Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২৪ জুন ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির জন্য হাহাকার

সায়ীদ আবদুল মালিক | প্রকাশের সময় : ১৩ মে, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

রমজানের শুরু থেকেই তিব্র পানি সঙ্কটে পড়েছে রাজধানীবাসী। গ্রীষ্মের দাবদাহ ও রমজানের কারণে পানির অতিরিক্ত চাহিদা বেড়েছে। সে চাহিদার আলোকে পানির সরবরাহ বৃদ্ধির পরিবর্তে কমেছে। অনেক এলাকায় দৈনন্দিনের রান্না ও গোসলের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় মসজিদেও পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মুসল্লিরা অজু করতে গিয়ে পড়ছে বিপাকে। মহল্লায় মহল্লায় পানির জন্য হাহাকার চলছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও পাম্প ঘেরাও করছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ওয়াসার একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারীর বিরুদ্ধে পানি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এক গাড়ি পানির দাম ৫০০ টাকা হলেও দেড় হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে কোনো কোনো এলাকায়। পানি না পেয়ে অনেকে মিনারেল বোতলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনেকেই গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আসছেন আত্মীয়র বাসা থেকে। হাতিরঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন পুকুর এবং লেকেও কাউকে কাউকে গোসল করতে দেখা গেছে।
গতকাল সকাল থেকে মিরপুরবাসী সেকশন ১১-এর পানির পাম্পের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। খবর পেয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম মানিক এলাকার গণ্যমান্যদের নিয়ে সমস্যা মোকাবেলায় আলোচনায় বসেন। সভায় আপাতত পানি সমস্যা সামাধানে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিনের বিভিন্ন সময়ে পানি সরবরাহ করা হবে। এর আগে গত শুক্রবার পাম্পের এক কর্মীকে লঞ্ছিত করেন স্থানীয়রা। গত শনিবার পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন রামপুরার বাসিন্দারা। গত কয়েকদিন ধরে রামপুরা ও হাতিরঝিলসংলগ্ন এলাকায় পানি নেই। এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তারা দুপুর আড়াইটা থেকে বিকাল প্রায় ৪টা পর্যন্ত সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন।
এতে করে রামপুরা-বাড্ডা ও প্রগতি সরণিতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসী জানান, গত দু’দিন ধরে রামপুরা ও হাতিরঝিলসংলগ্ন এলাকায় পানির জন্য হাহাকার চলছে। পানি সাপ্লাই দেয়া হবে বলা হলেও পানি আর আসছে না। বাধ্য হয়ে তারা সড়ক অবরোধ করেছেন। এক বিক্ষোভকারী বলেন, পানির বিল তো কোনো মাসে বকেয়া রাখে না ওয়াসা। আবার কোথাও কোথাও পানির জন্য প্রিপেইড মিটার বসানোর কথা বলা হচ্ছে। বিল নেবেন নিয়মিত, পানি দেবেন না- তাতো মেনে নেয়া যায় না। আন্দোলনে অংশ নেয়া গৃহবধূ রাফিয়া বেগম বলেন, এমনিতেই গরম, তার ওপর পানি নেই। পানি কিনে গোসল করা, খাওয়া, রান্না কি খুব সহজ কথা! দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না ওয়াসা। তাই আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের রামপুরা জোনের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এলাকাবাসী আধা ঘণ্টার মতো রাস্তা অবরোধ করেছিলেন। রোজাদার, পথচারী, যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে বলে অনুরোধ করে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (টেকনিক্যাল) একেএম সহিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, রামপুরা-মধুবাগ এলাকায় পানির সমস্যা নিয়ে এলাকাবাসী আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। কিন্তু, শুনলাম তারা পানির জন্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন, যা দুঃখজনক। ওই এলাকার পানির সমস্যার সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সাথে সাথেই পানির হাহাকার বাড়ছে বাড্ডা রামপুরা এলাকাবাসীর। আর তিব্র দাবদাহের মধ্যে রমজান মাসে এমন দুর্ভোগে যেন দিন কাটানোই দায়। বাধ্য হয়ে প্রতিবাদ করেও, মিলছে না কোনো ফল। রাজধানীর বাড্ডার প্রায় প্রতিটি বাসা-বাড়ির টাঙ্কিতেই এখন পানি নাই। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ আর রোজার মধ্যেই চলছে পানির এমন হাহাকার। উত্তর বাড্ডার চ-ব্লকের পাম্পের সামনে গত শনিবার সকাল থেকেই জড়ো হন সাধারণ মানুষ। একটুখানি পানির দাবি যেন সব চাহিদাকে হার মানায়। বাধ্য হয়েই ওয়াসার পাম্পে থাকা ফায়ার সার্ভিসের জন্য নির্ধারিত লাইন থেকে কিছুটা পানির ব্যবস্থা করা হয়। তবুও দীর্ঘ হয় লাইন। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, পানির স্তর ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাসুম গনি বলছেন, বিষয়টি জানানো হয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষতে তবে পুরো সঙ্কট কাটতে কিছুটা সময় লাগবে।
মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, টানা ৮ থেকে ৯ দিন ধরে পানি নেই এই এলাকায়। কোনো কোনো বাড়িতে একটু পানি আসে, তাও সঙ্গে সঙ্গে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এই রমজানে প্রচন্ড গরমে গোসল নেই, হাতমুখও ধোয়া যায় না। হঠাৎ করে কিছু পানি আসলে সেটা অনেকটাই ঘোলা। ফলে সেই পানি দিয়ে না হয় খাওয়া, না চলে গোসল। ওয়াসায় অভিযোগ করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ দিয়েও কাজ হয় না। আমরা তাদের কাছে গেলে উল্টো তাদের নানা সমস্যার কথা শুনতে হয়।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল মুকিত বলেন, আমার বাসা রাজধানীর শেওড়াপাড়ায়। সেখানে টানা ১৫ দিন ধরে পানি নেই। ভোররাতে আধাঘণ্টা সময় ধরে পানি আসে, সেটা দিয়ে গোসল হয় না। বউ-বাচ্চা নিয়ে বিপদে আছি। অফিস করে বাসায় গিয়ে স্বাচ্ছন্দে পানি ব্যবহার করে ফ্রেস হবো সে সুযোগ নেই।
রাজধানীর দনিয়া-কদমতলি এলাকায়ও গেল টানা ১০ দিন ধরে নেই পানি। ওই এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, ওয়াসার সাপ্লাই পানি বলতে গেলে একেবারেই আসে না। আমরা গ্যালনে ভরে অন্য জায়গা থেকে একটু করে পানি আনি।
বেশ কয়েক দিন ধরে গোসল করা হয় না। অন্য জায়গা থেকে পানি এনে কোনরকম হাত-মুখ ধোয়ার কাজ চলে। তিনি জানান, দনিয়ার গোবিন্দপুরেও নেই পানি। সেখানকার মানুষেরও একই অবস্থা। আমরা বারবার ওয়াসার লোকদের বলেছি। তারা বলছে, গরমে প্রোডাকশন কম, তাই পানির এ অবস্থা। তারা শুধু বলে সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু গত দশদিনেও পানি পাচ্ছি না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দনিয়ার গোবিন্দপুর এলাকায়ও বেশ কিছুদিন ধরে পানি নেই। রমজান মাসে এমন পানি বিড়ম্বনা সামলাতে ওই এলাকার বাড়ীর মালিকরা গতকাল মিটিং করেছেন।
এদিকে পুরার ঢাকার লালবাগ এলাকার পানি ঘোলাটে, দুর্গন্ধযুক্ত বলে অভিযোগ করেছেন আলম হোসেন চৌধুরী নামের ঐ এলাকার এক বাসিন্দা। তিনি বলেন, একদিকে পানিই আসে না, যতটুকু আসে তাও ঘোলা এবং দুর্গন্ধময়। ফলে আমরা সেই পানি দিয়ে কোনো কাজই করতে পারছি না। পানিতে হাত দিতেই ঘৃণা হয়।
এদিকে নিরাপদ পানি আন্দোলনের মুখপাত্র মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, দেখুন রাজধানীর জুরাইনে আমাকে গতকার সকালে এক ব্যক্তি বললেন, আমাদের এ এলাকায় পানির ভয়াবহ সমস্যা বিরাজ করছে। এর কোনো উন্নতি নেই। তিনি ওই এলাকায় ৪০ বছর যাবৎ বসবাস করে আসছেন। মিজানুর রহমান বলেন, ওয়াসার পক্ষ থেকে যেসব কথা বলা হয়, যেমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি, অথবা দেখছি, সমাধান হয়ে যাবে। এসব তাদের দুর্বল কথা। এসব বলে তারা পার পেতে পারে না। অনেক সময় মানুষের আন্দোলনের চাপে তারা পানি সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা এর কোনো সমাধানই করছে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পানি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ