Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

বিরামপুরে আত্মহননের অস্বাভাবিক প্রবণতা

৫ মাসে চেষ্টা চালায় ৬৭ জন

মোঃ আবু শহীদ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) | প্রকাশের সময় : ২৭ মে, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থায় নেয়া ঋণের বোঝা,পারিবারিক অশান্তি ও দাম্পত্য কলহের কারণে দিনাজপুরের বিরামপুরে উপজেলার গ্রামাঞ্চলগুলোতে ইদানীং অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিশেষ করে এখানকার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তবে একেবারে বয়স্করা যে এই আত্মহত্যার প্রবণতায় কম তা বলার সুযোগ নেই। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ৬৭টি আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।
বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত পাঁচ মাসে মোট ৬৭ জন আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ জন আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় বিষপান করে,আর গলায় ফাঁস নিয়েছে নয় জন। এদের অধিকাংশই মারা গেছে। তবে এসব আত্মহত্যা ঘটনার মধ্যে থানায় অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড হয়েছে খুব কম। বিরামপুর থানা সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত এখানে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে মাত্র আটটি।
পুলিশের বিরামপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিথুন সরকার জানান, গত বছর বিরামপুর থানায় ২৬টি এবং চলতি সনের ২৬মে পর্যন্ত ৮টি আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। সংখ্যায় একটু কম দেখা গেলেও পাশের থানা নবাবগঞ্জেও গত বছর ১৮টি ও চলতি বছরের ২৬ মে পর্যন্ত ৮টি আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। এর প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে বলেও মনে করছেন পুলিশ। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর কথা পুলিশকে জানাতে চায় না মৃতের স্বজনরা। তবে এর কারণ জানতে চাইলে বিরামপুর থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন,আইনি জটিলতার ভয়ে ও মর্গে মরদেহ কাটাছেঁড়ার বিড়ম্বনা এড়াতে অনেকেই আত্মহত্যার খবর পুলিশকে দিতে চায় না। ফলে আত্মহত্যার সঠিক তথ্য রেকর্ড করাও সম্ভব হয় না। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেন, কেউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসতেই পারে,কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষ জীবিত ততক্ষণ আমরা সেটাকে আত্মহত্যা বলতে পারিনা। ফলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এধরণের কেউ মারা গেলে,তাদের তথ্যসূত্রে পুলিশ ইউডি মামলা দায়ের করে।
সমাজ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রচন্ড মানসিক একাকীত্ব,দারিদ্রতা ও অসহায়বোধের কারণেই মানুষের মধ্যে আত্মহননের প্রবণত বেশী তৈরি হয়। অনেক সময় পরিবার থেকে বিছিন্ন হয়ে বিভিন্ন অপমানবোধের কারণেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে অভিমান করেও আত্মহননের প্রয়াস চালান অনেকে।
বিরামপুর সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নুর আলম জানান, বিষন্নতা ও চিন্তাগ্রস্থ মানুষের মধ্যে এক ধরনের তীব্র হতাশা কাজ করে। নিজের ও অন্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার কারণে এদের কারো কারো মধ্যে দেখা দেয় প্রবল নিরাশা। এ অবস্থায় মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার প্রয়াস চালাতে গিয়ে সাধারণত আত্মহননকারীদের কীটনাশক, অতিমাত্রায় নেশাজাতীয় দ্রব্য বা অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন ও গলায় ফাঁস নেয়ার মতো পন্থাগুলো বেছে নিতে দেখা যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসার পথেই এদের অনেকের মৃত্যু ঘটে। তবে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে এদের কারো কারো প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে উপজেলার সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ দাউদপুর গ্রামে পরপর তিনদিন তিনজন আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বিষপান করে। তবে সৌভাগ্যক্রমে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় তিনজনই প্রাণে বেঁচে গেছে। তাদের মধ্যে একজন রনি বাবু (২৫) জানায়, বিয়ে না দেয়ায় বাবা-মার ওপর অভিমান করে বিষপান করেছিল সে। নুর আলম (২৭) নামে আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে যাওয়া আরেকজন জানায়, দাম্পত্য কলহের জের ধরে বিষপান করে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। মূলত পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, অতিরিক্ত উচ্চাকাংক্ষা, মাদকাসক্ত, প্রেমে ব্যর্থতা, ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়া, পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা, ইভটিজিং ও দুরারোগ্য ব্যাধিসহ ছোটখাটো বিষয়ে আবেগতাড়িত হয়ে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে বলে এলাকার সচেতন মহল সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে এখানকার নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এর কারণ হিসেবে নির্যাতন, যৌতুক, সম্ভ্রমহানি,অবমাননা,আর্থিক অক্ষমতা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার অবক্ষয়কে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিরামপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিথুন সরকার ইনকিলাবকে বলেন,পারিবারিক অশান্তি,দারিদ্রতা,মানসিক বিকারগ্রস্থতা থেকে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। স্থানীয়ভাবে ইউপি চেয়ারম্যান ও এনজিও কর্মীরা কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরী করে এ ধরনের ব্যক্তিদের হতাশা দূরীকরণ ভূমিকা নিতে পারে। এছাড়া সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকাগুলোয় জীবনের মূল্যবোধ নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান অনেকটাই সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন