Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

পথ নির্দেশ - মহানবী (সা.)-এর বাংলাদেশি মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা

প্রকাশের সময় : ২৬ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ওবায়দুল হক মিয়া
সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের নিকট একমাত্র ইসলাম ধর্মই মনোনীত জীবন বিধান, যাতে মানব জাতির জন্য ইহকাল ও পরকালীন জীবনের সুখ-শান্তির নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মগুলো মানব-রচিত বিধায় নানা ধরনের ভুল-ভ্রান্তিতে ভরপুর। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ মহামানব। একজন আদর্শ মানুষের যত প্রকার সৎগুণাবলী থাকা প্রয়োজন, তাঁর মধ্যে সকল প্রকার গুণাবলী ছিল বিধায় প্রখ্যাত মার্কিনি মুলুকের লেখক মাইকেল হার্ট তার অমর গ্রন্থ “দি হানড্রেড”-এ বিশ্ব বিখ্যাত মনীষীদের জীবন চরিত্র লেখার সময় সর্বগুণে গুণান্বিত মহানবী (সা.)-এর জীবনীকে সর্বপ্রথম স্থান দিয়েছেন। যারা আল্লাহপাককে এবং তার প্রেরিত মহাপুরুষ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এবং ইসলাম ধর্মের সকল প্রকার বিধিনিষেধ মেনে চলে তারাই মুসলিম উম্মাহ হিসেবে অভিহিত।
যাক, মহানবী (সা.) আমাদের বাংলাদেশি মুসলমানকে অধিক ভালোবাসেন সে সম্বন্ধে আমরা দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা করা প্রয়োজন মনে করি।
আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে অসভ্য-বর্বর আরববাসীকে শান্তির ধর্ম ইসলামে দীক্ষিত করার লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধবিগ্রহ মোকাবিলা ছাড়াও মানুষের ঘরে ঘরে, দ্বারে দ্বারে বারে বারে দেখা-সাক্ষাৎ করে ইসলাম ধর্মের উদার নীতি সম্পর্কে দাওয়াত পেশ করা হতো; ফলে মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবা কেরামগণের মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বহু আরববাসী ইসলাম ধর্ম কবুল করে খাঁটি মুসলমান হতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যে অর্ধ পৃথিবীর একমাত্র শাসনকর্তা, যার আমলে তিন হাজার ছয়শত শহর তাঁর অধীনে ছিল; হযরত ওমর (রা.) ৪০ নং মুসলমান হিসেবে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন প্রকাশ্য দাওয়াতের মাধ্যমে।
উল্লেখ্য, মহানবী (সা.) তাঁর মক্কা-মদিনা জীবনে বহুজামাত আরব দেশের মধ্যে এবং বাইরে প্রেরণ করেছেন যেমনভাবে বর্তমান যুগে তাবলিগের জামাতের মাধ্যমে স্বদেশে এবং বিশ্বের দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষকে ইসলাম ধর্মে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে নিজেদের জানমাল হায়াত ব্যয় করে আল্লাহকে রাজি খুশি করাই একমাত্র লক্ষ্য। যাক, মহানবী (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় আমাদের মাতৃভূমিতে ৬২১ খ্রি. চার সদস্যবিশিষ্ট এক জামাত প্রেরণ করেছিলেন। এ জামাতের আমির ছিলেন মহানবী (সা.)-এর আপন ছোট মামা যিনি তৎকালীন আরবের বুকে বিখ্যাত পালোয়ান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাঁর নাম হজরত সাদবিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)। ওই জামাতটি পদব্রজে দীর্ঘ তিন বছর সর্বত্র ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষকে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত করেছিল। সূত্র : কোরআন ও হাদিসের আলোকে তাবলিগের প্রশ্ন উত্তর পৃষ্ঠা নং ৭১, গ্রন্থকার প্রফেসর এম এস সালেহীন।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়বস্তু হলো যে, আমাদের অজ্ঞতার কারণে আমরা বর্তমান প্রচলিত তাবলিগ জামাতের কার্যক্রমকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে থাকি অথচ বিগত চৌদ্দশত বছরের পূর্বে এ জামাত মহানবী (সা.)-এর হাতে গড়া এবং অব্যাহত গতিতে বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ জামাত পৌঁছে ছিল। উল্লেখ্য, বিশ্ব বিখ্যাত পারস্য বিজয়ের সময়কাল হজরত ওমরের খেলাফত কাল; আর সেনাপতি ছিলেন হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাছ (রা.)। পারস্য বিজয়ের পর তিনি আবার পদব্রজে দাওয়াতের কাজে বের হন এবং চীন দেশের কোয়াংটায় তিনি নিজ হাতে মসজিদ নির্মাণ করেন। তাবলিগের কাজে জীবন ব্যয় করেন এবং কোয়াংটা বন্দরে তার মাজার অবস্থিত। (তথ্য : পূর্বের সূত্র)
মহানবী (সা:) কর্তৃক আমাদেরকে ভালোবাসার অন্য একটি বিশ্ব বিখ্যাত ঘটনা সম্মানিত পাঠক সমাজে উপস্থাপন করছি। সেটা হলো হজরত শাহজালাল (রহ.) কর্তৃক বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের কাহিনী। হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর জন্মস্থান ইয়ামেন দেশে হওয়ার কারণে তাকে ইয়ামেনী বলা হয়। তিনি এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অত্যন্ত প্রখর মেধাশক্তি ছিল তার এবং চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে হাফেজে কোরআন ও হাদিস শাস্ত্রে বুৎপত্তি লাভ করেন। শোনা যায়, তিনি জন্মগত অলি ছিলেন এবং মদিনা শরিফে হাদিস শাস্ত্রে শিক্ষাদান করতেন সময়কাল ছিল ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ। সে সময় বাংলাদেশের সীমানা বিস্তীর্ণ ছিল। ওই সময়ে এদেশের নাম ছিল ত্রিপুরা রাজ্য। রাজা গৌর গোবিন্দ ছিল শাসনকর্তা। তার রাজধানী ছিল সিলেটের পাহাড়ের ওপর। ওই সময় মুসলমানদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ ছিল। মুসলমানগণ নানা কারণে রাজরোষে আক্রান্ত হতো; তাদের ফরিয়াদ আল্লাহর দরবারে উঠে ছিল। দয়ার সাগর মহানবী (সা.) হজরত শাহজালাল (রহ.)-কে ইসলাম প্রচারের জন্য স্বপ্নযোগে আদেশ দিলেন। হজরত শাহজালাল (রহ.) আরো কতিপয় সঙ্গী-সাথীসহ সুদূর সিলেট অঞ্চলে পদব্রজে পাড়ি জমালেন। আল্লাহপাকের একান্ত প্রিয় বান্দাদের পক্ষে অজানা-অচেনা বন্ধুর পথ অতিক্রম করা মোটেও কঠিন ছিল না।
পথিমধ্যে আল্লাহপাকের এ সৈনিক কাফেলা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তার অশেষ রহমতের ফলে সকল প্রকার বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল এবং পরিশেষে রাজা গৌর গোবিন্দের রাজধানীর সন্নিকটে পাহাড়ের তলদেশে ওই কাফেলা উপস্থিত হল। কথিত আছে ওইসব আল্লাহর মাহবুব বান্দাগণ ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত হলেন এবং একপর্যায়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) এক অলৌকিক আকর্ষণীয় সুরে সালাতের আজান দেয়ার সাথে সাথে ওই রাজবাড়িটি ভেঙে চূরমার হয়ে গেল। এক ভয়াবহ দৃশ্যের আলামত প্রকাশ পেল। জুলুম-অত্যাচারের অবসান হলো। হজরত শাহজালাল ও তার সঙ্গী-সাথীগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইসলামের প্রচারকার্য শুরু করলে বহু লোক দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলো। আমরা হজরত শাহজালালের বাংলাদেশের আগমন ও ইসলাম প্রচারের নির্ভরযোগ্য বিবরণ জানতে পারি মরক্কো দেশীয় বিখ্যাত ভূপর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে। ইবনে বতুতা প্রায় সাতশত বছর পূর্বে ভারত স¤্রাট মোহাম্মদ বিন তুঘলকের সময় বেশ কিছু দিন স¤্রাটের দরবারে দিল্লিতে বিশেষ মেহমান হিসেবে অতিবাহিত করেন। পরে তিনি ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে শীতকালে হজরত শাহজালালের সন্ধানে বের হন এবং পানির জাহাজযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছেন এবং হেঁটে সিলেট অভিমুখে রওনা হওয়ার তিন-চার দিন পর হজরত শাহজালালের লোকজন তাকে পথিমধ্যে খুঁজে বের করেন। হজরত শাহজালাল (রহ.) তার চার শিস্যকে এই বলে পাঠালেন যে, “একজন বিদেশি মেহমান আমার বন্ধু আমার সাথে দেখা করতে আসতেছে, তোমরা তাকে অভ্যর্থনা করে আমার সাথে হাজির করাও”। এটা অবশ্য তার কারামতি বা অলৌকিক ক্ষমতা ছিল।
ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনীর বর্ণনা মতে, তিনি হজরত শাহজালালকে একটি পাহাড়ের বিরাট গুহার মধ্যে দেখা করালেন, অতিশয় লম্বা কৃশ দেহ সর্বদা ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত, চারদিকে ভক্ত বৃন্দের অভাব নেই; চিরকুমার ছিলেন, সারা বছর রোজা রাখতেন একটা দুধের গাভী পালতেন, ওই গাভীর দুধ দ্বারা তিনি হালাল রিজিকের মাধ্যমে ইফতার করতেন। তিনি ১১৯ বছর বয়সে এ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন। ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি সকলের সামনে হাসিমুখে বিদায় গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য তার সঙ্গী-সাথীগণ সকলেই এদেশে ইসলাম প্রচার করে এদেশেই নিজেদের কবর রচনা করে গেছেন।
হজরত শাহ পরান হজরত শাহ মাখদুম (রহ.), হযরত শাহ খানজাহান আলী (রহ.) প্রভৃতি অলি আল্লাহগণ এদেশে ইসলাম প্রচার ও দাওয়াতের কাজে এসে এদেশেই স্থায়ীভাবে করব অবস্থান করছেন তার সঠিক তথ্য বর্ণনা করা দুষ্কর; তবে এ কথা অবশ্য সত্য যে, ওইসব অলি বুজুর্গ ব্যক্তির এদেশে ইসলাম প্রচারের কারণে শতকরা ৮০ জন মুসলমান অধিবাসী। এমন কি এত মুসল্লি, এত মসজিদ, এত মাদ্রাসা ও খানকাহ অন্য কোনো দেশে আছে কিনা বলা মুশকিল। মহানবী (সা.) আমাদের দেশকে ভালোবাসেন। তাঁরই দয়া অনুগ্রহ ও নেক দৃষ্টিতেই আমরা আয়তনে ছোট্ট দেশে হলেও পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে মুসলমান হিসেবে অবস্থান করছি। আল্লাহপাক এ দেশ ও অধিবাসীকে হেফাজত করুন। আমিন



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ