Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০১ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

শিক্ষকের গায়ে আঘাত : জাতির জন্য লজ্জাজনক

ড. আশরাফুল আলম | প্রকাশের সময় : ২১ মে, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে। একজন শিক্ষককে জনসম্মুখে তার নিজ স্কুলে স্থানীয় সাংসদের নেতৃত্বে কান ধরে উঠ-বস করানোর ঘৃণ্য কর্মটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ধরনের ঘটনায় পুরো শিক্ষক সমাজ, লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী, প্রতিটি বিবেকমান মানুষ চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল, এ ধরনের চরম ঘৃণ্য ঘটনা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে তিব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। সকলেরই প্রত্যাশা ছিল, এর পর শিক্ষক লাঞ্ছনার মতো ঘটনা হয়ত কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে অবস্থার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষক নির্যাতন, অপমানের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। যদিও এর কম সংখ্যকই সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়। একজন শিক্ষক অপরাধ করলে যেভাবে ফলাও করে প্রচার করা হয়, শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাগুলো সেভাবে প্রচারিত হয় না। বর্তমানে মোবাইল ক্যামেরা বা সিসি ক্যামেরার বদৌলতে লাঞ্ছিত হওয়ার কোনো কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা সাধারণ মানুষের নজরে আসে বিধায় তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। ঠিক তেমনিভাবে সম্প্রতি পাবনায় সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাসুদুর রহমানের উপর প্রকাশ্যে হামলা চালানোর ভিডিও ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা, ঘৃণা, ধিক্কারের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হিসেবে স্বীকৃত। যে পেশাকে মনে করা হয় সমাজের সবচেয়ে মর্যাদার, সবচেয়ে গৌরবের। যুগে যুগে অনেক মহান ব্যক্তি এই পেশাকে গ্রহণ করে নিজেরা যেমন গৌরাবান্বিত বোধ করেছেন, তেমনি তাদের জ্ঞানের আলোয় সমাজকে, দেশকে আলোকিত করেছেন। ধারণা করা হয় এই পেশাতে অনেক ক্ষেত্রে বৈষয়িক লাভ, বস্তুগত সমৃদ্ধি না থাকলেও মানসিক প্রশান্তি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তা হলো গৌরবময় জীবনযাপনের নিশ্চয়তা থাকে। আর যারা এ ধরনের জীবনকে পছন্দ করেন তারা শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে বেছে নিতে দ্বিধা করেন না। বিত্ত না থাকলেও চিত্ত আছে, কিংবা পেটের ক্ষুধা না মিটলেও হয়তো মনের ক্ষুধা, সম্মানের ক্ষুধা মিটবে এ আশায়। শিক্ষকদের আলাদা একটা উচ্চ মর্যাদার আসন নির্ধারিত থাকে সর্বক্ষেত্রে। শিক্ষার্থীদের কাছে, অভিভাবকের কাছে, এমনকি যাদের শিক্ষার সাথে, শিক্ষকের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এরূপ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছেও শিক্ষক পূজনীয়, নমস্য। যে কারণে বলা হয় একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র সম্বল, একমাত্র পুঁজি তার মর্যাদা, সম্মান। কিন্তু সেই অবস্থা আদৌ কি আছে? আজ এ প্রশ্ন নতুন করে দেখা দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে শিক্ষক সমাজ যে বিভিন্ন ধর্মান্ধ, পশ্চাদপদ গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি, পেশীশক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজেদের বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা শিক্ষককেই টার্গেট করছে যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত। রক্তের প্রয়োজনে তারা শিক্ষককে বেছে নেয়, জঙ্গীবাদের আস্তানা প্রমাণে শিক্ষককে চাপাতি দিয়ে কোপায়, শক্তির উন্মাত্ততা দেখাতে শিক্ষককে টার্গেট করে, মাস্তানির দাপট দেখাতে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টিয়ার শেল, পিপার স্প্রে নিক্ষেপের প্রয়োজন হলে শিক্ষকদের মিছিল, সমাবেশের অপেক্ষা করে। এমনকি রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয় করতে সরকারও শিক্ষকদেরই উপযুক্ত বিচেনা করে। সরকার তো সব সময় শিক্ষা জাতির মেরুদÐ, শিক্ষক জাতির বিবেক, মানুষ গড়ার কারিগর এ ধরনের কিছু আপ্ত বাক্য বলেই শিক্ষকদের প্রতি তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং তাদের শান্ত রাখার পথ বেছে নিয়েছে। সরকার বা রাজনৈতিক দলও মনে করে, ক্ষমতায় আসা বা টিকে থাকার জন্য শিক্ষকের চেয়ে আমলাশক্তি, পেশী শক্তির বেশি প্রয়োজন। যে কারণে বেশ কিছুদিন যাবৎ ক্ষমতাশালী রাজনীতিক দলের নেতা-কর্মী আর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার অনেক নজির দেখিয়েছে। সরকারি কর্মচারীর ঝাড়ি খাওয়া, ইউএনও কর্তৃক শিক্ষককে পা ধরে মাফ চাইতে বাধ্য করা, উঠতি মাস্তান কর্তৃক লাঞ্ছিত হওয়া, সরকারি অফিসে প্রয়োজনীয় কাজে এসে বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা এ রকম হাজারো ঘটনা আজ শিক্ষকদের মর্যাদার ক্রমক্ষয়িষ্ণুতাকে নির্দেশ করছে।
এর সাথে সদ্য যুক্ত হয়েছে পরীক্ষা চলাকালে খাতা দেখে লিখতে না দেয়ার জেরে মাসুদুর রহমান নামের একজন সরকারি কলেজ শিক্ষককে প্রকাশ্যে কিল, ঘুষি ও লাথি মারার ঘটনাটি। অন্যায় কাজে বাধা দেয়ার ফলে একজন শিক্ষককে যখন এ ধরনের কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় তখন সে সমাজ কতটা অসভ্য, বর্বর, অজ্ঞতার কালো অন্ধকারে ঢাকা- তা সহজেই অনুমেয়। মুখে দাঁড়ি, মাথায় পাগড়ী, গায়ে পাঞ্জাবি পরিহিত এ রকম একজন শিক্ষকের গায়ে হাত দেয়া চরম ধৃষ্টতা ও বেয়াদবী ছাড়া আর কিছুই নয়। একজন শিক্ষকের আত্মমর্যাদার উপর আঘাত চাপাতির আঘাতের চেয়েও যন্ত্রনাদায়ক। চাপাতির আঘাত তো শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে, কিন্তু জনসম্মুখে লাথি মারার মতো অপমান একজন শিক্ষকের মনকে ক্ষতবিক্ষত করে, মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়Ñ এতে সন্দেহ নেই। চাপাতির আঘাতে সে একবার মরে কিন্তু এ ধরনের অপমানের ফলে সে বার বার মরে বা বেঁচে থেকেই সে মৃত। মাসুদুর রহমান লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাটি শুধুমাত্র ঐ শিক্ষকের কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এতে তিনি নিজে একা আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হননি। তার অপমান সমগ্র শিক্ষক সমাজের অপমান। তার পিঠে লাথি মারা সমগ্র শিক্ষক জাতির পিঠে লাথি মারার শামিল। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তার অপমান মানে পুরো দেশের অপমান। এ ধরনের ঘটনায় একজন শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত, মর্মাহত। ভাবতে পারছি না এ কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি যেখানে একজন শিক্ষককে এভাবে অপমানিত হতে হয়, কোনো অপরাধের জন্য নয়, বরং অপরাধের সুযোগ না দেয়ার জন্য। তবে কি এ সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও অন্যায়। যদি তাই হয় তবে এক সময় শিক্ষক, বিবেকমান মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রতিরোধ করার সাহস হারিয়ে ফেলবে। দুর্বৃত্ত, মাস্তানদের কাছে বিবেক ন্যায়বোধ বিসর্জন দিয়ে নপুংশক হয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।
শিক্ষক মাসুদুর রহমান লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এ রকম ঘটনা আমাদের সমাজে বিভিন্ন সময় ঘটছে, যাকে সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা বা সম্মানের জায়গাটি আস্তে আস্তে ধ্বসে পড়ছে। যা এক সময় হয়ত পুরো সমাজে সংক্রামিত করবে, দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। এমনিতে শিক্ষকদের জন্য যে বেতন বা সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান তা দিয়ে মর্যাদার সাথে বাস করা দায় হয়ে পড়েছে, উপরন্তু যতটুকু মর্যাদা রয়েছে সেটুকু নিয়েও যদি এভাবে টানাটানি করা হয় তবে টিকে থাকবে কীভাবে। শিক্ষকের অবস্থান একটা সময় যে সমাজের তলানিতে গিয়ে ঠেকবে না সে কথাই-বা কীভাবে জোর দিয়ে বলা যাবে? মূলত বিচারহীনতা এ জাতীয় অপরাধের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকার সমর্থক রাজনৈতিক দলের বা ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মী দ্বারা এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে; যারা দলীয় স্টিকারকে তাদের রক্ষাকবজ মনে করে। এদের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে দল থেকে বহিষ্কার ছাড়া কঠোর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।
যে কোনো সমাজ বা দেশকে পিছিয়ে দেয়ার, অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়ার, জনগণকে দমিয়ে রাখার সহজ উপায় হচ্ছে শিক্ষার উপর আঘাত করা, শিক্ষকের মর্যাদায় আঘাত করা। যে কারণে ব্রিটিশ শাসক থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাষক গোষ্ঠী আমাদেরকে শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছে। ১৯৭১ সালে অসংখ্য বুদ্ধিজীবী হত্যা তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। স্বাধীনতার পর এত দীর্ঘ দিনেও এ অবস্থার খুব বেশি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। শিক্ষার মানোন্নয়নে, শিক্ষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাষ্ট্রীয়ভাবে জোরালো কোনো পদক্ষেপ আজও চোখে পড়ে না। সকল সরকারই যেন শিক্ষার আলোকে ভয় পায়। জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সমালোচনা তাদের অপছন্দ। হীরক রাজার দেশের মতো দেশের রাজা হয়ে দেশ শাসন করায় বড় আনন্দ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



 

Show all comments
  • Jahir Ebrahim ২১ মে, ২০১৯, ১০:৩১ এএম says : 0
    কানে ধরা দল কোথায় এখন?
    Total Reply(0) Reply
  • Poran Kabir ২১ মে, ২০১৯, ১০:৩০ এএম says : 0
    আমরা এমনিতেই লজ্জা জনক জাতিতে পরিনত হইছি
    Total Reply(0) Reply
  • মাহফুজ আহমেদ ২১ মে, ২০১৯, ১০:৩০ এএম says : 0
    এ শিক্ষক দাঁড়ি টুপি ওয়ালা বলে কারো অপমানে লাগছেনা।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শিক্ষক

৫ অক্টোবর, ২০১৯
১৮ আগস্ট, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন