Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

পুরান ঢাকার উন্নয়নে যুগান্তকারী উদ্যোগ

| প্রকাশের সময় : ১৬ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

ঢাকার কয়েকটি এলাকার উন্নয়নে ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৫ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তা হিসাবে পাওয়া যাবে ৮৩৪ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় যেসব এলাকার উন্নয়নে পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে : কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, নয়াবাজার, সূত্রাপুর, গুলিস্তান, খিলগাঁও, মুগদা ও বাসাবো। প্রকল্পটি যখন অনুমোদিত হয় তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেন। এর মধ্যে রয়েছে, পুরানো ঢাকার মাঠগুলো দখল মুক্ত করতে হবে, রাস্তার প্রস্ত বাড়াতে হবে, বৃষ্টির পানি যেন পুকুরে না যায় তা বিবেচনা করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে হবে, সিটি কর্পোরেশনে নবযুক্ত ইউনিয়নগুলোর জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, বাস-ট্রাক স্ট্যান্ড পিপিপি’র আওতায় দেয়া যায় কিনা, পর্যালোচনা করতে হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে হবে, পুরানো ঢাকার আরবান রিনিউয়াল প্রজেক্ট গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে এবং প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধিরা এলাকাবাসীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। স্মরণ করা যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরানো ঢাকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ অধিবাসীদের জীবনমান বাড়ানোর ব্যাপারে বরাবরই উৎসাহী। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে দেয়া তার বক্তব্য এবং বর্ণিত নির্দেশনা এ প্রমাণ বহন করেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আলোচ্য প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক বাস্তবায়িত হলে পুরানো ঢাকার এক যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হবে। আমরা এ জন্য সঙ্গতকারণেই প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই।
কয়েক শ’ বছরের প্রাচীন শহর ঢাকা। মোঘল আমল থেকে বিভিন্ন সময়ে এই শহর রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী। অতীতের রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র বলতে পুরানো ঢাকাকেই বুঝায়। পুরানো ঢাকা কেবল পুরানো নয়, তা বাংলাদেশের ঐতিহ্যও বটে। শুরুতে রাজধানী নগরী হিসাবে এটা সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠলেও পরবর্তীতে এই ধারা রক্ষিত হয়নি। এর লোকসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, দোকানপাট, কারখানা ও ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে পুরানো ঢাকার ওপর অনাচার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এখন এটি ইমারতের স্তুুপে পরিণত হয়েছে। রাস্তাঘাট সংকুচিত হতে হতে গলিপথে পর্যবসিত হয়েছে। একই সঙ্গে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। এর পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা প্রায় শেষ হয়ে গেছে দখলদূষণে। খাল, জলাশয়, পুকুর উধাও হয়ে গেছে। উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ- কোনো কিছুই আর এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। পুরানো ঢাকার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে, সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে, এবং জনজীবনে স্বস্তি ও সুস্থ্যতা পুন:প্রতিষ্ঠা করতে এর ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়নের বিকল্প নেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শত শত বছরের প্রাচীন শহরগুলো এখনো আগের মতোই বাসযোগ্য রয়েছে। ওইসব দেশের ঐতিহ্য হিসাবে শহরগুলো পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থান হিসাবে বিবেচিত। শহরগুলোর ঐতিহ্য ও পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় দেশগুলোর নিরস্তর চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। এই উপমহাদেশের সুপ্রাচীন শহরগুলোর পুরানো অংশের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। ঢাকার থেকে অর্বাচীন হলেও মহানগরী কলকাতায় বয়স কম হয়নি। সেখানকার পুরানো অংশের ইমারতাদি, রাস্তাঘাট আগের মতই সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, উন্নয়নও অব্যাহত রয়েছে। পুরানো ঢাকার চেয়ে পুরানো কলকাতার বাসযোগ্যতা অনেকে বেশী। পুরানো দিল্লী, পুরানো লাহোর, পুরানো, করাচী প্রভৃতি শহরেও ঐতিহ্য ও বাসযোগতা বজায় আছে। আমরা পুরানো ঢাকাকে সেভাবে সংরক্ষণ করতে, তার প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংস্কার সাধন করতে ব্যর্থ হয়েছি।
পুরানো শহরগুলোকে আপগ্রডেশন অথবা রি-ডেভেলপমেন্ট করা যায়। সাধারণত বড় ধরনের ভাংচুর না করে রাস্তাঘাট, ড্রেন ইত্যাদি নির্মাণ এবং ইমারতাদী সংস্কার করে শহরকে বাসযোগ্য রাখাই হলো আপগ্রেডেশন। আর সম্পূর্ণ ভেঙ্গে নতুন শহর গড়া হলো রি-ডেভেলপমেন্ট। বলা বাহুল্য, আপগ্রেডেশন যত সহজ, রি-ডেভেলপমেন্ট তত সহজ নয়। আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে শহর উন্নয়নের নজির আছে ইন্দোনেশিয়ায়। আর রি-ডেভেলপমেন্টের নজির হলো সিঙ্গাপুর শহর। আমাদের রাজধানী ঢাকার পুরানো অংশের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়, সেটা একটি প্রশ্ন। তবে আলোচ্য প্রকল্প থেকে বুঝা যায়, আপগ্রেডেশনের পথই বেছে নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিদেশী দৃষ্টান্ত যেহেতু আছে, সেটা অনুসরণ করা যেতে পারে। যতদূর জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নির্ধারিত এলাকাগুলোর নদী, খাল, পুকুর উন্নয়ন করে দু’পাড় বাধাই করে গাছ লাগানো হবে। ভাঙাচোরা রাস্তার উন্নয়ন ও ব্যবহারযোগ্য করা হবে। ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। পাবলিক টয়লেট, কমিউনিটি সেন্টার কাম মালটিপারপাস বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে, সেখানে লাইব্রেরী, জিমনেশিয়াম ইত্যাদি থাকবে। এই পুরা কাজটি সিটি কর্পোরেশনের কর্তৃত্বে হওয়াই সঙ্গত হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা । মেয়র ও ওয়ার্ড কমিশনাররা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ায় স্ব স্ব এলাকা সম্পর্কে তাদের ধারণা বেশি এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের নৈকট্যও বেশি কাজটি সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে হলে অনেক ঝামেলা-জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। আমরা আশা করি, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একটি মডেল তৈরি হবে, যার অনুসরণে পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য প্রাচীন শহরের উন্নয়ন সহজতর হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ঢাকা


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ