Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার , ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১ পৌষ ১৪২৬, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

মৌসুমের সময়ও হালদা নদীতে নানা অনাচারের কারণে ডিম দিচ্ছে না মা-মাছ

প্রকাশের সময় : ২৮ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আসলাম পারভেজ, হাটহাজারী : এশিয়ার বিখ্যাত মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদী। মৎস্য সম্পদের ভরপুর এই হালদা নদী জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। জাতীয় মাছ রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ পোনার জন্য এই নদীর আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য/কদর থাকলেও যথাযথ উদ্যোগের কোনো পরিকল্পনা না থাকায় প্রাকৃতিক এই মৎস্য ভাÐার বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। হালদা নদীকে নিয়ে বহু ইতিহাস গড়ে উঠেছে। হালদার জন্য প্রাণও দিতে হয়েছে বহু মানুষের। এই হালদা নদীকে মা-মাছের মেটারনিটি ক্লিনিক বলেও ধরা যেতে পারে।
প্রাচীন কালে হালদা নদীকে সাগর বলা হতো। আনুমানিক ২৫০-৩০০ বছর পূর্বে মেঘনা, যমুনার ন্যায় হালদা নদী প্রশস্ত ছিল। প্রাকৃতিক নিয়মে উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব দিকে পাহাড় থেকে বর্ষার সময় পলিমাটি জমতে জমতে চরের সৃষ্টি হয়। তা বর্তমান পর্যায়ে খালের রূপ ধারণ করেছে। হালদা নদী চট্টগ্রাম জেলাসহ ত্রিপুরা রাজ্যের উদয় নগরের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালুরঘাট, সিকি মাইল পূর্বদিকে গণ্যের মার ঘাটে বা হাটের নিকট কর্ণফুলি নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কর্ণফুলীর নামে বঙ্গবসাগরের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হালদা নদী আসাম, ত্রিপুরা রাজ্য, বাংলাদেশ ও আরাকানের নিকট সুপরিচিত। প্রাচীনকালে মাছের পোনার ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র স্বরূপ। এক কালে এত প্রসিদ্ধ লাভ করেছিল যে, পদ্মার ইলিশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি ও দিনাজপুরের নাম করা চালকেও হার মানাত। হালদা নদীর মাছের পোনা না হলে কেউ ক্রয় করত না। আসামের আক্রোপ অঞ্চলে এই নদী মাছের পোনা বিক্রির জন্য নেয়া হতো। কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও ফেনী এলাকার লোকদের নিকট হালদা নদীর মাছের পোনার খ্যাতি রয়েছে। এই হালদাতে একমাত্র জোয়ার ভাটা হয়ে থাকে। মগ ফিরিঙ্গি কবি সাহিত্যিক সুলতান নশরত শাহের আমলে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইন্দারে ঘাটের পশ্চিমে তৎকালীন সত্তার ঘাট দলই নগরকে হালদা ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি নতুন খাল খনন করা হয়েছিল। বাড়িঘোনা ৭ মাইল হালদা ভরাট হয়ে চর জাগা আরম্ভ হয়। এই ৭ মাইল এলাকার নাম পুরাতন হালদা বলা হয়।
হালদা নদীর রুপালি মৎস্য সম্পদের খনিখ্যাত হালদায় ডিম ছাড়তে মৌসুমের সাঙ্গু মাতা মুহুরী ও কর্ণফুলি নদী থেকে মাতৃত্বের টানে হালদার মিষ্টি পানিতে চলে আসে কার্পসৃ, রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ মাসে পূর্ণিমা তিথিতে প্রবল বর্ষণ আর মেঘের গর্জনের যে কোনো এক মুহূর্তে মাতৃমাছেরা নদীতে ডিম ছাড়ে। ডিম সংগ্রহ করতে প্রস্তুত থাকে নদীর তীরবর্তী এলাকার ডিম সংগ্রহকারীরা। তারা ডিম সংগ্রহ করতে ডিম ছাড়ার সাথে সাথে হালদা নদীতে মশারী জাল দিয়ে হালদার বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় প্রবল জোয়ারের ঢল থেকে জাল ফেলে ডিম তুলে নেয় নৌকাতে। এর আগে নৌকার মাঝামাঝি দু’পাশে দুটি তক্তা দিয়ে তৈরি করে নেয় নৌকা পুকুর। এতে পাতলা জাল দিয়ে নৌকাতে তৈরি করা পুকুরে ডিম গুলো রাখা হয়। হালদা তীরবর্তী ধানী জমিতে মাটির কুয়া করে পানি দিয়ে ডিম গুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। সনাতন পদ্ধতিতে ডিমগুলোকে ৭-৮ মিনিট পর কুয়াতে পরিস্ফুটনের জন্য নাড়া দেয়। নাড়া দেওয়ার অর্থ ডিম গুলো জালের নিচে পানির মধ্যে চলে যাওয়া। সেই মুহূর্তে রেণুর রং সাদা আকার ধারণ করে। এভাবে কুয়ার পানি পরিবর্তন করতে হয়। ১০-১২ ঘণ্টা পর এদের চোখ ফুটে ও পূর্ণতা লাভ করে। তখনো চিহ্ন করা যায় না। ৪-৫ দিন পর পূর্ণতা লাভ করার পর বাজারজাত করা হয়। সনাতন পদ্ধতিতে ডিম ফুটাতে গিয়ে বহু ডিম নষ্ট হয়ে যায়। ডিম থেকে রেণু ফুটানোর পানিসহ প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৩২/৪০ হাজার টাকা। এই রেণু নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা হতে লোকজন আসে। এই সময় হালদার পাড়ে উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এভাবেই তীরবর্তী লোকজন ডিম সংগ্রহ করতে থাকে। বর্তমান যুগে হালদা নদী থেকে ডিম কম পাওয়ার কারণ হয়েছে প্রতিরাতে চুরি করে মাছ ধরা, ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল, সহ বিগত ৬০ বছরের চারটি বাক কেটে ধ্বংসের ধার প্রান্তে নেয় হালদার নিরাপদ মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। কয়েকজন মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে সাধারণত হালদা অক্সো-বো বাঁকগুলোতে রুই জাতীয় মাছ ছাড়ে। বাকের পানি ওলোট-পালটের মাধ্যমে মা-মাছের সাথে পুরুষ মাছের শংক্রাণু ভালোভাবে মিশ্রণ হয়। কিন্তু বাক কেটে নদীর ¯্রােত বৃদ্ধি পাওয়াতে মা মাছের নিরাপদ স্থান ধ্বংসের পাশাপাশি ডিম সংগ্রহেরও অসুবিধা দেখা দিয়েছে। এই পর্যন্ত হাটহাজারী রাঙ্গামাটি সড়ক সংলগ্ন সত্তার ঘাট এবং চট্টগ্রাম কাপ্তাই সড়কের মদুনাঘাট পর্যন্ত চারটি বাক কেটে দেয়। হালদা নদীর প্রথম বাক কাটা হয় হাটহাজারীর বাড়িঘোনা। ১৯৪৭ সালে বাক কেটে বাড়িঘোনাকে হাটহাজারীর মূল ভূখÐ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এর পর থেকে পুরো বাড়িঘোনা ছোট একটি দ্বীপে পরিণত হয়। বাঁক কাটার পূর্বে উক্ত এলাকা গুলোতে প্রচুর পরিমাণ ডিম পাওয়া যেতো। বাড়িঘোনা এলাকা মৌসুমের বাকে মিঠা পানিতে ঝাকে ঝাকে মাছ এসে ডিম দিত। বর্তমানে উক্ত স্থানে বাঁক কাটার পর মা মাছের ডিম ছাড়া বন্ধ হয়ে যায়। এতে মাতৃমাছের ডিম ছাড়ার নিরাপদ স্থান বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে স্থান পরিবর্তন করে রাউজান অংকুরি ঘোনার বাকে মা মাছ ডিম ছাড়া শুরু করে। এরপর ১৯৬১-১৯৬২সালের দিকে উক্ত বাকটিও কেটে দেওয়া হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে কেটে দেওয়া হয় ডিম ছাড়ার নিরাপদ স্থান সোনাইয়ের মুখ বাঁক ও গড়দুয়ারা বাঁক। ৯০ সালে কাটা হয় সোনাইয়ের মুখ বাঁক। সর্বশেষ হাত দেয় গড়দুয়ারা বাঁক। যার ফলে এইসব এলাকাতে মাতৃমাছের ডিম ছাড়া দ্রæত কমে যায়।
কয়েকটি সূত্র জানা যায়, বিগত সালের ডিম ছাড়ার মৌসুমের তুলনায় বর্তমানে হালদা নদীতে মা মাছের ডিম দেওয়ার সংখ্যা একেবারে নগণ্য বললেও চলে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৯৪৫ সালে হালদা নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ে ৩২ কোটি ৬০ লাখ। ১৯৪৬ সালে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ। ১৯৭৭ সালে ১৮ কোটি ১০ লাখ। পরবর্তী ১৯৯৭ সালে ৩৩ হাজার ৭৫০ কেজি। ১৯৯৮ সালে ১৪৫৪৭ কেজি। ১৯৯৯ সালে ৬৫ হাজার ৮২০ কেজি। ২০০০ সালে ৭৫ হাজার কেজি। ২০০১ সালে ২২ হাজার ৯২২ কেজি। ২০০২ সালে ২৫ হাজার ৮৩৫ কেজি। ২০০৩ সালে ডিম ছাড়েনি। ২০০৪ সালে ডিমের পরিমাণ ছিল ২ কেজি, ২০০৫ সালে ১২ কেজি, ২০০৭ সালে ৯ হাজার কেজি, ২০০৮ সালে ১২.৯৮ কেজি, ২০০৯ সালে ১১.৮২৯ কেজি, ২০১০ সালে ৩.৬৮৭ কেজি, ২০১১ সালে ১.৫৮৩ কেজি ও ২০১২ সালে ৫.৭০ কেজি। তবে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে ডিম ছাড়ার উপযোগী প্রতি মাছের ওজন সর্বনি¤œ ৫ কেজি থেকে সর্বোচ্চ ১ মণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব মাছ ডিম একবারে ৪/৫ লাখ থেকে ৩০/৪০ লাখ পর্যন্ত।
এদিকে হালদা নদীতে মেজর কাপর্শ যে পরিমাণ ডিম দেয় তার মধ্যে কাতাল ৯০%, রুই-মৃগেল ৯%, কালিবাউশসহ অন্যান্য প্রজাতির মাছ দেয় ১% শতাংশ। ১০/১৫ কেজি ওজনের একটি কাতাল মাছ ডিম অন্তত ৩০ লাখ। ১০/১৫ কেজি ওজনের মৃগেল মাছ ডিম দেয় ২০ লাখ। ১৫/২০ কেজি ওজনের রুই মাছ ডিম ২৫/৩০ লাখের মতো। কাতাল যে পরিমাণ ছাড়ে তাহা থেকে রেণু হয় মাত্র ৭ কেজি। ১ কেজি রেণুর দাম ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজারে মূল্য উঠে। হালদা নদীতে হাত জাল, ভাসা জাল, মশারী জাল, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, অবৈধ বালি তোলার ড্রেজার মেশিন এসবের কারণে হালদা নদী বর্তমানে মা মাছের ডিমবিহীন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় মৎস্য অফিসার রীতিমতো না থাকায় হালদা নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। হালদা নদী রক্ষার্থে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা এগিয়ে আসলেও তারা মূলত লোক দেখানোর জন্য কয়েকটি গান পরিবেশন, হালদা পাড়ের জেলের সামান্য কিছু অর্থ প্রদান করে নামকাওয়াস্তে অনুষ্ঠান করে থাকে। তারা বর্তমান যুগোপযোগী হিসাব করে সরকার ও এনজিও সংস্থাগুলো জেলেদের হালদা নদী মাছ ধরা বন্ধ করে ঋণের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করলে এসব জেলেরা হালদার বড় মাছ গুলো ধরা থেকে বিরত থাকত। জেলেদের বাপ দাদা আমলের পেশা মাছ ধরা। হালদার তীরবর্তীর জেলেরা হালদা নদী থেকে মাছ ধরতে না পেরে অসহায় হয়ে পড়ে। তারপরও রাতে তারা মাছ ধরে থাকে। বর্তমান সরকার হালদার তীরবর্তী জেলেদের চাকরী বা ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারলে তারা হালদার মা মাছ ধরা বিরত থাকত বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। হালদার তীরবর্তী বিভিন্ন জমি রয়েছে। জমিগুলোতে চাষাবাদের সময় রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে থাকে কৃষকরা তাদের কৃষিকাজ ভালো ফলন হওয়ার জন্য। এই বিষাক্ত দ্রব্য বৃষ্টির পানির সাথে হালদা নদীতে পড়ে। তাছাড়া হাটহাজারীর বিদ্যুৎ পিকিং পাওয়ার প্লান্টের তৈলাক্ত দূষিত বর্জ্য ও নন্দীরহাটস্থ চট্টগ্রাম এশিয়ার পেপার মিলের বর্জ্য ও পাহাড়ের চা বাগানে ব্যবহৃত দূষিত বর্জ্যরে কারণে বর্তমান হালদা নদী দূষিত হচ্ছে। যার ফলে বিগত দিনের মতো ডিমও দেয় না হালদার মা-মাছ। বাঁক কাটার ফলে পানির ¯্রােত কমে যাওয়াতে ডিম দেয় না মা মাছেরা। মানুষের গৃহপালিত পশুপাখির বর্জ্যরে কারণে দূষিত হচ্ছে হালদার পানি।
হালদার বর্তমান পরিস্থতি নিয়ে স্থানীয় মৎস্য অফিসার জানান, আগামী অমাবস্যার তিথিতে এই নদীতে মা-মাছ ৩য় দফা ডিম ছাড়তে পারে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ