়ে সুলতান ওরখানের নাম সর্বাগ্রে স্মরণ করতে হয়। তার সময়কাল ১৩২৬ হতে ১৩৫৯ সাল পর্যন্ত। উসমানীয় তুরস্কের দ্বিতীয় সুলতান হিসেবে ইউরোপে সর্বপ্রথম তিনিই ইসলামী রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সেখানে ইসলামের প্রচার-প্রসারে তিনি যে পথপ্রদর্শন করেছিলেন, তার উত্তরসূরি সুলতানগণ তাকে আরও সুবিশাল স্তরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। 
উসমানীয় সুলতান ওরখানের আমলে ১৩৫৪ সালে সর্বপ্রথম ইউরোপে বিজয়ীর বেশে পদার্পণ করেন এবং থ্রেস ও গ্যালিপলি বিজয়ের মাধ্যমে খ্রিস্টান বিশে^ এক বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। ওরখানের মৃত্যুর পর তার পুত্র সুলতান ‘প্রথম মুরাদ’ তার পিতার রাজ্য বিস্তারের ধারা অব্যাহত রাখেন। ১৩৭৬ সালে তিনি যুবরাজ বাইজিদের বিয়ে দেন ক্রিমিয়া শাসকের কন্যার সাথে। যৌতুক হিসেবে ক্রিমিয়ার বিরাট এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ লাভ করেন এবং এসব এলাকা উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। 
১৩৮৮ সাল পর্যন্ত প্রাচীন থ্রেস ও নতুন রুমিলিযা উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে আসে এবং অন্যান্য এলাকাও বিজিত হয়। এসব এলাকায় আরব ও তুর্কিদের পুনর্বাসিত করা হয় এবং সেখানকার অধিবাসীদের অন্যত্র প্রেরণ করা হয়। এসব উপনিবেশের ফলে খ্রিস্টান জগতে দারুণ উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সার্বিয়ার রাজা খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর এক বিরাট ঐক্য স্থাপন করেন এবং বুলগেরিয়া এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করে এবং আলবেনিয়া, ওল্লাচিয়া ও হাঙ্গেরী সমর্থন জানায়। আর পোল্যান্ড সাহায্য প্রেরণ করে। 
ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘দ্বিতীয় ক্রুসেড’ নামে অভিহিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ১০৯৬ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যে ৮টি আক্রমণ চালিয়েছিল, সেগুলোকে ‘ক্রুসেড যুদ্ধ’ বলা হয়। সুলতান বইজিদের আমলে এই পর্যায়ে দ্বিতীয় ক্রুসেড সংঘটিত হয় ১৩৯৬ সালে। হিজরী ৭৯৩ সালে বাইজিদ বুলগেরিয়া জয় করে তাকে তুর্কি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং বুলগেরিয়া রাজার পুত্র মুসলমান হয়ে যান এবং সুলতানের পক্ষ হতে তিনি বুলগেরিয়ার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। 
এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে হাঙ্গেরীয় রাজা আতঙ্কিত হয়ে পোপের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং ইউরোপের সকল খ্রিস্টান রাজ্যের নিকটও আবেদন জানান। পোপের নির্দেশে বহু রাজ্য ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বরগুÐী, বুইরিয়া, অষ্ট্রিয়া, জার্মানি, হাঙ্গেরি এবং ওল্লাচিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।সম্মিলিত মিত্রশক্তি প্রথম দিকে বিজয় লাভ করলেও তাদের শেষ পরিণতি অত্যন্ত শোচনীয় হয় পরাজয়ের মাধ্যমে।
দানুব নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীনতম বুলগেরীয় শহর ‘নাইকোপলিসে’ সুলতান বাইজিদের বাহিনী সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনীর মোকাবিলায় অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধ মাত্র তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল, উসমানীয় যোদ্ধারা সম্মিলিত বাহিনীকে মারাত্মকভাবে পরাজিত করে। তাদের হাজার হাজার সৈন্য যুদ্ধে মারা যায় এবং দশ হাজার বন্দি হয়। 
এই বিজয় সংবাদে সমগ্র মুসলিম জাহানে আনন্দ-উল্লাস করা হয়। মিসরের আব্বাসীয় খলিফা মোতাওয়াক্কেল আলাল্লাহ এক ফরমান আকারে তার শাসন ক্ষমতা উসমানীয়দের নিকট সমর্পণ করেন, যার মধ্য দিয়ে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন ঘটে। এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ ৭৯৬/১৩৯৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হয়। পরবর্তীকালে তুর্কি খেলাফতের পতনের সাথে সাথে ইউরোপে মুসলমানদের যে শোচনীয় পরিস্থিতির শিকার হতে হয়, তা কারও অজানা নয়। 
প্রসঙ্গক্রমে ‘মোতামারে আলমে ইসলামী’র সেক্রেটারী জেনারেল ড: এনামউল্লাহ খানের প্রায় চার দশক পূর্বের একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় তিনি আলিয়া মাদ্রাসায় একটি আলোচনা বৈঠকে বলেছিলেন, ‘খেলাফতের পতনের পর ইউরোপে ৩৪টি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ সুলতান ওরখান প্রতিষ্ঠিত ইউরোপের সেই প্রথম মুসলিম সাম্রাজ্যের নাম সম্ভবত ইতহাসও বিস্মৃত হয়েছে। 
এখন তো ইউরোপসহ নানা দেশে, শহরে, বন্দরে মসজিদ ভাঙ্গার, অগ্নিসংযোগ করার, কোরআন অবমানার, মহানবী (সা:) এর প্রতি মিথ্যাচার এবং সবশেষে মসজিদে প্রবেশ করে সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে নামাজী হত্যা ইত্যাদি ঘটনাবলী ঘটেছে। এসব সেই ‘ক্রুসেড’ যুদ্ধের সংকেত বহন করে কি? আত্মভোলা মুসলমানদের সজাগ ও সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।



 

Show all comments
  • Shamsul Haque Khan ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ২:০৮ এএম says : 0
    সামপ্রতিক সময়ে ইউরোপে ইসলাম যে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে ইউরোপের প্রাচ্যবিদ, নীতিনির্ধারক মহল, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক-সাহিত্যিকরা রীতিমতো পেরেশান। এ প্রবণতা ও বিপ্লব দেখে তারা হতবাক।
    Total Reply(0) Reply
  • বারি ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ২:০৮ এএম says : 0
    ইউরোপের সর্ব পশ্চিম উপদ্বীপ আইবেরিয়া, যা স্পেন ও পর্তুগাল দ্বারা গঠিত। এই উপদ্বীপের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত “জিব্রাল্টার”। এই নামের সাথেই জড়িত রহিয়াছে ইউরোপে মুসলিমদের আগমন ও ইতিহাস। “জিব্রাল্টার” নামটি আসে মুসলিম বীর সেনাপতি তারেক বিন জায়েদ-এর নাম থেকে। মুসলিম এই বীর সেনাপতির হাত ধরেই হয় মুসলমানদের ইউরোপ বিজয়ের সূচনা।
    Total Reply(0) Reply
  • মনির জাহান ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ২:০৯ এএম says : 0
    নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত সময়িকী ‘টাইমস’ এ ব্যাপারে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার প্রতিটি বাক্যে ইসলামের সত্যতা ও বাস-বতা উন্মোচিত হয়ে যায়। রিপোর্ট অনুযায়ী ইউরোপে নতুন মসজিদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব মসজিদ থেকে দৈনিক পাঁচ বার আযানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। রোমে তিন কোটি ডলার ব্যয়ে সুরম্য একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের জন্য জমি বরাদ্দ করেছে সে দেশের সরকার। ফ্রান্সে বর্তমানে মসজিদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার।
    Total Reply(0) Reply
  • মনির জাহান ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ২:১২ এএম says : 0
    ইনশায়াল্লাহ বর্তমানেও ইউরোপে ইসলামের জোয়ার শুরু হয়েছে।
    Total Reply(0) Reply
  • নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১২ এপ্রিল, ২০১৯, ২:১২ এএম says : 0
    তথ্যটি আগে জানা ছিল না, জেনে ভালো লাগল।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইউরোপ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ