Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২৪ জুন ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

ভারতের নয়াবন সাম্প্রদায়িক বিভেদের উদাহরণ

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৩ মে, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

উত্তর ভারতের একটি সাধারণ গ্রাম নয়াবন। সেখানে মুসলমানদের সন্তানরা হিন্দু বাচ্চাদের সাথে খেলা করত, এক ধর্ম বিশ্বাসের লোকেরা আরেক ধর্ম বিশ্বাসের লোকদের দোকানে বসে গল্প করত এবং একসঙ্গে উৎসব করত। এসব এখন সেখানকার মুসলিম বাসিন্দাদের কাছে শুধুই স্মৃতি। এই ধরনের সামাজিক সম্পর্ক এখন আর নেই। অনেকে বলছেন, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে গত দুই বছরে যেভাবে দুরত্ব বেড়েছে, অনেকেই ভীত হয়ে পড়েছেন। যাদের সামর্থ্য আছে তারা চলে যেতে চাচ্ছেন।
মুসলিম অধিবাসীরা রয়টার্সকে বলেন, নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বিতীয় মেয়াদে জয়লাভ করলে উত্তেজনা আরও বাড়বে। রোববার প্রকাশিত এক্সিট পোল জরিপে মোদির জয়ের ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে। গোলাম আলী নামের এক দোকানদার বলেন, ‘আগে সব ঠিক ছিল। মুসলমান ও হিন্দুরা একসঙ্গে সুখে-দুঃখে, বিয়ে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এক অপরের পাশে থাকত। এখন একই গ্রামে থাকা সত্তে¡ও আমরা পৃথক হয়ে বাস করি।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসেন এবং ২০১৭ সালে বিজেপি উত্তর প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই তারা ক্ষমতায় আসে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন কঠোর হিন্দু পূজারি এবং বিজেপি’র সিনিয়র নেতা যোগী আদিত্যনাথ।
আলী বলেন, ‘মোদি ও যোগী এই সমস্যা তৈরি করেছেন। হিন্দু ও মুসলমানদের বিভক্ত করা তাদের প্রধান ও একমাত্র এজেন্ডা। আগে এমন ছিল না। আমরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চাই, কিন্তু সব ফেলে চলে যাওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, গত দুই বছরে তার চাচা সহ এক ডজন মুসলিম পরিবার চলে গেছে।
তবে হিন্দুত্ববাদ নীতি দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে বলে স্বীকার করে না বিজেপি। গত বছরের শেষের দিকে, গম চাষের জন্য বিখ্যাত গ্রাম নয়াবন, ভারতে বিভেদের প্রতীক হয়ে ওঠে। কারণ সেখানে কিছু হিন্দু অভিযোগ করে যে তারা কয়েকজন মুসলমানকে গরু হত্যা করতে দেখেছে। হিন্দুরা গরু পবিত্র হিসাবে গণ্য করে। বিক্ষুব্ধ হিন্দুরা এ ধরণের কর্মকান্ড বন্ধ করতে পুলিশ গাফিলতি করছে বলে অভিযোগ করে এবং তারা মহাসড়ক অবরোধ করে, পাথর ছুড়ে এবং যানবাহন পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় গুলিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা সহ দুইজন নিহত হয়।
নয়াবন গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় চার হাজার। এর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৪০০। সেখানে ঘটনার পাঁচ মাস পরেও পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে। দেশটিতে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৪ শতাংশ মুসলমান এবং ৮০ শতাংশ হিন্দু। নয়াবনের মতো এমন অসংখ্য গ্রাম আছে যেখানে সংখ্যালঘু মুসলমানরা আশংকার মধ্যে রয়েছেন। বিজেপি অস্বীকার করে যে তারা মুসলিম বিরোধী এবং মুসলমানদের তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বা মনে করে।
নয়াবনে ১৯৭৭ সালে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টার ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল যার মধ্যে দুইজন নিহত হয়েছিল। কিন্তু তার পরে ৪০ বছর পর সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। ২০১৭ সালে সেখানে মসজিদে মাইক বাজিয়ে আযান দেয়া নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা দেখা যায়। হিন্দুরা মাইক ব্যবহারে আপত্তি জানায়। ৬৩ বছর বয়েসী প্রবীণ হিন্দু দর্জি ওম প্রকাশ বলেন, ‘ঈশ্বর জানেন তাদের সমস্যা কি। এখানে শান্তি আছে কিন্তু আমরা কোন মাইক সহ্য করব না। এতে গ্রামের সবার সমস্যা হয়।’
মুসলিম আইন শিক্ষার্থী আইশা (২১) বলেন, ‘আমরা এখানে যে কোনো উপায়ে আমাদের ধর্ম প্রকাশ করতে পারি না, কিন্তু তারা যা চায় তা করতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, গ্রামের হিন্দু পুরুষরা প্রায়ই মুসলিম বিরোধী প্রচারাভিযানে চিৎকার করে সমর্থন দেয়।
হিন্দুরা গ্রামের বেশ কিছু মুসলমানের বিরুদ্ধে গরু হত্যার অভিযোগে থানায় অভিযোগ করেছে। ফলে অনেক মুসলমানই পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বেশীরভাগই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তবে অনেকেই, যত কষ্টই হোক, সেখানে থেকে যাতে চান। কিন্তু আরো পাঁচ বছরের জন্য নরেন্দ্র মোদি ও তার কট্টর হিন্দুপন্থী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসলে সমগ্র ভারতেই মুসলমানরা আরও অনিরাপদ হয়ে যাবে এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সূত্র: নিউজ রিপাবলিক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারত


আরও
আরও পড়ুন