Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২১ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

মহিমান্বিত শবে বরাত

মুহাম্মদ আবদুল হামিদ | প্রকাশের সময় : ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

শবে বরাত একটি মহিমান্বিত রজনী। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, পাপী-তাপী বান্দাদেরকে উদারচিত্তে ক্ষমা করেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন- এ জন্য এ রাতকে শবে বরাত বলা হয়। হাদিস শরীফে এ রাতটিকে ‘নিসফে শাবান’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রজনী তথা ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রি। মুসলিম উম্মাহর কাছে এ রাতটি খুবই গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।
শাবান মাস হলো বিশেষ মর্যাদাবান। মোবারক মাহে রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এ মাসটি। রমজানের প্রস্তুতির জন্য এ মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসে নফল রোজা বেশি রাখতেন। হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেছেন- ‘আমি রাসূল (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখতে দেখিনি। কিন্তু তিনি শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রেখেছেন।’ (সহি মুসলিম)।
এ মাসের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান হলো উম্মতের মাস। রাসূল (সা.) রজব, শাবান মাসের অত্যধিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যের প্রতি লক্ষ রেখে “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান”- এ দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং উম্মতকে পড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। যার অর্থ হচ্ছে- ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শাবানের সকল বরকত দান করুন এবং রমজান পর্যন্ত পৌছে দিন।’ এ মাসে রয়েছে বিশেষ ফজিলতময় শবে বরাত।
বিভিন্ন হাদিসে শবে বরাতের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন- কোনো এক শাবানের অর্ধরাতে রাসূল (সা.)-কে বিছানায় পাওয়া যাচ্ছিল না। খুঁজে দেখা গেল তিনি জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়ারত করছেন। (সহি মুসলিম)।
আরেক হাদিসে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন অর্ধশাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং পরের দিনটিতে রোজা রাখো। কেননা এ রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিক প্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করব। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করব। আর সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ডাক অব্যাহত থাকে। (ইবনে মাজাহ)।
হযরত ইকরিমা (রা.)-সহ প্রমুখ তাফসিরবিদের মতে, আল কুরআনে সূরায়ে দোখানের প্রথম আয়াতগুলোতে শবে বরাতের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এ রাতকে ‘লাইলাতুসসফ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং এর বরকতময় হওয়া ও রহমত নাযিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কেউ কেউ শবে বরাত সম্পর্কিত কিছু হাদিসকে দুর্বল বলে একেবারেই অস্বীকার করে ফেলেন। এটা মোটেই উচিত হবে না। কারণ, একই বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হলে এর গ্রহণযোগ্যতায় আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় শবে বরাতের বরকত ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। ঢালাওভাবে সবগুলো হাদিসকে দুর্বল বলে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী ফজিলতের হাদিসগুলো দুর্বল হলেও পালনযোগ্য।
মুসলিম উম্মাহর তিনটি স্বর্ণোজ্জ্বল যুগ তথা সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের যুগেও এ রাতের ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ গতি ও গুরুত্ব ছিল। সেই যুগের মানুষেরাও এই রাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। এ রাতটি বিশেষ ফজিলতময় ও গুরুত্ববহ। তাই এ রাতে দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকা ও ইবাদত করা সওয়াবের অছিলা হিসেবে গণ্য হবে নিঃসন্দেহে।
শবে বরাত বিশেষ ফজিলতময় হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ, জিকির-আজকার, তাওবা-ইস্তেগফার করে নিজেদের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।
অধিক নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, তাসবিহ পড়া, দোয়া করা; এসব ইবাদত এই রাতে করা যায়। কোনো কোনো হাদিসের আলোকে শাবান মাসের পনেরো তারিখ অর্থাৎ, বরাত রজনীর পরের দিন নফল রোজা রাখা অনেক সওয়াবের কাজ।
এই রাতে আরেকটি বিশেষ আমল রয়েছে, যা একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা হলো, রাসূল (সা.) এই রাতে একবার জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন। যেহেতু রাসূল (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন এই রাতে, তাই মুসলমানরাও এই রাতে কবরস্থানে যাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। নবী (সা.) থেকে যে কাজটি যেভাবে এবং যে স্তরে প্রমাণিত, সেটাকে সে স্তরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। সেই সীমারেখা অতিক্রম করা কিছুতেই উচিত নয়। এই রাতের বিশেষ কোনো ইবাদত ও ইবাদতের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। নেই নামাজের কোনো নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা, নেই ভিন্ন কোনো পদ্ধতি। এই রাতে যেসব ইবাদত করা হবে সবই নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। আর নফল ইবাদত নীরবে আপন আপন ঘরে একাগ্রচিত্তে করা উত্তম। তবে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত ইবাদতের স্থান হিসেবে মসজিদে সমবেত হয়ে গেলে কোনো আপত্তির কারণ নেই।



 

Show all comments
  • Tanvir Ahmad ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ১০:৪৬ এএম says : 0
    নিঃসন্দেহে এ রাতটি বিশেষ ফজিলতময় ও গুরুত্ববহ। তাই এ রাতে দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকা ও ইবাদত করা সওয়াবের অছিলা হিসেবে গণ্য হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • ইউসুফ আলী ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ২:৪৪ এএম says : 0
    মারহাবা মুহতারামকে
    Total Reply(0) Reply
  • Saiful Islam ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ১০:৪৫ এএম says : 1
    অধিক নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, তাসবিহ পড়া, দোয়া করা; এসব ইবাদত এই রাতে করা যায়।
    Total Reply(0) Reply
  • Hasan Al Mamun Khaled Mahmud ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ২:৪৫ এএম says : 1
    আপনারা দয়া করে ইউটিউবে শবেবরাত সম্পর্কে সার্চ দিয়ে দেখুন। ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ডা.গালিব, তারেক মনোয়ার,মুফতি কাজি ইব্রাহিম, ইমাম হোসাইন, মুজাফফর বিন মুহসিন,আব্দুর রাজ্জাক,ড. আবুবকর মুহম্মদ জাকারিয়া, মীর মোয়াজ্জেম হোসেন সাইফি,,,,, ইত্যাদি সহ বড় বড় আলেমগনের বক্তব্য শুনুন ইনশাআল্লাহ অনেক রেফারেন্সসহ সুস্পষ্ট ধারণা পাবেন।
    Total Reply(0) Reply
  • M REZAUL ISLAM ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ২:৪৬ এএম says : 0
    সবে বরাত নিয়ে একসময় ছিলো বাড়াবাড়ি আর এখন শুরু হয়েছে ছাড়াছাড়ি!! মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উচিৎ! বাংলাভাষীদের জন্য " সবে বরাত করণীয় ও বর্জনীয়" নামে বইটি পড়লে আশা করি উপকারে আসবে!!
    Total Reply(0) Reply
  • Firoz Ahmed ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ১০:৫৬ এএম says : 0
    এই রাতে আমাদের উচিত নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ, জিকির-আজকার, তাওবা-ইস্তেগফার করে নিজেদের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
    Total Reply(0) Reply
  • মোহঃ খবির হোসেন ২০ এপ্রিল, ২০১৯, ১১:৫৭ এএম says : 0
    এই রাতে নফল ইবাদাত এইটা মানি
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম


আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ