Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে

প্রকাশের সময় : ২৫ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

শিশির রঞ্জন দাস বাবু
গত ১৩ মে শুক্রবার বজ্রপাতে মারা যায় ১৮ জন। আগের দিন ১২ মে বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকাসহ ১৪ জেলায় বজ্রপাতে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু। রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় পাঁচজন করে মারা যায়। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বজ্রপাতে শাহেদ সোহাগ ও নোমান হাসান দুই তরুণ মারা যান। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায় বিকেলে বৃষ্টির সময়ে ফুটবল খেলছিলেন তরুণরা। হঠাৎ বজ্রপাতে তাদের মধ্যে ৮-১০ জন আহত হন। গুরুতর অবস্থায় তিনজনকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শাহেদ ও নোমানকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত ও অন্যজনের নাম বাইয়ান। রাজশাহী বজ্রপাতে মারা গেছেন। আব্দুর রাজ্জাক, আবদুল আজিজ, লাইলি বেগম ও মর্জিনা বেগম। টাঙ্গাইলে মতিউর রহমান নামে এক শ্রমিক নিহত হন। কিশোরগঞ্জে শরিফুল নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। স্বপন মিয়া ও রিজিয়ার বেগম মারা যায়। নরসিংদীতে জোসনা বেগম নামে গৃহবধূ নিহত হয়। তায়েব আলী ও মেহের বেগম আহত হয়। গাজীপুরের দুজনের মৃত্যু হয়। সাত্তার আলী ও রুবিনা। নেত্রকোনায় বজ্রপাতে রইছ উদ্দিন নামে এক কৃষক মারা যায়। পিরোজপুরে মো. ইউনুস সিকদার নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হয় তার ভাইয়ের স্ত্রী আয়শা বেগম। নাটোরে মোবারক হোসেন, সাহারাবানু মারা যায়।
বজ্রপাতের প্রতিটি আলোর ঝলকানি প্রায় তিন মাইল দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাত্র ১ মিলিমিটার। বজ্রপাতের এক একটি ঝলকানি ১০০ থেকে ১০০০ কোটি জুল শক্তি উৎপাদন করে। বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ায় আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এর পেছনে বড় কারণের মধ্যে আছে গ্রামে বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, নদীর শুষ্কতা। জলাভূমি ভরাট ও মুঠোফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি। এছাড়া দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে মুঠোফোন থাকাও একটি কারণ। দেশের অধিকাংশ এলাকায় মুঠোফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ার রয়েছে। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। তাছাড়া সন্ধ্যার পরে মানুষের ঘরের বাইরে অবস্থান বাড়ছে। বেশিরভাগ বজ্রপাতই হয় সন্ধ্যার দিকে। আকাশে সৃষ্টি হওয়া বজ্র মাটিতে কোন ধাতববস্তু পেলে তার দিকে আকর্ষিত হচ্ছে।
দুর্যোগ ফোরামের হিসাব অনুযায়ী গত ছয় বছরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০-এর বেশি নয়। কিন্তু বজ্রপাতে অনেক মানুষ মারা গেলেও সরকারি নথিতে এটা দুর্যোগ নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনা ২০১০-২০১৫ তে মোট ১২টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা উল্লেখ আছে। তার মধ্যে বজ্রপাতের কথা নেই। বাংলাদেশে কখনো আঘাত না হানা সুনামিও দুর্যোগ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বজ্রপাতের মতো এমন জীবন সংহারী ঘটনাকে দুর্যোগ হিসেবে গণ্য না করা এসব মৃত্যুকে অবহেলা করার নামান্তর। এটি এমন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তাতেও দুর্যোগ হিসেবে গণ্য করা উচিত।
আবহাওয়া পরিদপ্তর সারা দেশে ৩৫টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে পরিমাপ করে দেখেছে খুলনা জেলার কিছু অংশ ছাড়া সারাদেশে বজ্রপাত আঘাত হেনেছে। সাহিদুর রহমান ও পাপিয়া খাতুন আহত হয়। নীলফামারী জেলায় লালবিবি নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। শেরপুর-বগুড়ায় দুজন মারা যায়। কৃষক আনোয়ার হোসেন ও ছখিনা খাতুন। এছাড়া আহত তিনজনকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে শিশুসহ তিনজন নিহত হন। আবদুল মোতালেব, আট বছরের শিশু নূপুর খাতুন, আনোয়ার হোসেন, খোকন ও আবদুল লতিফ মারা যান। পাবনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃদ্ধ মইনউদ্দিন তার নাতনি শিখা খাতুন (১২), শহীদ হোসেন, ফজলুর রহমান ও ছকির উদ্দিন। মৃতের সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করা অনেকগুলো সংবাদ মাধ্যমে আসে না। প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়। অফিসে বসে অঝোর বৃষ্টি দেখছিলাম; মাঝে মাঝে বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানো মোবাইল ফোনে স্ত্রীর সাবধান করা কথাÑএ অবস্থায় অফিস থেকে বেরোবে না। আমাদের দেশে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত কালবৈশাখী হয়। এ সময়ে বজ্রপাতের ঘটনাও বেশি ঘটে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। এবার দেখছি সারাদেশেই বজপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হচ্ছে সারাদেশেই। প্রাকৃতিক কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যু হরহামেশায় হয়ে থাকে।
বিশেষ করে বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১২০০-এর বেশি লোক মারা গেছে বজ্রপাতের কারণে। সাকর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। যারা মারা যাচ্ছে তাদের গড় বয়স ২০ থেকে ৩৫ বৎসর। তারা খোলা মাঠে কাজ করে, মানে আমাদের কৃষককুল। এ কৃষকেরা জীবন বাজি রেখে আমাদের অন্নের জোগান দিচ্ছেন। প্রতি বছরই দুইশ থেকে তিনশ লোকের অকাল মৃত্যুÑএ সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। উন্নত দেশে বজ্রপাত ঠেকানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে জানামতে বজ্রপাত মাপা যন্ত্রও এখন পর্যন্ত সংগৃহীত হয়নি। মানুষের আবহাওয়া-সচেতনতা ছাড়া বজ্রপাতে মৃত্যু কমানোর কোন উপায় নেই। বজ্রপাতের সময়ে কৃষক যেন মাঠে কাজ না করেন, কৃষককে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা আনতে হবে। কাজের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। গ্রামের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু অবধারিত। এসময় ছাতা ব্যবহার করাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ছাতার লোহার বাঁট দিয়ে বিদ্যুৎ সহজে বাহিত হয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আমাদের গণমাধ্যম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। প্রতিটি টিভি চ্যানেল ও সংবাদ মাধ্যম বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে “ যেসব বিষয় বজ্রপাতে মৃত্যুর কারণ হতে পারে” তা জনসাধারণের মাঝে তুলে ধরতে পারে। গাছের নীচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। প্রয়োজনে মাটির সাথে শুয়ে পড়তে হবে তাহলে কিছুটা রক্ষা হবে। সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে ঘর। আর ঘরের ভিতরেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তাই বজ্রপাতের সময় সকলের সচেতন থাকা জরুরি। এ বিষয়ে কৃষকদের মাঝে গ্রামেগঞ্জে প্রচারপত্র বিলি করা যেতে পারে।
আর এ সময়ে ফলের মাস। মধু মাস। আম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন দেশের ফলের মৌসুম। বজ্রপাতের সময়ে শিশু ফল কুড়াতে উৎসাহী হয়ে থাকে। এতে করে বজ্রপাতে শিশুদের মৃত্যু হয়। অভিভাবকদের বুঝতে হবে ঝড়ের সময়ে শিশুদের নিরাপদে রাখা জরুরি। কোন শিশু যেন বজ্রপাতের সময়ে বাইরে না যায় সে দিকে অভিভাবকদের লক্ষ রাখা প্রয়োজন। স্কুলগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যু সম্পর্কিত বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। আমাদের ইমারত নির্মাণের সময় বজ্রপাত নিরাপত্তা লাইন স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে গ্রামে আগে এক ধরনের বজ্রপ্রাতরোধক পিলার ছিল। তার সবই চুরি হয়ে গিয়েছে। যা ব্রিটিশরা এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করেছিল। আগে বজ্রপাতের গ্রামে এত লোক মারা যেত না। বর্তমানে এই প্রতিরোধ না থাকার কারণে মৃত্যুর হার আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই গ্রামগঞ্জে যেখানেই ইমারত নির্মিত হোক না কেন। প্রত্যেকটি ইমারতেই বজ্রপাত প্রতিরোধক লাইন স্থাপন করা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া এবং তা তদারকি করা সরকারের সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করি।
বজ্রপাতের ফলে মৃত্যুর মিছিলে সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ মৃত্যুর মিছিল থামাতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যু কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এ অকাল মৃত্যু ঠেকাতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। দেশ ও জাতির প্রত্যাশা এ অকাল মৃত্যু বন্ধ করতে ও জনগণের জীবনের নিরাপত্তা বিধানে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন। আমরা প্রত্যাশা করি আর যেন একটি মৃত্যুও না হয় বজ্রপাতে।
ষ লেখক : সদস্য, বাংলা একাডেমি



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন