Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

রংপুর মহাসড়কে ধান ফেলে বিক্ষোভ

হালিম আনছারী, রংপুর থেকে | প্রকাশের সময় : ১৭ মে, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

রংপুর অঞ্চলে এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ধানের মূল্য না থাকায় উৎপাদন খরচ উঠছে না চাষীদের। ফলে ধানের বাম্পার ফলন হলেও হতাশ হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। এনজিও’র ঋণসহ ধার দেনা করে ধান চাষ করে এখন তা শোধ করা দূরূহ হয়ে পড়েছে। ফলে মলিন হয়ে গেছে কৃষকের মুখের হাসি।
রংপুরসহ গোটা উত্তরাঞ্চলে পুরোদমে শুরু হয়ছে বোরো ধান কাটা-মাড়াই। তবে তীব্র সঙ্কট চলছে ধানকাটা শ্রমিকের। চাহদিামত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না ধান কাটা-মাড়াইয়ের জন্য। ফলে জমিতেই পড়ে থাকছে ধান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিগুণ মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিতে হচ্ছে। কিন্তু বাজারে ধানের মূল্য কম থাকায় বিঘা প্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা।
রংপুরসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উত্তরের বিভিন্ন হাট-বাজারে চিকন ধান মণ প্রতি ৫শ’ ৫০ টাকা ও মোটা ধান ৩শ’ ৫০ থেকে ৪শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ধানরে র্বতমান বাজার দর ও কাটা-মাড়াইয়ে অন্য বছররে তুলনায় ২ থেকে ৩ গুণ খরচ বেশি হওয়ায় বোরো চাষীদরে বিঘা প্রতি সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। যাদের ফলন কম হয়েছে তাদের লোকসানের পরিমাণ আরো বেশি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, এক বিঘা জমির ভাড়া ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, সেচ ১ থেকে দেড় হাজার টাকা, হাল চাষ-রোপনে খরচ দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সার-বীজ, কীটনাশক এবং নিড়ানী দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা, কাটা-মাড়াই তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা লাগছে। যা বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগে ১০ লাখ ৪৫ হাজার ৪৯ হেক্টর জমিতে চারা রোপন করে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬২ মেট্রিক টন।
এদিকে, ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে রংপুরে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ও কৃষক সংগঠনগুলো সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছে। ইতোমধ্যে বাসদ এবং কৃষক সংগ্রাম পরিষদ স্মারকলিপি প্রদান, মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর সাতমাথা এলাকায় কৃষক সংগ্রাম পরিষদ রাস্তায় ধান ফেলে সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। অবরোধ চলাকালে কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক আব্দুস সাত্তার বকুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কৃষক সংগ্রাম পরিষদের উপদেষ্টা পলাশ কান্তি নাগ, সদস্য সাত্তার প্রামাণিক, নিপীড়ণ বিরোধী নারী মঞ্চের আহবায়ক নন্দিনী দাস, সদস্য সচিব সানজিদা আক্তার, শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সদস্য সদস্য সচিব সুভাষ রায়সহ প্রমূখ।
সমাবেশে বক্তাগণ বলেন, প্রতি বছর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া কৃষকের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার, ডিজেল, কীটনাশকসহ প্রতিটি কৃষি উপকরণের মূল্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষক আবাদ করতে গিয়ে ঋণের জালে জর্জরিত হচ্ছে। এ বছর প্রতিমণ ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয়েছে ৮শ’ থেকে ৮শ’ ৫০ টাকা। অথচ দাম না থাকায় প্রতি মণ ধান কৃষক ৪শ’ ২০ থেকে ৪শ’ ৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। সরকার প্রতি মণ ধান ১০৪০ টাকা দরে ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত ক্রয় করা শুরু করেনি। এ অবস্থায় সরকারের উচিত মূল্য সহায়তা দিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা।
কৃষক সাত্তার প্রামাণিক বলেন, একমন ধানের মূল্যের চেয়ে একজন কামলার মজুরী বেশী। এক মণ ধান বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংস কিনতে পারি না। সরকার যদি কৃষক বান্ধব হয় তাহলে কৃষকের দুর্দিনে সরকারের ভ‚মিকা কি।
সমাবেশের সভাপতি আব্দুস সাত্তার বকুল, অবিলম্বে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের দাবি জানান। সমাবেশে উপস্থিত কৃষক-কৃষাণিরা শপথ করেন যে এ বছর ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলে আগামী বছর থেকে তারা আর ধান আবাদ করবে না।
এদিকে বিরামপুর (দিনাজপুর) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, বোরো ধান চাষ করে এলাকার কৃষক মহাবিপদে পড়েছেন। কারণ ধান এখন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে! ধানের দাম নেই কে শুনে কার কথা। সরকার ধানের দামের রেট করে দিয়েছে কাগজ কলমে। বাস্তবে বাজারে ধানের আমদানি বেশি তাই আড়ৎদাররা কেউ ধান কিনছে না। কিনলেও তা পানির দামে। অনেক কৃষক হাট-বাজারে ধান নিয়ে গিয়ে ধান বিক্রি করতেই পারছে না। আড়ৎদারদের অজুহাত ধানের দাম নেই, বড় বড় মিল মালিকরা ধান কিনছে না। নিজে কিনে কাকে দেব? অজুহাতের যেন শেষ নেই।
গ্রামগঞ্জের কৃষক তাদের নিজের পরিবারের জন্য, কৃষাণদের খাবারের জন্য ও তাদের মজুরি পরিশোধ করার জন্য ধান বিক্রি করতেই পারছে না। ধান বিক্রি না হবার দরুণ ধান যেন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে দুশ্চিন্তা যেন তাদের কাটছে না। এদিকে সরকার কবে মাঠের কৃষকের ধান কিনবে সবার মুখে একই প্রশ্ন ? বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কৃষকের ধান নিয়ে দুরবস্থার কথা লেখা হলেও কৃষকের কথা শুনার যেন কেউ নেই? ধানের দাম না পেয়ে কৃষক বিক্ষুদ্ধ। লোকশানে পড়েছে কৃষক। ধার-দেনা করে চাষাবাদ করে লাভ কি? আর আমাদের সংবাদ লিখেই বা কি লাভ?



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিক্ষোভ


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ