Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার ও স্বরূপ

প্রকাশের সময় : ২৪ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ড. এ এইচ এম মোস্তাইন বিল্লাহ
॥ এক ॥
মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষার সূচনা ও সম্প্রসারণ
ইসলামী শিক্ষা ডবশরঢ়বফরধ পর্যালোচনা করলে লেখা যায় যে, মাদ্রাসা শিক্ষা নামে প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় হযরত জায়েদ বিন আকরামের জায়গায় যা সা’ফ পাহাড়ের নিকটবর্তী স্থান যেখানে মহানবী (স:) ছিলেন শিক্ষক তাঁর অনুসারীরা ছিলেন শিক্ষার্থী। হিজরতের পর “মাদ্রাসা সা’ফা” মদিনাতে প্রতিষ্ঠিত হয় যা মসজিদে নববীর পূর্ব পার্শে¦ অবস্থিত ছিল। হযরত উবাদা বিন সামিত (রা:) কে নবী (স:) তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সে মাদ্রাসায় পাঠ্যসূচির মধ্যে ছিল: কোরান, হাদিস, ফারায়েজ (মুসলিম সম্পত্তি অংশীদায়িত্ব দায় ভাগ) তাজবিদ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, (এবড়ষড়মু), চিকিৎসা বিজ্ঞান (ঃৎবধঃরবং ড়ভ ভরৎংঃ অরফ) ইত্যাদি। তাছাড়াও, ঘোড়দৌড় যুদ্ধের কৌশল, সাময়িক শিক্ষা, হস্তলিখা, ক্যালিগ্রাফি, শরীরচর্চা মার্শাল আর্ট শিক্ষা দেয়া হয়। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রথম অধ্যায় শুরু হয় মহানবী (স:)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির প্রথম দিন থেকে উমাইয়া খলিফার যুগ পর্যন্ত। মরক্কোর ফাস নগরিতে ৮৫৯ সালে “জামেউল কারাবিন” (কারাবিন মসজিদে) প্রতিষ্ঠিত হয় যা পৃথিবীতে প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কতিপয় প-িতরা মনে করেন।
মধ্যযুগীয় মুসলিম রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বলা হয়ে থাকে, প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয়টি “ফাতিমা আল ফিহরি” এক সম্ভ্রান্ত মহিলা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তিনি মহা: আলফিহরির নামক এক ধনুকবণিকের কন্যা ছিলেন। যা পরবর্তীতে ৯৫৯ সালে মিশরের কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আব্বাসী আমলে সেলজুল ভিজিয়ার একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যা মাদ্রাসা নিজামিয়া হিসেবে পরচিত। পরে নিজমুল মুল্ক সরকারি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে, সে যুগে এগুলোকে “নিজামিয়া” বলা হত। এসব মাদ্রাসা একাদশ শতাব্দীতে আব্বাসীয়রা বিভিন্ন শহরে সম্প্রসারিত করেছিল।
ফাত্মি এবং মামলুক শাসনামলে এবং তাদের উত্তরসূরি রাষ্ট্রগুলি মধ্যযুগীয় সময়ে মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলিতে বহুসংখ্যক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেগুলি “ওয়াকফ” নামে পরিচিত। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা তখন শুধু আভিজাত্যের এর বিষয়েই ছিল না বরং সম্পদ ও আভিজাত্যের উভয সুযোগ তাদের উত্তরসূরিদের করে দিয়েছে। তৎকালীন মাদ্রাসার মধ্যে রয়েছে কায়রোতে সুলতান হাসানের মাদ্রাসা। উরসরঃৎর এঁঃধং ঙঁঃ ঝঃধহফভড়ৎফ ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ চযরষড়ংড়ঢ়যু-এর বিবেচনায় একাদশ শতাব্দী এবং চতুর্দশ শতাব্দীকে আরব ও ইসলামী দর্শনের “সোনালী যুগ” বলা যেতে পারে। ইমাম গাজ্জালীর একটি সফল উদ্যোগ, যে ক্ষেত্রে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে যুক্তিবিদ্যাকে সমন্বিত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে আবিসিনিজম সম্প্রারণে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ইসলামী শিক্ষা ধর্মীয় শিক্ষারও ঊর্ধ্বে
খেলাফতের প্রথম দিকে সরকারি নির্ভরশীলতা এবং পা-িত্যপূর্ণ কার্যাবলীর বড় বড় কেন্দ্র ছিল সীমিত। পরবর্তীতে কয়েক শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন ঘটে। যেমন মাদ্রাসা মসজিদ প্রাদেশিক শহরসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পরে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইসলামী আইন এবং সুফি শিক্ষা। ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও সেখানে যুক্তিবিজ্ঞান গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষীবিজ্ঞান, ভূগোল মধ্যযুগীয় রসায়ন শাস্ত্র (অষপযবসু), দর্শন, ম্যাজিক, ইত্যাদি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুসারে পাঠ্যসূচি তৈরী করা হত। অবশ্য মাদ্রাসাগুলি উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা ও অধ্যয়নের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ইসলামী যুগের উন্নত বিজ্ঞান গবেষণার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প-িতগণ গবেষণা করতেন। খিলাফত আমলে মধ্যযুগে শিক্ষার হার ক্লাসিক্যাল এথেন্স এর তুলনায় সর্বোচ্চ হয়েছিল। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার মত ইসলামী মধ্যযুগে মাদ্রাসা মক্তব শিক্ষার হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। উসমানিয়া যুগে যে সব বিষয়াবলীর উপর বেশী গুরুত্ব দেয়া হত, সে সাতটি তাহলে: ক্যালিগ্রাফি, বিজ্ঞান ঙৎধষ ংপরহপব (বাগ্মিতা বিজ্ঞান), বুদ্ধিমত্বা বিজ্ঞান (ওহঃবষবপঃঁধষ) ধর্মীর বিজ্ঞান ঝঢ়রৎরঃঁধষ ংপরবহপব তাত্ত্বিক যুক্তি বিজ্ঞান (ঞযবড়ৎরঃরপধষ ৎধঃরড়হধষ ংপরবহপব) ব্যবহারিক যুক্তি বিজ্ঞান (চৎধপঃরপধষ ৎধঃরড়হধষ ংপরবহপব)। উসমানিয়া স¤্রাজ্যকালে প্রথম মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৩৩১ সালে যখন প্রথম ধর্মান্তরিক চাজাকে বিখ্যাত করার জন্য প-িত দাউদ কায়সারী একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। সোলেমান পরবর্তীতে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি ৪টি সাধারণ মাদ্রাসা ও দুটি ঝঢ়বপরধষরুবফ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এসব মাদ্রাসার একটিতে হাদিস ও অন্যটিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ঝঢ়বপরধষরুবফ শিক্ষা দান করা হত। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি প্রদান করা হত যা উসমানিয়া সা¤্রাজ্যের শাসনামলের শেষপর্যন্ত অব্যাহত ছিল (প্রায় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত)।
মাদ্রাসার ইতিহাস দক্ষিণ এশিয়ায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিল্লির সুলতানাত কাল থেকেই শুরু হয়েছিল। এ শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সুলতানাতের জন্য যুবকদের প্রশাসনিক কাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমভাগের মহান মুসলিম দার্শনিকদের অবদান। মুসলিম আদর্শ সভ্যতা বিকাশের এবং বিজ্ঞানে মুসলমানদের আধুনিক সভ্যতার সূচনালগ্নের অবদান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা হলেনঃ ইবনে সিনা (৩৭০/৯৮০-৪২৯/১০৩৭), ইবন রুশদ (৫২০/১১২৬-৫৯৫/১১৯৮), আল গাজ্জালি (মৃত ৫০৫/১১১ খৃ.) ইবনে আরাবি (৫৬০/১১৬৫-৬৩৮) চিশতিও নাসিরদ্দীনের ভাইরা (তাদের মধ্যে শেখ আহমেদ সিবহিন্দি (১৫৬৪-১৬২৪) এবং শাহ ওয়ালি উল্লাহখান দেহলভি (১৭০৩-১৭৬২) ও আল খাওয়ারজামি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ইসলামী সভ্যতার এসব উত্তরসূরিদের প্রতি শাসকরা চোখ বন্ধ করে রাখবে, তা প্রায় অসম্ভব ছিল। এ সভ্যতাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা হয়নি এমন কথা বলা যাবে না, তবে ইসলামী এ সব আদর্শের প্রভাব ভারতীয় সমাজে ছিল না একথা ও বলা যাবে না। একথা অস্বীকার্য যে, মধ্যযুগে ভারতীয় ঐতিহ্য ও ইসলামী জ্ঞানভা-ারের মধ্যে ব্যাপক লেনদেন হয়েছিল বিশেষ ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, কলা, গণিত এবং আর্কিটেক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান। তৎকালীন সময় মাদ্রাসাগুলো উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছিল। মাদ্রাসা থেকে তখন আইনজ্ঞ, ডাক্তার, দার্শনিক, কবি ও সিভিল সাজেন্ট তৈরী হতো।
বৃটিশ শাসকরাও মাদ্রাসা শিক্ষাকে অস্বীকার করতে পারেনি। তবে তারা সুকৌশলে মাদ্রাসা শিক্ষার থেকে বিজ্ঞান শিক্ষাকে আলাদা করে, কেরানী তৈরীর কারখানা বানিয়েছিল। সেই সাথে ধর্মীয় বিভাজনের বীজও বপন করে দিয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে ওয়ারেন হেস্টিংস কলাপাতায় ১৭৮১ খৃস্টাব্দে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে প্রশাসনিক অফিসার তৈরী করার জন্য মুসলিম যুবসমাজকে প্রশিক্ষণ দেয়া। হিন্দু সমাজের যুবকদের জন্য বানারসে ১৭৯২ খৃস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজ স্থাপন করে, উদ্দেশ্য একই ছিল। হিন্দু যুবসমাজের জন্য তাদেরকে আইন বিষয়ক অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এসব শিক্ষা ব্যবস্থা পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থার থেকে আরো ভিন্ন ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কালের আবর্তে। উনবিংশ শতাব্দীতে উপানিবেশের সম্প্রসারণের ফলে খৃস্টান মিশনারীর মাধ্যমে বৃটিশ শাসকরা এদেশে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চত্য শিক্ষা প্রবর্তন করে দেশীয় সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশাসনের বিলুপ্তি ঘটায়। এ উদ্দেশ্যেই ১৮১৭ খৃস্টাব্দে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। ইল্কিনস্টন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে বোনেতে। এলাহাবাদে কতিপয় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করে তা হল; ইউয়িং খৃস্টান কলেজ, কামপুর খৃস্ট চার্জ কলেজ, মাদ্রাজ খৃস্টান কলেজ, বোম্বে উল্সন কলেজ এসব প্রতিষ্ঠান উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর মধ্যে স্থাপিত হয়। চেন্নাই, বোম্বে বিশ^বিদ্যালয় ১৮৫৭ খৃস্টাব্দে, যেগুলো অদ্যাবধি মিশনারী এন্টারপ্রাইজ হিসেবে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন