Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ২২ মে ২০১৯, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৬ রমজান ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

বন্ধন

গল্প

জান্নাতুল মমি | প্রকাশের সময় : ২৬ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৮ এএম

আমাদের পুরনো বাড়িটা বড্ড সেকেলের। রংচটা দেয়াল, ঝুলে ভরা বারান্দা, আধ ভাঙা দরজা জানালা। যে কেউ চট করে ধরে নিতে পারবে বহু বছর ধরে এ উঠোনে কারও পা পড়েনি। কিছুটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো হয়ে উঠেছে বাড়িটা। উঠোনের একপাশে জঙ্গলে ভরা। আচমকা আমার মন ওদিকেই যাওয়ার জন্য লাফিয়ে উঠলো। আমি গুটিগুটি পায়ে সেদিকটায় গিয়ে আবিষ্কার করলাম দুইটা কবর। বাবা বলেছিল একটাতে আমার দাদা ঘুমিয়ে আছে, অন্যটাতে আমার দাদি। বাবার শৈশব এ বাড়ির কোল জুড়ে গড়ে উঠলেও পরবর্তীতে তিনি শহুরে জীবনে পা রাখেন। এরপর এ বাড়ির মুখাপেক্ষী হননি তিনি। আমি ছোটবেলায় এ বাড়ির কোনো গল্প শুনিনি। যখন আড়মোড়া শরীরে শক্তি, সামর্থ্য হলো তখন বাবা একদিন সন্ধ্যেবেলা আমাকে এ বাড়ির গল্প শুনান। সেদিন বাবার চোখে স্পষ্ট খেয়াল করেছিলাম তিনি কাঁদছিলেন। সে কান্নার অর্থ আমি বহুদিক ভেবেছিলাম। নইলে বাবা আজ আইসিইউতে ভর্তি হতো না।
গ্রামের মানুষ আমাকে দেখতে ভিড় করেছে। অস্বস্তি তো হ’েছই কারণ গ্রামীণ জীবনযাপন করা মানুষগুলোর সাথে আমার কখনও মেশা হয়নি। ওদের আচার ব্যবহার দেখে খানিকটা নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু মনে হ’েছ। সেক্ষেত্রে আমি ভিজা বিড়ালের ন্যায় চুপটি মেরে নিজেকে আঁটেসাঁটে রেখেছি। একজন বৃদ্ধা আমার দিকে করুণ নজরে তাকিয়ে এগিয়ে এলেন। থুরথুরে বুড়ি তিনি। হাড় বের হয়েছে শরীরে। মাথায় সামান্য সাদা পাকা চুল শেষ বয়সে এখনও সঙ্গী হয়ে আছে।
‘তুমি বাদশার ম্যাইয়া?’ বৃদ্ধা তার কুঁচকে যাওয়া হাতের চামড়ার ভাঁজে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি নাক সিটকাইনি। কারণ মানবিকতা তখনও আমার ভেতরে জীবস্ত।
মাথা নিচু করে উনাকে উত্তর দিলাম, ‘জ্বি, দাদি।’
আমার উত্তর শুনে উনি কেঁদে দিলেন। কেন কাঁদলেন জানি না। তবে চারিদিকে একটা থমথমে আবহাওয়া বিরাজ করছিল। বাবার বয়সী একজন এসে আমাকে বললেন, ‘চলো মা, তুমি আমাগো লগে বাড়িত চলো। চারডা ভাত খাইবা।’
আমি উনাকে সোজা না করে দিলাম। কারণ এখানে আসার আগে আমি খাবার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু অবাক হয়েছি এদের অতিথি আপ্যায়ন দেখে। অচেনা মানুষকেও কেমন জানি এরা আপন করে নিতে তৎপর। তাই তো আমার না করা সত্তে¡ও আমাকে তাদের সাথে যেতেই হলো।
ঘটনার ইতিবৃত্ত সেখান থেকেই জানা হলো আমার।
আমার দাদা দাদি খুব কষ্ট করে মানুষ করেছিলেন বাবাকে। ছোটবেলায় বাবা বেশ মেধাবী ছিলেন। সে সুবাধে শহরে পড়ার বায়না ধরেছিলেন তিনি। দাদির অবশ্য আপত্তি ছিল তাতে। একমাত্র সন্তানকে তিনি চোখহারা করতে চেয়েছিলেন না। কিন্তু দাদা কী বুঝে দাদির মতের বিরুদ্ধে গিয়ে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করেই বাবাকে শহরে পাঠায়। সেখানে পড়াশোনা শেষ হলেই স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ চলে যান বাবা। বাড়ির দিকে মুখ ফেরাননি আর। দাদি কত করে বলতেন বাবাকে ফিরে আসতে, কিন্তু বাবা তার এক কথা থেকে নড়েন না। বলতেন বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে রাজধানীর বুকে থাকবেন তিনি। তাই হলো। শেষমেশ দাদা দাদির অদেখাতে বাবা মাকে বিয়ে করে নিয়ে একবার গ্রামের বাড়ি আসলেন। ল²ীমস্ত বউ ছিল আমার মা। দাদা দাদিসহ সবার মন জয় করে নিয়েছিল এক সপ্তাহেই। কিন্তু এরপর বাবা আর এক মিনিটও এই বাড়িতে থাকেননি। মুখের কথায় বার কতক নাকি দাদা দাদিকে শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বাবা। কিন্তু দাদা দাদির আপত্তি ছিল তাতে। অবশেষে কোনো তোয়াক্কা না করে বাবা আর এ বাড়ির ছায়া মাড়াতে আসেননি। মাসে মাসে অবশ্য বাবা তাদের টাকা পাঠাতো ঠিকই কিন্তু বারান্দায় দাদির অপেক্ষার মূল্য সে টাকার কাছে ছিল তুচ্ছ। বাজারের ব্যাগে খোকার জন্য বড় মাছ কেনা ছিল দাদুর কাছে সেসব টাকার চেয়ে অর্থহীন। কতদিন গেছে দাদি বাবার পথ চেয়ে ছিল। কিন্তু বাবা ফেরেননি। অতি ব্যস্ততার অজুহাত ছিল তার। এরপর একদিন দাদি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লো। আমি তখন সবে মায়ের পেটে। খুশির এ সংবাদ পেয়ে দাদির চোখমুখ আনন্দে ভরে গিয়েছিল নাকি। কিন্তু মরণদশা আর অতিক্রম করতে পারেনি দাদি। আমি হবার চার মাস আগেই তিনি ইস্তেকাল করেন। এরপর দাদা নাকি আরও ভেঙে পড়ে। দেখাশোনার মানুষ ছিল, কিন্তু স্ত্রী শোক সহজে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। প্যারালাইজড হয়ে পড়ে রইলেন বিছানায়। আমার মুখ দর্শন অবশ্য তিনি করতে পেরেছিলেন। এরপর প্রকৃতির নিয়মের ডাকে তিনিও চলে গেলেন। তারপর থেকে গ্রামের এ বাড়িটা পড়ে রইলো। বাবাও তেমন তদারকি করেননি। এরপর একটা আস্ত পরিত্যক্ত বাড়িতে রূপ নেয় এই বাড়ি।
সবটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম এই অপরাধবোধটাই বাবাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এ যন্ত্রণার মুক্তি কীভাবে মিলবে তা আমার জানা নেই। তবে আমি চাই বাবা বাঁচুক। এক পশলা বৃষ্টি শেষে রংধনু যেমন নিজেকে মেলে ধরে আমিও চাই বাবা তার ভেতরের ওই খারাপ লাগাগুলো বানের জলে ভাসিয়ে দিক; সুস্থভাবে নিজেকে আবার গড়ে তুলুক।
গ্রামের সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাবার কাছে সরাসরি চলে গেলাম। ডাক্তার বলেছে, এখন কিছুটা সুস্থ তবে কথা বলতে খানিকটা অসুবিধে হচ্ছে তার। বেশি মানুষজন তার আশেপাশে থাকার অনুমতি নেই। মা ঘণ্টাখানেক আগে ভেতরে গিয়ে দেখে এসেছিল। এবার আমি একা যেতে পারব। বাবার নীরব চাহনি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। ইতিমধ্যে মা নিশ্চয় বলেছে আমি এতক্ষণ কই ছিলাম। বাবার হাতটা শক্ত করে ধরেছি; গভীর শক্ত। যেখানে সস্তানরা যেমন পিতার আশ্রয়ে সব ভয়কে তুচ্ছ করে আবার পিতা যেমন বিশ্বাস, ভরসায় সন্তানকে বড় করে তোলে। আমি জানি বাবার একটা কমতি থেকে গেছে। হয়তো দাদা দাদির সঙ্গে বাবার সে দু’হাতের মুঠোয় তার একটু ফাঁক ফোঁকর ছিল। কিন্তু তার চরম মূল্য সন্তান দিক এটা নিশ্চয় বাবা মা চায় না। আমি নিশ্চিত দাদা দাদিও বাবাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন শুধু সামান্য হলেও সে ভুলটুকু শোধরানো দরকার।
প্রায় তিন মাস পর বাবা সুস্থ হলেন। আমি মা আর বাবা চলে যাই বাবার ফেলে আসা সেই শৈশব ঘেরা বাড়িতে। কতটা বাবার ভালো লেগেছে তা আমি বাবাকে দেখেই বুঝতে পারছি। আমি জানি বাবা শেষ নিঃশ্বাস পর্যস্ত এই বাড়িতেই থাকবেন। এখানেই তিনি খুঁজে নিবেন শেষ ভালোবাসা। বাবার ঝলমলে চেহারাটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেল দুইটা কবর দেখে। হয়তো প্রত্যেকটা সন্তানই বাবা মাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। ভেতরে গুমরে গুমরে কাঁদে। কারণ পৃথিবীতে একমাত্র নিরাপদ এবং ভরসার স্থান হলো এই বাবা মার কোল। চেষ্টা করছি বাবা ভালো থাকুক। আমি চাই বাবা তার সব ভালো লাগাগুলো নিয়ে বাঁচুক। আর আমি বাঁচি আমার বাবা মার মমতার বন্ধনে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বন্ধন


আরও
আরও পড়ুন