Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

দূষণ ও নাগরিক বিড়ম্বনা রোধে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৭ মে, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

মশার উপদ্রব, বায়ুদূষণ, পানিবদ্ধতা রোধে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবহেলা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। গত বুধবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান এবং বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ঢাকার বায়ুদূষণ সম্পর্কে আদালতের তলবি আদেশে দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তাদের দেয়া ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে বিচারকরা এই মন্তব্য করেন। নাগরিকরা যথাযথভাবে সব রকম ট্যাক্স পরিশোধ করলেও তারা প্রাপ্য পরিষেবা বা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ এটা তাদের অন্যতম নাগরিক অধিকার। নগরবাসি একদিকে যানজট, পানিবদ্ধতা, অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মত বিড়ম্বনায় নাকাল অন্যদিকে যতই দিন যাচ্ছে নগরীর বাতাসের দূষণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যে ভেজালের ঝুঁকি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উৎকণ্ঠাজনক অবস্থায় পৌছেছে। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এবং খাদ্যপণ্য উৎপাদক শুধুমাত্র মুনাফার জন্য খাদ্যে ভেজালের প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। অন্যদিকে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের যে সব সংস্থা বা কর্মকর্তারা খাদ্য, পানি ও বাতাসের দূষণ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা, তারা কিছুই করছে না। আদালতের পর্যবেক্ষণে এই বিষয়টিই উঠে এসেছে। খাদ্যে ভেজাল, বায়ূদূষণ এবং নাগরিক সমস্যা সম্পর্কে উচ্চ আদালত গত কয়েক সপ্তাহে যুগপৎভাবে বেশকিছু নির্দেশনা জারি করেছে।বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে এসে, বিশেষতঃ মশা নিধন,বায়ূ দূষণ ও পানিবদ্ধতার মত সমস্যা দূর করার পদক্ষেপ ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকেই নিতে হবে বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।

গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইপিএ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৮০টি দেশের বায়ূদূষণের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম। অর্থাৎ বিশ্বে বায়ূদূষণের শিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। এই সংস্থা ২০০৬ সালে প্রথম যখন এই সূচক নির্ণয় করতে শুরু করে তখন বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫তম। এরপর ২০১০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়ায় ১৩৯তম, ২০১৪ সালে ১৬৯ তম, ২০১৬ সালে ১৭৩তম এবং ২০১৮ সালে বায়ূদূষণে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম অবস্থানে দাঁড়ায়। মাত্র একযুগের মধ্যে বায়ূদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ৫৪ধাপ অবনতি ঘটেছে বাংলাদেশের। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো অনেক আগেই বিশ্বের দূষিত ও অকার্যকর নদীগুলোর তালিকায় স্থান লাভ করেছে। এসব নদীর পানির সাধারণ উপযোগীতা এখন নেই বললেই চলে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা, নানা রকম বিষাক্ত রাসায়নিকের দূষণের কারণে এসব নদীতে মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ জন্মাতে পারেনা। একদিকে দূষণ অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন দখলবাজির শিকার হয়ে নদীগুলোও অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এসব নদী রক্ষায়ও আদালত বিভিন্ন সময়ে নানা রকম নির্দেশনা দিয়েছে, যা এখনো চলমান আছে। আদালতের নির্দেশনা ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই ঢাকার নাগরিক বিড়ম্বনা বেড়েই চলেছে। যেখানে শহরের রাস্তায় পানিবদ্ধতা, বর্জ্য ও পয়োঃব্যবস্থাপনা এবং মশক নিধনের মত ট্রাড়িশনাল দায়িত্ব পালনে সিটি কর্পোরেশনগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে পানি ও বায়ূ দূষণরোধের মত অপেক্ষাকৃত জটিল সমস্যা নিরসনে তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে আমরা সন্দিহান। তবে সরকারের সদিচ্ছা ও সহযোগীতা থাকলে এ সব সমস্যা নিরসন করা অসম্ভব নয়।
ঢাকার যানজটসহ বহুমুখী নাগরিক সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, দায়িত্বে অবহেলা ইত্যাদি অভিযোগ রয়েছে বিশিষ্টজনদের। তবে মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি সহযোগী সংস্থাগুলোকে দোষারোপ বা দায় চাপিয়ে দায় এড়ানোতে অভ্যস্থ হলেও সমন্বয়হীনতা দূর করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। এভাবেই বেড়ে চলেছে ঢাকার বায়ূ দূষণ, পানি দূষণ, পানিবদ্ধতা, মশার উৎপাত, দূর হচ্ছে না যানজটের বিড়ম্বনা। ঢাকার নাগরিক দুর্ভোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সেবাখাতের সমন্বয়হীনতার কথা বলা হচ্ছে। সমন্বয়হীনতা দূর করতে কেউ কেউ নগর সরকার প্রতিষ্ঠার দাবীও তুলেছেন। তবে সমস্যার কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত হলেও তা সমাধানে কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। এভাবেই আমাদের গর্বের ঢাকা বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। দূষণের কারণে ঢাকার বাতাস নি:শ্বাস গ্রহণের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, ঢাকার পানি সিসাসহ নানাবিধ রাসায়নিক ও ভারী ধাতব মিশ্রণে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হয়ে পড়েছে। শহরের চাকচিক্য ও নাগরিক সুবিধার জন্য একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে পানি, বাতাস থেকে শুরু করে নিত্যদিনের খাদ্যপণ্য পর্যন্ত ভেজাল ও দূষণের শিকার হয়ে জনস্বাস্থ্য ও বসবাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। বায়ূদূষণ, মশক নিধন, ধূলা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানিবদ্ধতাসহ নাগরিক সমস্যাগুলো দূর করতে সিটি কর্পোরেশনকেই দায়িত্ব নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। বৃহত্তর স্বার্থে আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দূষণ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৩০ এপ্রিল, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন