Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী

নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা অজানা তথ্য

জোবায়ের আলী জুয়েল | প্রকাশের সময় : ২৪ মে, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার সমস্ত নজরুল গবেষক ও জীবনীকাররাই একমত যে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুই বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তার এই দুটি পতœীরই বাড়ী ছিল আমাদের বৃহত্তর কুমিল্লা জেলায়। 

নজরুল ছিলেন মূলতঃ প্রেমিক কবি। প্রেম দিতে ও প্রেম পেতে তিনি সবর্ত্রই ঘুরে বেড়িয়েছেন। নজরুলের প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল নার্গিস আসার খানম (বিয়েতে দ্বিমত আছে) ও দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ছিল আশালতা সেন ওরফে প্রমিলা।
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের খান বাড়ীতে ১৭ জুন ১৯২১ খৃষ্টাব্দে নজরুল ইসলামের সাথে নার্গিস আসার খানম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন নজরুল ইসলামের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর (১৮৯৯-১৯২১ খ্রি.)। মূলতঃ নার্গিস আসার খানম ছিলেন কুমিল্লার আলী আকবর খানের ভাগ্নী। আলী আকবর খান ছিলেন কলকাতার স্বনামধন্য পুস্তক ব্যবসায়ী। পুস্তক প্রকাশনা বিষয়ে আলী আকবর খানের সঙ্গে নজরুলের একটা নিবিড় সৌহার্দপূর্ণ সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল। এই সূত্র ধরেই আলী আকবর খানের সাথে নজরুল কলকাতা থেকে কুমিল্লার দৌলতপুর গ্রামে চলে আসেন। নার্গিস অত্যন্ত ধার্মিক পরিবারের মেয়ে ছিলেন। কবি নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের বিবাহ সম্পর্কে তাঁর পিতা রাজী ছিলেন না। এমন কি নার্গিসের বড় ভাইরাও এ বিয়েতে অমত ছিলেন। পিতা ও ভাইদের অসম্মতি সর্ত্তে¡ও মামাদের কথায় নার্গিস এ বিয়েতে সম্মতি দিয়েছিলেন। নজরুলের পক্ষ হতে কলকাতা থেকে এ বিয়েতে কেউই উপস্থিত ছিলেন না। কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবীসহ সেনগুপ্ত পরিবারের সকলেই এ বিয়েতে যোগদান করেছিলেন। বিয়ে পড়িয়েছিলেন দৌলতপুর গ্রামের জনৈক ছবু মোল্লার পিতা (তিনি অনেক আগেই মৃত্যু বরণ করেছেন)। বিয়েতে ২০,০০০/- (বিশ হাজার টাকা) দেন মোহর ধার্য করা হয়েছিল।
বিয়ের পরে নার্গিসের মামা আলী আকবর খান চেষ্টা করেছিলেন বর, কনেকে বেশ আনন্দ ফুর্তিতে রাখা। তার জন্য তিনি এ বিয়েতে বিভিন্ন ধরণের গান-বাজনারও আয়োজন করেছিলেন। এই গানের অনুষ্ঠানে কুমিল্লা শহর থেকে একদল মহিলা শিল্পী এসেছিলেন। তারা আলী আকবর খানের বাসাতেই সবাই অবস্থান করেছিলেন। শিল্পীরা সবর্ক্ষন এই সদ্য বিবাহিত বর ও বধূকে বিভিন্নভাবে আনন্দ ফুর্তিতে রেখেছিলেন। অনুমান করা হয় এসব কারণেই রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য নার্গিসের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। এই নার্গিস আসার খানমই ছিলেন নজরুলের প্রথমা পতœী। প্রথম দিনেই এ বিবাহের বিচ্ছেদ ঘটে এবং তা’ নজরুলের জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত করেছিলো। এ বিয়েকে কেন্দ্র করে নজরুলের জীবনে ঘটে যায় এক বিষাদময় ঘটনা। একটা স্বপ্ন ভঙ্গের ইতিহাস। এ বিয়ে নিয়ে নানা বির্তক আছে। নজরুল ইসলাম বাংলা ১৩২৮ সালের ৩রা আষাঢ়, ১৭ জুন ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ের রাতে মতান্তরে পরের দিন সকালে বীরেন সেনকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লার সেন গুপ্ত পরিবারে চলে আসেন। ব্যক্তি জীবনে এতবড় হৃদয় বিদারক দুঃখময় ঘটনা সৃষ্টির পশ্চাতে নজরুলের মনে অন্য কোন গভীর বেদনা কাজ করছিলো কি না তা শুধু নজরুলেই সঠিক বলতে পারবেন। পরবর্তীতে তার বহু কবিতায় ও বহুগানে এই দুঃখের দীর্ঘশ্বাস আমরা দেখতে পাই।
এ বিয়ে কেনো ভেঙ্গে গেলো তা’ আজও রহস্যবৃত। কেউ কেউ বলেন নজরুলের ছন্নছাড়া, ক্ষ্যাপা জীবনই এর জন্য দায়ী। কেউ বলেন নজরুলের প্রতি নার্গিস আসারের তাচ্ছিল্যই এ বেদনাদায়ক পরিস্থিতি ঘটিয়েছিল। আবার অনেকে বলেন বিবাহের সময় ২০,০০০/- (বিশ হাজার) টাকা কাবিন হওয়ার পরেও শর্ত ছিল নজরুল ইসলাম নার্গিস আসারকে দৌলতপুর থেকে নিয়ে যেতে পারবেনা। এই শর্তই নজরুল ইসলামের অহমিকায় ভীষণভাবে আঘাত হেনেছিল। আবার অনেকে বলেন নার্গিস আসার খানমের মামা আলী আকবর খানের বিরাট স্বার্থান্ধতাই এ বিয়ে বিচ্ছেদের মূল কারণ। বিয়ে ভেঙ্গে যাবার পরে পরবর্তীতে নার্গিস আসার খানম ঢাকা শহরেই বসবাস করতেন। তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং এই কলেজ থেকেই আই.এ পাশ করেছিলেন।
তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো, তাহমিনা (উপন্যাস) ও ধুমকেতু (উপন্যাস)।
নার্গিস আসার খানম পরবর্তীতে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার নিকটবর্তী রায়পুরার আলিমুদ্দিন সরকারে পুত্র বিশিষ্ট কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁর পুত্র কন্যারা সবাই সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হন।
নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে ভেঙ্গে যাবার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর কুমিল্লার আশালতা সেন গুপ্তা ওরফে প্রমিলার সাথে নজরুল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নজরুলের মাতৃসমতুল্য বিরোজা সুন্দরী দেবীর “জা” গিরিবালা দেবীর কন্যাই হলেন আশালতা সেন গুপ্তা ওরফে প্রমিলা দেবী। সে সময়ে রাষ্ট্রদ্রোহীতার জন্য নজরুলের গ্রেফতারী পরোয়ানা বেরুলে নজরুল কুমিল্লায় চলে আসেন। এখান থেকে তার প্রেম ও দ্বিতীয় বিয়ের সুত্রপাত ঘটে। নার্গিস আসার খানম মারা যান ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ২রা জুন সকাল ১০ টা ৩০ মিনিট ম্যাঞ্চেশটারে পুত্র ডাক্তার ফিরোজের বাসভবনে। ম্যাঞ্চেশটারে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ, ২৫ এপ্রিল শুক্রবার বাদ জুম্মা কলকাতার ৬নং হাজী লেনের বাসায় তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। ধর্মীয় বিধান মোতাবেক কবি নজরুলের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। কাজী নিযুক্ত হয়েছিলেন মৌলভী মঈন উদ্দীন হোসেন। ১০০০ (এক হাজার) টাকা দেন মোহরে বিবাহ সম্পন্ন হয়। কাবিন নামায় শর্ত ছিল প্রমিলা ইচ্ছা করলে মুসলমান হতেও পারেন বা ইচ্ছা না করলে নাও হতে পারেন। এতে কারো কোন বাঁধা নেই। ধর্মমত অনুসারে জোর জবরদস্তী নেই। প্রমিলার সাথে বিবাহের পর মুসলমান সমাজ নজরুলকে যতটা ঘৃনা করেছেন তেমনি ঘৃনা করেছেন হিন্দু সমাজও। মাতৃসম বিরজা সুন্দরী দেবী নজরুল প্রমিলার বিয়ে মেনে নিতে পারে নাই। প্রমিলাকে বিয়ে করার কারণে “প্রবাসীতে” ও নজরুলের লেখা প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। নজরুল প্রমিলার বিবাহিত জীবন ছিল ৩৮ বছরের মতো (১৯২৪-১৯৬২ খ্রি.)। নজরুল সুস্থ অবস্থায় ৪পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। নজরুলের অকস্মাৎ বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ খিষ্টাব্দের ১০ জুলাই। নজরুলের প্রথম পুত্র কৃষ্ণ মোহাম্মদ ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম গ্রহন করেন এবং ঐ বছরই ডিসেম্বর মাসে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদ (বুলবুল) জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে এবং মারা যায় ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে। নজরুল ইসলামের ৪ বছরের শিশু পুত্র অরিন্দম খালেদ বুলবুল বিনা চিকিৎসায় বসন্ত রোগে মারা যায়। তাকে দাফন করার জন্য নজরুল তার লেখার পাওনা টাকাও আদায় করতে পারেন নাই। নজরুলের বড় ছেলে কাজী অনিরুদ্ধ বাংলা ১০ ফাল্গুন ১৩৮০ বঙ্গাব্দ শুক্রবার সকাল ৮:৩০ মিনিটে মারা যান। নজরুলের ছোট ছেলে কাজী সব্যসাচী ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হন। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেও কোনো লাভ হয়নি। নজরুলের দুঃসময় জীবনের অন্যতম এক অধ্যায় প্রিয়তমা পতœী প্রমীলার অসুস্থ হওয়া। নজরুল তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য যে, যা বলেছেন তাই করেছেন। স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহের জন্য নজরুল তার বালিগঞ্জের জমি টুকু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে কবি নজরুল নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘকাল ডাক্তারগণ তাঁর রোগ ধরতে পারেন নি। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল নিরাময় সমিতি গঠিত হয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির চেষ্টায়। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ১০ মে তারিখে লন্ডনে পাঠানো হয় নজরুল কে। সেখানে তাঁর রোগ ধরা পড়ে। এ রোগের বৈশিষ্ট হলো মস্তিকের সামনে ও পাশের অংশগুলি সংকুচিত হয়ে পড়লে রোগী শিশুর মতো আচরণ করে থাকে। এ রোগ নিরাময় সম্ভব নয় বলে ডাক্তাররা জানান। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ জুন দীর্ঘ রোগভোগের পর নজরুলের প্রিয়তমা পতœী প্রমীলা সেনগুপ্ত মারা যান। নজরুল তখন নির্বাক, নিঃস্তব্ধ, বাক্যহারা, কবি পতœী সমাহিত হন চুরুলিয়ার মাটিতে।
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের আগ্রহে নজরুলকে বাংলাদেেেশ নিয়ে আসা হয়। নজরুল কে সম্মান জানিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে “জগত্তাড়িনী” পদকে ভূষিত করে। ভারত সরকার তাকে “পদ্মভূষণ” উপাধি দিয়ে সম্মান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবিকে সম্মান জনক ডি. লিট ডিগ্রী প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২১ শে পদকে ভূষিত করে।

 



 

Show all comments
  • MD Zakir Hossain ২৪ মে, ২০১৯, ১১:০২ এএম says : 0
    good
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নজরুল

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৩০ আগস্ট, ২০১৯
৩০ আগস্ট, ২০১৯
৩০ আগস্ট, ২০১৯
৩০ আগস্ট, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন