Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

আবদুল্লাহ কুইলিয়াম : ব্রিটেনের প্রথম মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা

ভিক্টোরিয়া যুগে ইসলাম গ্রহণকারী ৩ ইংরেজ

বিবিসি | প্রকাশের সময় : ২২ মে, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

মহারানী ভিক্টোরিয়া ১৮৩৭ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেন শাসন করেন। তার শাসনকালকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক গুরুত্বপর্ণ অধ্যায় বলে গণ্য করা হয়। এ সময় সর্বকালের সর্ববৃহৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি আধুনিক শিল্প বিপ্লব গ্রেট ব্রিটেনকে বিশ্বের সেরা সামরিক শক্তি ও সর্বোন্নত দেশে পরিণত করে। তার সময়ে ব্রিটেনের সর্ববৃহৎ উপনিবেশ ভারতে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (ইংরেজদের ভাষায় সিপাহী বিদ্রোহ) সংঘটিত হয়। এর পরিণতিতে ভারত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীন থেকে সরাসরি মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসনাধীনে চলে যায়। তার শাসনকালে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্রিটিশ নাগরিক খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। যে সময় খ্রিস্টানত্ব ছিল ব্রিটিশ পরিচয়ের মূল ভিত্তি সে সময় ভিক্টোরীয় রীতিনীতি অগ্রাহ্য করে তারা ইসলাম গ্রহণ করেন ও ব্রিটিশ মুসলিম অগ্রসেনানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এ তিনজন বরণীয় মুসলমানের মধ্যে দু জন ছিলেন পুরুষ, অন্যজন ছিলেন নারী। তারা হলেনঃ আবদুল্লাহ কুইলিয়াম , লেডি এভলিন কোবোল্ড ও রবার্ট স্ট্যানলি। লেডি কোবোল্ডের নাম হয় জয়নাব। তিনি ছিলেন হজ পালনকারী প্রথম ইংরেজ মুসলিম নারী।
আবদুল্লাহ কুইলিয়াম (১৮৫৬-১৯৩২)
সলিসিটর উইলিয়াম হেনরি কুইলিয়াম একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। তারপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তার নাম হয় আবদুল্লাহ কুইলিয়াম।
১৮৫৬ সালে তিনি লিভারপুলে জন্মগ্রহণ করেন। লেখাপড়ার পর ১৮৭৮ সালে তিনি সলিসিটর হন। ১৮৮৭ সালে তিনি ভ‚মধ্যসাগরে একটি ফেরিতে একদল মরোক্কানকে নামাজ পড়তে দেখেন। তিনি বলেন, সাগরে তখন প্রবল বেগে বাতাস বইছিল, ভীষণ দুলছিল জাহাজ। আমি তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছিলাম। দেখলাম তারা অচঞ্চল , শান্ত মনে নামাজ আদায় করলেন। তারা যার প্রার্থনা করছিলেন তার উপর তাদের চিত্তের নির্ভরতা ও আস্থা সমর্পিত। এটা আমাকে গভীর ভাবে অভিভ‚ত করল।
তাঞ্জিয়ার্সে যাত্রা বিরতি করল জাহাজ। তিনি মরোক্কানদের কাছে তাদের ধর্ম সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলেন। তারপরই ইসলাম গ্রহণ করলেন কুইলিয়াম। তখন তার বয়স ৩১ বছর। নতুন ধর্মকে যুক্তিযুক্ত ও যৌক্তিক বলে বলে বর্ণনা করেন তিনি। বলেন, ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি যে তা আমার বিশ্বাসের বিরোধী নয়।
ইসলাম গ্রহণকারীদের পূর্ব নাম পরিবর্তন বাধ্যতামূলক না হলেও তিনি আবদুল্লাহ নাম গ্রহণ করেন।
১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ডে ফেরার পর তিনি একজন ইসলাম ধর্মপ্রচারক হয়ে ওঠেন। বলা হয়, তার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে ৬শ’ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন প্রফেসর নাসরুল্লাহ ওয়ারেন ও প্রফেসর হাশেম ওয়াইল্ড।
তার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে, তিনি যুক্তরাজ্যে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় লিভারপুলে। লিভারপুলকে তখন অনেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর বলে গণ্য করতেন।
সে সময় রানী ভিক্টোরিয়ার সাম্রাজ্যে তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের চেয়েও বেশি সংখ্যক মুসলমান বাস করতেন। ১৮৮৯ সালে কুইলিয়াম ‘ফেইথ অব ইসলাম’ নামে একটি প্রচার পুস্তিকা রচনা ও প্রকাশ করেন। সেখানে ইসলাম ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ছিল। ১৩টি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছিল। রানী ভিক্টোরিয়া প্রথমে এ বইটির একটি কপি কেনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে মহারানী তার পরিবারের জন্য আরো ৬ কপি বই কেনেন। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ বৃহত্তর ইংরেজ খ্রিস্টান সমাজ পছন্দ করেনি যারা ইসলামকে একটি সহিংস ধর্ম মনে করত।
তিনি লিভারপুল মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছেলেদের জন্য একটি বোর্ডিং স্কুল ও মেয়েদের জন্য একটি ডে স্কুল এবং মদিনা হাউজ নামে একটি এতিমখানাও প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮৯৪ সালে অটোম্যান সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ রানীর অনুমোদনক্রমে কুইলিয়ামকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের শায়খুল ইসলাম নিযুক্ত করেন যা ছিল মুসলিম সমাজে তার নেতৃত্ব দানের স্বীকৃতি। আফগানিস্তানের আমির তাকে ব্রিটেনে মুসলিমদের শেখ বলে স্বীকৃতি দেন। পারস্যের শাহ তাকে লিভারপুলে ভাইস কনসাল নিযুক্ত করেন।
সরকারের অনুমোদন থাকলেও লিভারপুলের ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানরা স্থানীয়দের অসন্তোষ ও নির্যাতনের শিকার হন। তাদের উপর ইট ছোড়া হত, আবর্জনা, ঘোড়ার মল নিক্ষেপ করা হত।
কুইলিয়াম বিশ্বাস করতেন যে, হামলাকারীদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে এবং তাদের এটা বিশ্বাস করানো হয়েছে মুসলমানরা খারাপ লোক।
আবদুল্লাহ কুইলিয়াম সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য কাজ করার কারণে স্থানীয়দের কাছে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ট্রেড ইউনিয়নবাদ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের প্রবক্তা। কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদ প্রত্যাশী এক মহিলা মক্কেলকে সাহায্য করতে গিয়ে তার আইন পেশা ধ্বংস হয়ে যায়।
১৯০৮ সালে তিনি লিভারপুল ত্যাগ করেন। তিনি দক্ষিণে গিয়ে হেনরি দ্য লিওন নামে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করেন। কুইলিয়ামের উপর বই লিখেছেন প্রফেসর রন জিভস। তিনি বলেন, কুইলিয়াম নতুন নাম নিলেও অনেকেই জানত যে তিনি কে। এদিকে তিনি লিভারপুল ত্যাগ করার পর তার প্রভাব বঞ্চিত হয়ে ও অর্থাভাবে লিভারপুলের মুসলিমরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন।
কুইলিয়াম ১৮৮৯ সালে ওকিং-এ ব্রিটেনের দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ নির্মাণের সাথেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৩২ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাকে সারে শহরের ব্রুকউডে দাফন করা হয়। অসিয়ত অনুযায়ী তার কবরটি চিহ্নহীন রাখা হয়। পরে কুরআনের সুবিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদক আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী, মার্মাডিউক পিকথল ও লর্ড হেডলিকে তার পাশে দাফন করা হয়।
লিভারপুলের মসজিদটি পরে আবদুল্লাহ কুইলিয়াম মসজিদ নামে নামকরণ করা হয়। (অসমাপ্ত)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মসজিদ


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ