Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২১ মে ২০১৯, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৫ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

বাড়ছে আমবাগান

উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নেই সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা

রেজাউল করিম রাজু | প্রকাশের সময় : ২১ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

বিরূপ আবহাওয়া, ঝড়-ঝাপটা মোকাবেলা করে গাছে গাছে বড় হচ্ছে আমের গুটি। হাইব্রীড জাতের গুটিগুলো গায়ে-গতরে বেশ পরিপুষ্ট হয়েছে। শুরু হয়েছে বিষ বালাইমুক্ত আমের জন্য ফ্রুট ব্যাগিং লাগানো। এবার বারো কোটি আম পরবে ব্যাগ।
গাছে গাছে দোল খাচ্ছে থোকায় থোকায় আম। এর সাথে দুলছে আমচাষীর স্বপ্ন। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ যেমন শঙ্কা জাগাচ্ছে, তেমনি ভাল ফলনের স্বপ্নও কম নয়। গতবছর ভাল ফলন হলেও পায়নি ভাল দাম। বিদেশে রফতানির জন্য আম প্রস্তুত করেও পাঠানো যায়নি নানা জটিলতায়। ফলে লোকসান গুনতে হয়েছে। সারাদেশে আমের বাগান বাড়ছে। কৃষিবিদদের হিসাবে প্রতিবছর নতুন বাগান যোগ হচ্ছে পাঁচ হাজার হেক্টর করে। এরমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদন করা হচ্ছে আমের রাজধানী রাজশাহী অঞ্চলসহ ২৩ জেলায়। বাড়ছে বাগান, বাড়ছে উৎপাদন। তবে নেই সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমের চাহিদা বাড়লেও রফতানিতে মনোযোগ নেই। সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা হলে ব্যাপক আম রফতানি করা যাবে। আসবে বৈদেশিক মুদ্রা। সাথে বাঁচবে আমচাষীরা। বিগত বছরগুলোয় আম রফতানি নিয়ে হতাশ হওয়া আর রফতানির নামে রাজশাহীর আম বলে নিম্নমানের আম পাঠানোর বিষয়টা ঘুরে ফিরে আলোচিত হচ্ছে। যার কারণে গত মওসুমে সামান্য পরিমাণ আম রফতানি হতে পেরেছে। মাত্র ২৩১ টন আম রফতানি হয়। সর্বকালের নিম্ন পরিমাণ।
২০১৭ সালে একজন চাষী আম রফতানির ক্ষেত্রে জটিলতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিষয়টা গুরুত্বের সাথে নেয়া হয়। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। মাঠ পর্যায়ে তদন্তে সত্যতা মেলে। কমিটি পরবর্তীতে বাস্তবভিত্তিক প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু ২০১৮ সালে সুপারিশমালা অনুসরণ না করে পুরনো পথে হাঁটায় আম রফতানি কমে যায়। এবার যেন সুপারিশমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয় এমন প্রত্যাশা আম চাষীদের।
গত বছর আম রফতানি শুরুর আগে উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ উইং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ২৮ জন রফতানিকারক ৩১২ জন আমচাষীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বছর শেষে মাত্র ২৩১ মে. টন আম রফতানি করা সম্ভব হয়। এর মধ্যে ৭০টন চুক্তিভিত্তিক আমচাষীদের কাছ থেকে নেয়া হয়। আর অজ্ঞাত কারণে ১৬১ টন ঢাকার স্থানীয় আড়ত থেকে সংগ্রহ করে রফতানি করা হয়। এতে বোঝা যায়, খাতা কলমে চুক্তি সীমাবদ্ধ ছিল।
আম বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলছেন, কোনো বছরই আম রফতানির ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় না। যেমন চলতি মৌসুমে কী পরিমাণ আম রফতানি হবে তা আম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের (আমচাষী, আম রফতানিকারক, স্থানীয় কৃষি বিভাগ, আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসন) কেউ জানেন না। যদিও আমবাগান ব্যবস্থাপনা শুরু হওয়ার পূর্বেই চাষীদেরও জানানো প্রয়োজন ছিল। রফতানির পরে ত্রুটিসমূহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নজরে আসার ফলে কিছু করার সুযোগ থাকে না।
কন্ট্রাক্ট ফার্মিং পদ্ধতিটি আম রফতানির ক্ষেত্রে ভালো হলেও যথাযথভাবে তা অনুসরণ করা হয় না। যেমন প্রতি বছর আম সংগ্রহ করার পরপরই সংশ্লিষ্ট চাষীর সাথে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয় না। কোনো কোনো সময় দেখা গেছে, আম রফতানি শুরুর কয়েক মাস আগে তাড়াহুড়ো করে সাদা কাগজে নামেমাত্র চুক্তি সম্পাদন করা হয়। ফলে চাষীরা তাদের নিজেদের খেয়াল খুশিমতো আম উৎপাদন করে থাকেন। বিগত কয়েক বছর এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কোনো লাভ হয়নি।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অথবা নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে আমের কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। আমবাগান থেকে আম সংগ্রহ ও প্যাকিংয়ের পর নির্দিষ্ট জায়গায় আনা হয়। সেখানে বাছাই, ক্রয় ও পুনরায় প্যাকিং করে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে নিয়ে যান রফতানিকারকরা। সেখানে পুনরায় খুলে কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষার পর নির্ধারিত কার্টনে প্যাক করা হয়। ফলে পরিবহনে ঘর্ষণজনিত দাগ লেগে ৫০-৬০ শতাংশ আম বাদ পড়ে যায়। রফতানির জন্য কেনা হাজার কেজি আম থেকে ৫০ বা ৬০ শতাংশ কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষায় বাতিল করা হয়। ফলে আমদানিকারকের চাহিদানুযায়ী এবং এয়ারস্পেস বুকিং মোতাবেক আম পাঠাতে না পেরে পরবর্তীতে রফতানি বন্ধ করে দেয়া হয়।
রফতানির প্রক্রিয়ায় আম বিশেষজ্ঞ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিলে চলতি মৌসুমে আম রফতানির ক্ষেত্রে বিগত বছরের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কোন জেলার আম কখন রফতানি হবে সে বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। রফতানিকারকেরা এই বিষয়ে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
আমের কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষণ শুধু নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে না করে আম রফতানিকারক জেলাসমূহে করলে আমচাষী ও রফতানিকারক উভয়েই উপকৃত হবেন এবং তা সাশ্রয়ী হবে। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমের কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষণ করলে ফলপ্রসূ হবে।
আম রফতানি কোনো জটিল বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এক সাথে পরিকল্পনা করে আম রফতানি করলে খুব সহজেই মোট উৎপাদনের ছোট একটি অংশ রফতানি করা গেলে প্রায় দেড় দু’হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বিষয়গুলো নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ