Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০১ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

নদী কেন ডাস্টবিন হবে

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন | প্রকাশের সময় : ৭ মে, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

মানবসভ্যতার বিকাশের সাথে নদীর স¤পর্ক অঙ্গাঙ্গী। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর সভ্যতার। এছাড়াও পরবর্তীতে হাট-বাজার, কল-কারখানা এসব গড়ে উঠে নদীকে ঘিরেই। প্রথম দিকে নদীতে চলত পালতোলা নৌকা। পরবর্তীতে লঞ্চ, জাহাজ চলতে শুরু করে। মূলত কল-কারখানা এবং লঞ্চ-জাহাজের কারণে নদীর পানি দূষিত হতে শুরু করে। সভ্যতার বিকাশের জন্য এটা স্বীকার করা ছিল না। ক্রমশঃ জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে মানুষের মল-মূত্র ও গৃহ ময়লার পরিমাণ। সব আবর্জনার গন্তব্য হলো নদী। যারা নদীর পাশে থাকে তারা সরাসরি বর্জ্য ফেলে নদীতে। আর যারা দূরে থাকে তারা ড্রেন বা খালের মাধ্যমে বর্জ্য ফেলে নদীতে। সমস্যা আরো ভয়াবহ হলো যখন মানুষ আবাসন সংকট দূর করার জন্য নদীতীর দখল করে ভবন নির্মাণ শুরু হলো। এর ফলে নদীর প্রবাহ আরো সংকুচিত হলো। আর শহরের খালগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। এখন শহরের মধ্যে ড্রেন বা নর্দমা আছে কিন্তু সেগুলো কঠিন বর্জ্য দ্বারা এতো ঠাসা থাকে যে, তরল বর্জ্য সহজে যেতে পারে না। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়।
বলা হয়, আজ থেকে ৫০ বছর পূর্বেও বুড়িগঙ্গা নদীতে শুশুক বা ডলফিন দেখা যেত। পানি ছিল স্বচ্ছ। পাল তোলা নৌকা চলাচল দেখতে মানুষ বুড়িগঙ্গার তীরে বেড়াতে আসত। আমি অবশ্য সে বুড়িগঙ্গা নদীকে দেখিনি। ৩০ বছর পূর্বে সদরঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা লঞ্চের কারণে এবং ঢাকা শহর থেকে আগত বর্জ্যের কারণে নদীর পানি কালো দেখাত। আর আজ এ নদীকে মরা নদী বলা হচ্ছে। শুধু বুড়িগঙ্গা নদী নয়, ঢাকার চারপাশের সব নদীর অবস্থাও একই রকম। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ২৯টি নদীর দূষণ স্বাভাবিক মাত্রা অতিক্রম করে গেছে অনেক আগেই। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস একটি জরিপ চালিয়েছে, তাদের ১৩২টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে। এছাড়া মাঠ জরিপ ও ভ‚-উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে এই ২৯টি নদীকে সনাক্ত করা হয়েছে। নদী দূষণের অনেক কারণ রয়েছে। তবে সবগুলো কারণই মানবঘটিত। আমাদের দেশের প্রায় সকল কল-কারখানা নদীর তীরে অবস্থিত। মূলত নদীপথে পরিবহনের সুবিধার কারণে সেখানে কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ কোনো প্রকার পরিশোধন ছাড়াই নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এ কাজটি নিয়মিতই ঘটছে। অর্থাৎ প্রতিদিনই বর্জ্য পতিত হচ্ছে। এসব বর্জ্য স্বাভাবিকভাবেই নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থযুক্ত, যা জলজ প্রাণিদের জন্য বিপজ্জনক। পাশাপাশি আমাদের জন্যও ক্ষতিকর। এ নদীর পাশে এক সময় ট্যানারি শিল্প ছিল। এ শিল্প হতে মাসে গড়ে ৩ হাজার মেট্রিকটন কঠিন বর্জ্য ও আড়াই লাখ টন তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে পড়ত। শুধু এই একটি শিল্পই এই নদীকে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট। এ শিল্প এখন স্থানান্তরিত হয়ে সাভারে গিয়েছে এবং সেখানেও ধলেশ্বরী নদীকে দূষিত করে চলেছে। বুড়িগঙ্গা নদীর মতো ঢাকার চারপাশের সব নদীই এখন ভয়ংকরভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে ৪.৫ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি পতিত হয়। ঢাকার মতোই বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় শহর নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে। ফলে বড় শহরের পাশে প্রবাহিত নদীগুলো চরমভাবে দূষিত হচ্ছে। এসব নদীতে এখন মাছের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। আবার যেসব মাছ এখানে কোনরকমে টিকে আছে তা খাওয়া কোনভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়। কারণ এসব মাছ দূষিত পানি থেকে রাসায়নিক পদার্থ তাদের শরীরে ধারণ করে থাকে। দূষিত নদীর পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পানিতে মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিন, দস্তা, নিকেল, সিসা, ফসফোজিপসাম, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি রয়েছে। এসব উপাদান আমাদের নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করে থাকে। যেমন জন্ডিস, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালি ও কিডনি সমস্যা, চর্মরোগসহ ক্যান্সার ইত্যাদি। গর্ভস্থ সন্তানের উপরও এসব উপাদান প্রভাব ফেলে। এগুলো বিশেষ করে পারদের কারণে সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে।
শুধু শহরের নদীগুলো দূষিত হচ্ছে এমনটি নয়। গ্রামেও নদী দূষণ হয়। কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণেও নদীসহ সকল জলাশয় দূষিত হচ্ছে। নদীদূষণের কারণে আমরা এখন আর ভ‚উপরিভাগের পানি পান করতে পারি না। আমাদেরকে গভীর নলক‚পের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অগভীর নলক‚প বা কুয়া ব্যবহার হতো একসময়। আর্সেনিক সমস্যার কারণে সেটি আমাদের বাদ দিতে হয়েছে। এখন আমরা গভীর নলক‚প থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে থাকি। এতেও এখন বিপর্যয় ঘটেছে। ঢাকা শহরে প্রায় ৮৬ ভাগ ভ‚গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। এর ফলে প্রতি বছর পানির স্তর ২ হতে ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। সা¤প্রতিক একটি গবেষণায় আরেকটি বিষয় জানা গেছে। সেটি হলো, জীবাণুর সংক্রমণ। পানির পাইপের সাহায্যে গভীর তলদেশের পানিতে জীবাণু চলে যাচ্ছে। ফলে সেখানকার পানিও পানের অযোগ্য হয়ে যাবে একসময়। এটি অত্যন্ত বিপদের একটি বিষয়। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে আবার ভ‚উপরিভাগের পানির উপর নির্ভর করতে হবে। এটি সু¯পষ্ট যে, আমাদের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এগুলোকে দূষণমুক্ত অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। কাজটি কঠিন হলেও এছাড়া আমাদের বিকল্প কম। লক্ষ্যে সরকার একটি মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করেছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণমুক্ত করা হবে। এগুলোর নাব্য বৃদ্ধি করা হবে। লন্ডনের টেমস নদী শহরের বর্জ্য দ্বারা একসময় পুরোপুরি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। সেটি আজকের সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে প্রায় ৫০ বছর লেগেছে। আমরা আশাবাদী, আমাদের নদীগুলোও আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রাণবন্ত নদীগুলো দেখতে পারবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা সরকারি কলেজ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নদী

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন