Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

আদালতের রায় পেয়েও মিলছে না ক্ষতিপূরণ

মালেক মল্লিক | প্রকাশের সময় : ২৬ মে, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক এলাকাও বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। আহত ও নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে ২০টির বেশি জনস্বার্থে রিট মামলা হয়। উচ্চ আদালত রুলসহ ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিলেও বছরের পর বছর ধরে চলে সেসব মামলা। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনিরের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ এলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা দেশের প্রথম মামলাটি হয়েছিল ২৯ বছর আগে। রায় হতে ২৬ বছর লেগেছে। আর রায়ের তিন বছরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণের টাকা। আর বাস চাপায় পা হারানো রাসেল সরকারকে গ্রিন লাইন পরিবহন কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণে টাকা পরিশোধ না করার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। এছাড়াও রাজীবের মৃত্যুতে কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা রিটের রায় তৃতীয়বারের মতো পিছিয়েছেন। আইনজ্ঞরা জানিয়েছেন, আদালত রায় পালনে যদি সংশ্লিষ্টরা গড়িমসি করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করতে হবে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৯৮৯ সালে। তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক রওশনা আরা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন ১৯৯১ সালে। ২০১৪ সালে মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিচার আদালতের রায় বহাল রেখে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। এখনো রওশন আরা ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি।
এদিকে, গত বছরের ৩রা এপ্রিল বিআরটিসি’র বাস ও স্বজন পরিবহনের রেষারেষিতে হাত হারান সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ এপ্রিল মারা যান তিনি। রাজীবের ঘটনায় হাইকোর্টে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন একজন আইনজীবী। সড়ক দুর্ঘটনায় হাত হারানোর পর হাসপাতালে নিহত রাজীবের মৃত্যুতে কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা রিটের রায় তৃতীয়বারের মতো পিছিয়েছেন হাইকোর্ট।
গত বৃহস্পতিবার নির্ধারিত দিনে আদালত এ বিষয়ে রায় ঘোষণার জন্য আগামী ২০ জুন নতুন দিন ঠিক করে আদেশ দিয়েছেন। গত ১৯ মার্চ রাজধানীর কুড়িল এলাকায় সুপ্রভাত নামের একটি বাসের চাপায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। হাইকোর্ট থেকে আবরারের পরিবারকে দশ লাখ টাকা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও টাকা না দিয়ে বাসের মালিক আপিল করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পরিবারকে ২০১৭ সালে চার কোটি ৬১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। গাড়ির চালক ও মালিকের আপিল আবেদনে মামলা এখনো বিচারধীন।
গত বুধবার শুনানিকালে হাইকোর্ট বলেন, গ্রিন লাইন পরিবহনের আচরণ আমাদের কাছে ভালো লাগছে না। আমাদেরকে হার্ড হতে বাধ্য করবেন না। পা হারানো রাসেল সরকারকে গ্রিন লাইন পরিবহন কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ বাবদ বাকি ৪৫ লাখ টাকার মধ্যে কোনো টাকা না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত বলেন, আমাদের উদারতাকে নমনীয়তা মনে করবেন না। আমরা আমাদের ব্যবস্থা নেব। যেটা করা দরকার সেটাই করব। শুনানিতে গ্রিন লাইনের আইনজীবীর উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেছেন, আমরা শপথ নিয়েছি। আমাদের রাগ, বিরাগ ও অনুরাগের কিছু নেই। তবে গ্রিন লাইনের আচরণ আমাদের ভালো লাগেনি। সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো রাসেল সরকারকে অর্থ প্রদানে অগ্রগতিবিষয়ক শুনানিতে এসব মন্তব্য করেন আদালত। ওজিউল্লাহ বলেন, ২০ তারিখের পর থেকে গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়েও বলেনি। তাদের আচরণে তিনি খুশি নন। তাই গ্রিন লাইনের পক্ষ থেকে মামলা পরিচালনা ক্ষমতা প্রত্যাহার করার কথাও বলেন তিনি। আদালত বলেন, আপনি আনুষ্ঠানিকভাবে আপনার যা মত, তা করতে পারেন। আমরা পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেব। গ্রিন লাইনকে আদালত সতর্ক করে দিতে পারেন বলেও মত দেন এই আইনজীবী। এ সময় আদালত রাসেলের চিকিৎসার খোঁজখবর জানতে চান। জবাবে রিট আবেদনকারী আইনজীবী খন্দকার শামসুল হক রেজা বলেন, চিকিৎসা চলছে। গত তারিখের পর গ্রিন লাইন আর যোগাযোগ করেনি। বনানীর একটি ক্লিনিকে তার পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে, যেখানে তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই অর্থ গ্রিন লাইন দিয়েছে। আদালত রিট আবেদনকারী আইনজীবী খন্দকার শামসুল হক রেজার উদ্দেশে বলেন, আমাদের উদ্বেগ সামগ্রিকভাবে আদেশের প্রতিফলন করি না। দেখেন, তারা এসে বলেননি কমিয়ে দেন, অসুবিধা আছে। আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারত। রাসেলের দুটি পা-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ব্যবসা করবে, তাদের মানবীয় মূল্যবোধ থাকা উচিত। চিকিৎসার ব্যবস্থা নেবে। আইনজীবী ওয়াজিউল্লাহর উদ্দেশে আদালত বলেন, আপনি এখনও গ্রিন লাইনের আইনজীবী আছেন। আপনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। নমনীয়তাকে দুর্বলতা মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের কঠোর হতে বাধ্য করবেন না। এরপর আদালত ২৫ জুন পরবর্তী আদেশের তারিখ ধার্য করেন।
পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ইনকিলাবকে বলেন, ক্ষতিপূরণ নিয়ে উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। যদি সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিপূরণ না দেন বা গড়িমসি করেন, তাহলে আদালত অবমাননার মামলা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, আগে তো ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনো মামলা হতো না। এখন হচ্ছে, তবে সময়সাপেক্ষ আমার মনে হয় মালিক পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিবেন। মালিকপক্ষ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সড়ক


আরও
আরও পড়ুন