Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

প্রকৃতির বিরূপ আচরন আর ধানের দর পতনে দক্ষিনাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি সাম্প্রতিককালে নাজুক পর্যায়ে

নাছিম উল আলম | প্রকাশের সময় : ১৯ মে, ২০১৯, ৬:২৩ পিএম

কৃষি নির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক ও কৃষি অর্থনীতির অবস্থা সাম্প্রতিক কালের নাজুক পর্যায়ে। এক সময়ে কৃষি নিয়ে গর্ব করা ‘খাদ্য উদ্বৃত্ত’ দক্ষিণাঞ্চলে ধান এখন কৃষকের গলার কাটা হয়ে উঠেছে। বিগত আমন ও বর্তমান বোরো মৌসুমে লক্ষমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হলেও তার মূল্য নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ আর হতাশার শেষ নেই। পাশাপাশি সারা দেশের সিংহভাগ খেশারী ও মুগডাল উৎপাদনকারী দক্ষিণাঞ্চল এবারো প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ায় কৃষি অর্থনীতির ভীত আরো নরবরে হয়ে গেছে। অনাবৃষ্টিতে খেশারীর উৎপাদন ব্যাহত হবার পরে ফনির বর্ষনে মুগ ও মরিচের ক্ষতি হয়েছে যথেষ্ঠ। এবার মাঘের বর্ষনে তরমুজ ও গোলআলু সহ অনেক রবি ফসল বিনষ্ট হবার পরে অনাবৃষ্টিতে আউশের আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ সারা দেশে আবাদকৃত মোট আউশের প্রায় ২৫ভাগই আবাদ ও উৎপাদন হয়ে থাকে দক্ষিণাঞ্চলে। গত ফেব্র“য়ারীতে বরিনশাল অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬৫% বেশী বৃষ্টি হবার পর থেকে মার্চ ও এপ্রিলে অনাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আবার গত ২ ও ৩ মে ফনির প্রভাবে বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ১শ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও তা মাঠে থাকা উঠতি বোরো, খেশারী ও মুগডাল ছাড়াও মরিচের জন্য যথেষ্ঠ ক্ষতির কারন হয়েছে। চিনা বাদাম সহ আরো বেশ কিছু ফসলের ক্ষতিও যথেষ্ঠ। 

গত ফেব্রুয়ারীতে দক্ষিণাঞ্চলের মাঠে থাকা প্রায় ১লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর মুগ ডালের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর, ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর খেশারী ডালের প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর অতিবৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়। এছাড়াও বিপুল পরিমান গোল আলু, মিষ্টি আলু, সয়াবিন ও চিনা বাদাম সহ বিভিন্ন ধরনের উঠতি তেলবীজের জমিও এ বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে ক্ষতির কবলে পরে। এছাড়াও শাক-সবজি সহ বিভিন্ন ধরনের রবি ফসলের বিপুল পরিমাণ জমিতে পানি জমে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এসময় তরমুজের ক্ষতিও ছিল ব্যাপক। আর এ মাসের শুরুতে ফনির প্রভাবে অতি বর্ষনেও আরেক দফা বিপর্যয়ে পড়েছে দক্ষিনাঞ্চলের কৃষি।
তবে ঘূর্ণিঝড় ফনির প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানির কারনে কৃষকগন মাঠে থাকা উঠতি বোরো ধান সময়ের আগেই কাটতে শুরু করায় ফরিয়ারা সুযোগ বুঝে দাম কমিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে এখন প্রতিমন বোরো ধান ৫শ টাকার ওপরে নয়। অথচ বীজতলা তৈরী থেকে পাকা ধান কর্তন পর্যন্ত প্রতিমন বোরো ধান উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৬শ টাকারও বেশী। ধান কাটার শ্রমিক সংকট সহ অতি মজুরী বোরো ধানের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ফলে কৃষকের এখন মাথায় হাত। অপরদিকে কৃষি মন্ত্রনালয়ের মতে বাংলাদেশে ধান উৎপাদন ব্যয়ের ২৮%-ই সেচ খরচ। যা সারা বিশ্বের মধ্যে সর্বাধীক।
সমাপ্ত প্রায় রবি মৌসুমে সারা দেশে যে ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, তার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের ১১টি জেলায় প্রায় ৪ লাখ হেক্টর। আর উৎপাদন লক্ষ্য রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন। ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রায় ৬৫% বোরো ধান কাটা শেষ হলেও দক্ষিনাঞ্চল সে হার ৮৫%। অথচ ভাটির দক্ষিণাঞ্চলে বোরো আবাদ হয়ে থাকে উত্তর ও মধ্যঞ্চলের দেড় থেকে দুমাস পড়ে। সে নিরিখে ধানা কাটতেও যথেষ্ঠ বিলম্ব ঘটে থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। অন্যান্য এলাকার চেয়ে এবার দক্ষিনাঞ্চলে বোরো ধান কাটায় ২০% এগিয়ে আছে। মূলত ঘূর্ণিঝড় ফনির বৃষ্টিপাতের কারনেই দক্ষিনাঞ্চলে এবার আগাম বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। যা কৃষকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
আর একারনে একসাথে বিপুল পরিমান ধান কৃষকের গোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের ধানের হাটগুলোতে আসায় কারসাজি করে দও পতন ঘটিয়েছে ফরিয়া ও মিল মালিকরা। ফলে ধান এখন কৃষকের গলার কাটা। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের মতে, কৃষকের ঘরে এখনো বিগত মৌসুমের আমন ধান মজুদ রয়েছে। বিগত মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিমন আমন ধান বিক্রি হয়েছে ৬শ থেকে সাড়ে ৬শ টাকার মধ্যে। ফলে একটু অবস্থাপন্ন কৃষক আমন ধান বিক্রি করেন নি ভাল দাম পাবার আশায়। কিন্তু এরই মধ্যে আগাম বোরো ধান উঠতে থাকায় বেকায়দায় কৃষকগন। আর এসুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে মিল মালিক ও তাদের ফরিয়ারা।
তবে ধানের ব্যাপক দর পতন হলেও দক্ষিণাঞ্চলে চালের দাম তুলনামূলক ভাবে কমেনি। খোজ নিয়ে দেখা গেছে, গত একমাসে ধানের দর প্রতিমণ দেড়শ টাকা কমলেও চালের বাজারে কোন সুবাতাস নেই। এখনো সর্ব নিম্নমানের চালের মন ১ হাজার টাকার ওপরে। নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য ‘বিআর-২৮’ বা আঠাশ বালাম চালের কেজি ৩৫টাকা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে ধান ও চালের দরে এ বিস্তর ফারাকও মিল মালিক ও ফরিয়াদেরই কারসাজি। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষক, সাথে ভোক্তাগনও।
এদিকে জমিতে আদ্রতার অভাবে সারা দেশের সাথে দক্ষিণাঞ্চলেও আউশ আবাদ ব্যাহত হয়েছে এবার। ফলে কৃষকগন যথেষ্ঠ দুঃশ্চিন্তায়। তবে মাসের শুরুতে ফণির প্রভাবে বৃষ্টিপাত আউশ আবাদে কিছুটা অনুকুল পরিবেশ সৃষ্ট করেছে। চলতি খরিপ-২ মৌশুমে দেশে যে ১৩ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদের মাধ্যমে ৩৬ লাখ ১৫ হাজার টন আউশ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে, তার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলেই ২ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন লক্ষ্য রয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার টন। কিন্তু মৌসুমের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি আশা ব্যাঞ্জক নয়।
অপরদিকে সারা দেশে যে ১ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমিতে মুগ আবাদের লক্ষ্য ছিল, তার মধ্যে শুধু দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলাতেই আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪৫৫ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ ১ লাখ ৬৮ হাজার টন হলেও তা দু লাখ টন অতিক্রম করতো। কিন্তু দুদফার অতিবর্ষন ও অনা বৃষ্টিতে সে ফসলেরও যথেষ্ঠ ক্ষতি হয়েছে। এবার সারা দেশে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৫ শ হেক্টরে খেসারী আবাদের লক্ষ্য থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলেই তার আবাদ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ ছিল প্রায় দেড় লাখ টন। কিন্তু ফসল বোনার শুরুতে অতি বর্ষনের সাথে উৎপাদন পর্যায়ে অনাবৃষ্টিতেও ভাল ফসল আসেনি। এমনকি ফনির অতি বর্ষনে চিনা বাদাম ও মরিচের উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে। 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কৃষি অর্থনীতি

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ