Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

খেলাপিদের সুবিধায় গতি ফিরবে অর্থনীতিতে

উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা : খেলাপি কমে বাড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০১৯, ১২:২৫ এএম

দেশের ইতিহাসে ঋণ খেলাপিদের বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে সরকার। উদ্দেশ্য অর্থনীতির চাকা সচল রেখে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এর ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চলছে অর্থনীতিতে লাভ-ক্ষতির নানা হিসেব-নিকেশ। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এ সিন্ধান্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর ফলে একদিকে যেমন ব্যাংকের সিঙ্গেল ডিজেটে সুদ হার কার্যকর করা সহজ হবে অন্যদিকে এটা দেশের অর্থনীতির জন্যও দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে। নানাবিধ কারণে যে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; তারা নতুন উদ্যোমে ব্যবসা শুরু করবেন। দেশে বাড়বে বিনিয়োগ ও সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারে বলেছে, ঋণখেলাপিরা দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ পরিশোধে তারা সময় পাবেন টানা ১০ বছর। প্রথম একবছর কোনও কিস্তি দিতে হবে না। নিদের্শনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিতভাবে পরিশোধ হচ্ছে না। যে কারণে ওই সব ঋণ বিরূপভাবে খেলাপি হয়ে পড়ায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশায় বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ৩১ ডিসেম্বর সময়ে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত রয়েছে এমন ঋণগ্রহিতার অনুক‚লে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পুনঃতফসিল বা এক্সিট সুবিধা দেওয়া যাবে। ঋণ খেলাপিদের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর যারা ‘ভালো’ ঋণ গ্রহীতা, তাদের বিশেষ প্রণোদনার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ভালো’ ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে তাদের ঋণের বিপরীতে যে সুদ আদায় করা হবে, তার ১০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এছাড়া আসন্ন বাজেটে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ বন্ধসহ আরও নির্দেশনা আসছে। জানা গেছে, দেশের অর্থনীতির জন্য খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিন থেকেই একটি ক্ষত হিসেবে কাজ করছে। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বিভিন্নভাবে দেশের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করে আসছিলো। কিন্তু কোনভাবেই তা কমানো সম্ভব হয়নি। বরং বেড়েছে। বর্তমানে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বহুবিধ উদ্যোগ নিয়েও খেলাপি ঋণ নিম্নমুখী করা যায়নি। বরং এর মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। তাই সরকার ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, এই পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হবে না। আর এরই ধারাবাহিকতায় টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে নতুন দায়িত্ব পাওয়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে দীর্ঘদিন থেকে ব্যাংক খাতে চলমান সঙ্কট নিরসনে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দায়িত্ব নিয়েই বেসরকারি ব্যাংক মালিক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ‘আর এক টাকাও’ বাড়বে না। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়েনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন থেকে বিদ্যমান সঙ্কট উত্তরণে বাস্তবমুখী একটি পদক্ষেপ। এ ধরণের উদ্যোগে ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কমে যাবে। আবার বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সাধারণ ঋণ গ্রহিতারাও ঋণ নিয়ে ছোট ছোট ব্যবসা করতে উদ্যোগী হবেন। নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে যে দুরাবস্থা বিদ্যমান ছিল তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি এবং এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাকে সাধুবাদ জানিয়ে ইনকিলাবকে বলেন, এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এই সিদ্ধান্তের সঠিক বাস্তবায়ন চাই। কারণ ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নীতিমালায় ভালো গ্রাহকদের জন্য সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, ঋণ খেলাপিদের জন্য বড় সুযোগ হলেও এটা দেশের অর্থনীতির জন্যও দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন থেকে সঙ্কটে থাকা ব্যাংকিং খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। অর্থাৎ তারল্য সংকট কাটবে। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন এস এম রাশিদুল ইসলাম।
ঋণ খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগকে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ ইনকিলাবকে বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ব্যবসা থমকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার সচল হবে। নগদ অর্থ ব্যাংকে আসবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা নতুন করে ব্যবসা শুরু করবে। এর মাধ্যমে দেশের কর্মসংস্থান বাড়বে। অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সুদের হার ৯/৬ সিদ্ধান্ত জনতা ব্যাংক যথাসময়ে বাস্তবায়ন করেছে। তেমনি খেলাপি ঋণ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এ যুগান্তকারী সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনেকেই বিষয়টিকে ব্যাংকিং সেক্টরে সুদের লাগাম টেনে শিল্প ও ব্যবসা বান্ধব কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন। যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঋণ নিয়ে ঠেকে গেছেন অথচ ভালো ব্যবসায়ী তারাও বিশেষ সুবিধা পেয়ে আবার ব্যবসায় ফিরবেন। সরকারের আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, যেসব ব্যবসা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত দিতে পারছে না, তাদের প্রতিষ্ঠানে হয়তো কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। ঋণের টাকা ফেরত দেবার ক্ষেত্রে তাদের কিছু সুবিধা দিলে হয়তো প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে চলতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ এবং আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সে জন্য ঋণ প্রবাহ বজায় রাখা এবং ঋণ আদায়ের জন্য এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারের যুক্তি হচ্ছে, ঋণ খেলাপিদের ছাড় দিয়ে হলেও যদি টাকা আদায় করা যায় তাহলে ব্যাংকিং খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। অর্থাৎ তারল্য সংকট কাটবে।#



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ঋণ

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন