Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

চাঁদাবাজির মহোৎসব

রাজধানীর ফুটপাথ আবার হকারদের দখলে : রমজানে যানজট ভোগান্তি

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২২ মে, ২০১৯, ১২:৩১ এএম

চার মাস বন্ধ থাকার পর আবারও রাজধানীর ফুটপাতও রাস্তা দখলে নিয়েছে হকাররা। হকারদের দাবি, সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে তারা ফুটপাতে বসেছে। তবে পুলিশ বলছে, হকারদের ফুটপাতে বসার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, হকারদের ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে বসতে দেয়া হবে না। রমজানে এমনিতেই ভয়াবহ যানজটে মানুষের কষ্ট হয়। হকাররা ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে বসলে যানজট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাতে ভোগান্তি দিন দিন বাড়তেই থাকবে। হকারদের ফুটপাতে বসার অনুমতি প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, হকারদের ফুটপাতে বসার অনুমতি কে দিয়েছে তা আমার জানা নেই। লিখিত দূরের কথা মৌখিকভাবেও কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি বলেই জানি। ফুটপাতে হকার বসার বিষয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, অফিস ডে-তে কোথাও হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। যাতে অফিস চলাকালীন কেউ বসতে না পারে।
রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হকাররা আগের মতোই ফুটপাত ও রাস্তার বেশ কিছু অংশ দখল করে দোকান বসিয়েছে। পার্থক্যটা শুধু আগে তারা চৌকি বিছিয়ে বসতো, এখন বসেছে চাদর বিছিয়ে। ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতারাও ভিড় করছে হকারদের দোকানগুলোতে। এতে করে ব্যস্ত এলাকার রাস্তার সিংহভাগ দখল হয়ে যাওয়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। যানজটের সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুটপাতের চিহ্নিত চাঁদাবাজরাই পুলিশকে ম্যানেজ করে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে নিয়েছে। এ কাজে তাদেরকে পেছন থেকে ইন্ধন জুগিয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের কতিপয় দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য টাকার জন্য হকারদেরকে রাস্তা দখল করার সুযোগ করে দিয়ে রমজানে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছে। চিহ্নিত চাঁদাবাজরাই গত কয়েক মাস ধরে হকারদের পূনর্বাসনের নামে আন্দোলন কর্মসূচী পালন করছে। হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গুলিস্তান এলাকায় হকারদের কাছে থেকে দিনে দুশ’ টাকা করে তিনবার চাঁদা তোলা হচ্ছে। আর এই চাঁদা তুলছে চিহ্নিত সেই চাঁদাবাজরাই। এদের মধ্যে রয়েছে, গুলিস্তান এলাকায় আবুল হাশেম কবীর, হারুন ওরফে লম্বা হারুন, কোটন, সালাম, হিন্দু বাবুল, কাদের, সুলতান, ঘাউরা বাবুল, লম্বা শাজাহান প্রমুখ। মতিঝিলে আজাদ, গাঞ্জুটি হারুন, মুকুল, নুর ইসলামসহ আরও বেশ কয়েকজন। এ ছাড়া নিউমার্কেট এলাকায় সাত্তার মোল্লা, রফিক, গাউসিয়া মার্কেটর সামনে ইব্রাহিম ইবু, নুর ইসলামসহ আরও কয়েকজন। গতকালও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় ইবুর ও সাত্তার মোল্লা স্থানীয় হকার্স নেতা শহিদুর রহমানকে প্রাণনাশের হুমকী দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি এম এক কাশেম বলেন, অনিবন্ধিত এসব সংগঠনের আন্দোলনের একমাত্র উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি কায়েম করা এবং চাঁদাবাজদের রক্ষা করা। এরা মুখে হকারদের কল্যাণের কথা বললেও নেপথ্যে হকারদের পুঁজি করে চাঁদাবাজি করে। তিনি বলেন, রমজানে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে রমজানে রোযাদারদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এটা আমরা চাই না। আমি আগেও বলেছি, হকারদের পুনর্বাসন করা হোক। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একনেকে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করা হোক। হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি বলেন, আমরা চাই ফুটপাতে চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। আমরা বৈধভাবে সরকারকে রাজস্ব দিতে চাই। জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ফুটপাতে হকারদের আর কখনওই বসতে দেয়া হবে না। দুপুরে ফুটপাতে হকারদের বসার প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিকালের আগে তারা কোনোভাবেই ফুটপাত আটকে রাখতে পারবে না। এজন্য বিভিন্ন পয়েন্টে আমাদের কর্মী নিয়োগ করা আছে। তারা না পারলে প্রয়োজনে পুলিশ দিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, রাজধানীর মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত থেকে মাসে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা চাঁদা উঠতো। দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাতে প্রতিদিন তোলা এই চাঁদার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা। তবে রমজান মাসে এই চাঁদার পরিমান শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। গত চার মাস ধরে ফুটপাত হকারমুক্ত থাকায় এবার শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে না বলেই অনেকেই ধারনা করেছিল। কিন্তু রমজান আসার সাথে সাথে চাঁদাবাজরা আর ঠিক থাকতে পারেনি। তারা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নির্দেশ অমান্য করে শত কোটি টাকার নেশায় মেতে উঠেছে। রমজানে সকাল থেকে ফুটপাত ও রাস্তা দখলে রাখায় প্রতিদিনই ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টনসহ আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন ভয়াবহ যানজট লেগেই আছে। দুপুরে অফিস ছুটির পর এই যানজট এতোটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, তখন গাড়িগুলো একবার থামলে আর নড়ে না।
ফুটপাতকে হকারমুক্ত করা গেলে যানজটের ভয়াবহতা অনেকটাই কমে যাবে-এমন তথ্য উঠে এসেছে বুয়েটসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সুপারিশে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিষয়টি উপলব্ধি করার পর ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার ঘোষণা দেন মেয়র সাঈদ খোকন। বিভিন্ন সংস্থার সাথে বৈঠক করে গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাত হকারমুক্ত করার অভিযান শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এ উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসা পেলেও হকার নামধারী কতিপয় অনিবন্ধিত সংগঠনের পক্ষ নিয়ে বাম ঘারানার নেতারাও মেয়রের বিপক্ষে বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র সাঈদ খোকন তাতে মোটেও কান দেন নি। কিন্তু রমজানের শুরুতে হঠাৎ করেই হকাররা ফুটপাতে বসতে শুরু করে। প্রথম দিকে তারা বিকালের দিকে বসলেও গত কয়েক দিন থেকে সকালেই বসা শুরু করেছে। ফুটপাতে বসা হকারদের নেতা সেকেন্দার হায়াত বলেন, গত চার মাস ধরে ফুটপাতে হকার বসা বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। জীবিকা বন্ধ হওয়ায় আন্দোলনে নামে হকাররা। এরই মধ্যে হরতাল ও অবরোধ ঘোষণা করা হয়েছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে পুলিশ আবারও হকারদের বসতে বলেছে। তবে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে যেন বসা যায়, সেটি মাথায় রাখতে বলেছেন। রাস্তা বন্ধ করে যাতে কেউ না বসে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরাও হকারদের একই নির্দেশনা পালন করতে বলেছি, যাতে কোনো হকার সড়ক বন্ধ করে বসতে না পারে। এমনকি ফুটপাতের একটা অংশ ফাঁকা রেখে বসতে বলেছি। অথচ গতকাল গুলিস্তানে গিয়ে দেখা গেছে, ফুটপাত পুরোটাই দখল করে বসেছে হকাররা। শুধু তাই নয়, গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের বিপরীত দিকে রাস্তাও দখলে নিয়েছে তারা। এতে করে হানিফ ফ্লাইওভার থেকে গাড়িগুলো নেমে পল্টনের দিকে যাওয়ার সময় যানজটে আটকে যাচ্ছে। জিরো পয়েন্ট থেকে সেই যানজট নবাবপুর রোড ছাপিয়ে একেবারে ইসলামপুর, নয়াবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আছে। যানজটে আটকা পড়ছে হাজার হাজার যানবাহন।
ডিএমপির নিয়মিত মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সে হকারদের উচ্ছেদ ও পরবর্তী আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কনফারেন্সে উপস্থিত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। কনফারেন্সে রমজান মাসে যাতে হকাররা সড়ক বন্ধ করে বসতে না পারে সেজন্য সবসময় টহল পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ইফতারির আগে যেসব এলাকা ফাঁকা হয়ে যায় ( যেমন মতিঝিল, গুলিস্তান) সেসব এলাকায় ফুটপাতে ইফতারির পর হকাররা বসতে পারে বলে আলোচনা হয়েছে। সেটা কোনোভাবেই যাতে সড়ক বন্ধ করে না হয় সেজন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ঈদ পর্যন্ত আপাতত এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।



 

Show all comments
  • Lema Akter ২২ মে, ২০১৯, ১:১১ এএম says : 0
    Atai to bd r asol rup noy r o koto rup dorba.joto sob noropechas r dol.
    Total Reply(0) Reply
  • Md Monir ২২ মে, ২০১৯, ১:১২ এএম says : 0
    ভাই এই সব কথা আর বলিছ না শুনতে খারাপ লাগে আসলে দিয়ে দিছ ছেলেরা ঈদ করবে তরা মরলে তাতে ওদের কি ওদের টাকা চাই
    Total Reply(0) Reply
  • শফিকুল ইসলাম ২২ মে, ২০১৯, ১:১২ এএম says : 0
    eta ekta puraton pesha hisebe khub poricito.
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Ismail ২২ মে, ২০১৯, ১:১৩ এএম says : 0
    ভাল তো,,,, নাইলে পোলাপান চলবো কেমনে?
    Total Reply(0) Reply
  • Tarek Aziz ২২ মে, ২০১৯, ১:১৩ এএম says : 0
    এটা DIGITAL Bangladesh ..চাঁদাবাজি হয়া টাই সাভাবিক.. ......
    Total Reply(0) Reply
  • পাবেল ২২ মে, ২০১৯, ১:১৭ এএম says : 0
    রমজান মাসে যাতে হকাররা সড়ক বন্ধ করে বসতে না পারে সেজন্য সবসময় টহল পুলিশকে তৎপর থাকতে হবে
    Total Reply(0) Reply
  • মাসুম ২২ মে, ২০১৯, ১:৩১ এএম says : 0
    চাঁদাবাজদের সাথে কোন আপোষ নয়, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া যাবে না।
    Total Reply(0) Reply
  • Tanweir Elahee ২২ মে, ২০১৯, ২:২১ এএম says : 0
    Very good all govt party people are making money from common people pocket in this holy month
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: চাঁদাবাজি

১১ এপ্রিল, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন