Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২১ মে ২০১৯, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৫ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

ধান-পাট গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতা

| প্রকাশের সময় : ১৬ মে, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

এক মাসের বেশি সময় ধরে সরকারি পাটকল খাতের শ্রমিকরা বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ আন্দোলন করছে। প্রথমে খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং ঢাকার ডেমরা শিল্পাঞ্চলের সরকারি পাটকল শ্রমিকরা ৯ দফা দাবিতে মাঠে নামলেও তাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় বর্তমানে দেশের ২৬টি সরকারি পাটকলের প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক অনির্দ্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে রাজপথে নেমেছে। পাটকল শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘটের ১১দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের যৌক্তিক দাবী-দাওয়া সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে নানা প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ধারাবাহিক বাম্পার ফলনের মধ্য দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জনের মূল কারিগর ধানচাষিরা সম্ভবত নজিরবিহীন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ‘ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই’ সংবাদপত্রে এমন শিরোনাম প্রায় প্রতিবছরই প্রকাশিত হয়। ধানের উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম হওয়ার কারণে কৃষককে লোকসান গুনতে হয়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল কারিগর কৃষকদের এহেন দুর্দশা ঘোচানোর কোনো দায় যেন সরকারের নেই। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে চলতে এখন কৃষকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বিক্ষুব্ধ কৃষকরা ধান ক্ষেতে আগুন দিয়ে, রাজধানীতে মানববন্ধন করে, রাজপথে ধান ছিটিয়ে ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। এ বছর মাঠ পর্যায়ে যে মূল্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে প্রতি বিঘায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
ধানের বীজ-চারা, চাষ, সেচ, সার, কীটনাশক, ধানকাটা ও মাড়াই শ্রমিকের মূল্য বাবদ একমণ ধান উৎপাদনে যেখানে কৃষককে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা খরচ করতে হয়, সেখানে মাঠপর্যায়ের কৃষকরা ধানের মূল্য পাচ্ছেন সাড়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা কেজি বা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ। অন্যদিকে, এই রমজান মাসে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি মোটাচালের দাম ন্যুনতম দাম ৫০ টাকা। মিনিকেট, নাজিরশাইলসহ অটোমিলে পলিশ করা চালের মূল্য ৬০ টাকার উপরে। অর্থাৎ কৃষকরা তাদের উৎপাদনমূল্য না পেলেও মিলার, পাইকারী ব্যবসায়ী ও খুচরা চাল বিক্রেতারা অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফা করে দরিদ্র ভোক্তাদের পকেট ফাঁকা করে দিচ্ছে। একদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের জমি, শ্রম ও পুজি বিনিয়োগ করে ফসল উৎপাদন করা কৃষকের অর্থনৈতিক মেরুদÐ ভেঙ্গে পড়ছে। একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশে এ ধরনের বাস্তবতা ধ্বংসাত্মক ও আত্মঘাতী। যেখানে কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ করা সরকারের অন্যতম দায়ীত্ব ও কর্তব্য, সেখানে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগানদার সেই ধানচাষিরাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষা ও অবমূল্যায়ণের শিকার। খাদ্য নিরাপত্তা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। ধানের বাম্পার ফলনের উপর ভর করে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ণ হচ্ছে, এ নিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করলেও এই কৃতিত্বের দাবীদার কৃষকদের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা মেনে নেয়া যায় না।
খাদ্য নিরাপত্তাসহ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখনো মূলত কৃষি নির্ভর। কৃষিখাতে ধান ও পাটখাতে উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থায় যে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে তা এসব খাতের সম্ভাবনা ও টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ধান-পাটের ঐতিহ্যকে পেছনে ফেলে তৈরী পোশাক রফতানি খাতকে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতি বছরের মত এবারো ঈদকে সামনে রেখে শত শত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং উৎসব ভাতা প্রাপ্তির অনিশ্চয়তার কারণে অন্তত ২৫০টি গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও সমস্যাপীড়িত গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির সংখ্যা ৭ শতাধিক বলে বিজিএমইএ’র ভিন্ন সুত্রে বলা হয়েছে। যে সব ইন্ডিকেটরের মাধ্যমে বিজিএমইএ এসব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা প্রকাশ করছে তা দূর করে শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন-বোনাস প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ বিজিএমইএ-কেই নিতে হবে। ধান, পাট এবং তৈরী পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদি শক্তি। ধান-পাট চাষি কৃষক, পাটকল ও গার্মেন্ট শ্রমিকদের অর্থনৈতিক মেরুদÐ ভেঙ্গে দিয়ে, ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ে তাদেরকে রাজপথের আন্দোলনে ঠেলে দিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ধানচাষিদের উৎপাদন খরচের নিরীখে ধান-চালের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সাথে পাটের সোনালি যুগ ফিরিয়ে আনতে হলে পাটচাষি ও পাটকল শ্রমিকদের ন্যায্য মূল্য ও মজুরী নিশ্চিত করতে হবে। এই রমজান মাসে, ঈদের আগে চাষি ও শ্রমিকরা রাজপথে বিক্ষোভ করবে, এটা অনাকাংক্ষিত-অপ্রত্যাশিত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন