Inqilab Logo

বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

যাকাত : প্রচলিত কয়েকটি মাসআলা-২

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ | প্রকাশের সময় : ৩০ মে, ২০১৯, ১২:৩২ এএম

ব্যবসায়িক পণ্যের কোন মূল্য ধর্তব্য : টাকা-পয়সা ও স্বর্ণাঙ্ককারের মতো ব্যবসায়িক পণ্য এবং ব্যবসার মূলধনেরও যাকাত দিতে হয়। ব্যবসায়ী যাকাত দেয়ার সময় তার অবিক্রীত পণ্যের কোন মূল্যটি হিসাব করবে, খরিদ মূল্য, পাইকারি মূল্য, খুচরা মূল্য নাকি অন্য কোনো মূল্য? এ প্রশ্নের জবাব হলো, লোকটি তার অবিক্রীত পণ্যের বর্তমান বাজার দর হিসাব করে যাকাত আদায় করবে। অর্থাৎ যেদিন তার যাকাত-বর্ষ পুরো হয়েছে সেদিন তার ব্যবসায়িক পণ্যগুলো একত্রে বিক্রি করে দিলে যে দাম পাওয়া যেত সে মূল্যের হিসাবে যাকাত প্রদান করবে।
বিক্রীত পণ্যের বকেয়া টাকার যাকাত : ব্যবসায়ীরা তাদের যে সকল পণ্য বাকিতে বিক্রি করে থাকে সে বকেয়া টাকার যাকাতও তাদেরকে আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে তারা এ টাকার যাকাত বিক্রির পর থেকে নিয়মিত আদায় করতে পারে অথবা টাকা হস্তগত হওয়ার পর পেছনের বছরগুলোর যাকাত একত্রেও পরিশোধ করতে পারে। অবশ্য যদি কোনো পাওনা টাকার ব্যাপারে এমন আশঙ্কা প্রবল হয় যে, ওই টাকা আর পাওয়া যাবে না তবে সে টাকার যাকাত দিতে হবে না। এরপর যদি ওই টাকা হস্তগত হয়ে যায় তাহলে তখন থেকে তা যাকাতের নেসাবভুক্ত হবে।
ঋণ দিয়ে পরে তা যাকাত বাবদ কর্তন করা : কোনো যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিকে ঋণ দেয়ার পর সে তা আদায়ে গড়িমসি করলে বা আদায়ে অক্ষম হলে কেউ কেউ যাকাত হিসেবে তা কর্তন করে দিতে চায়। এটা সঠিক পন্থা নয়। এভাবে যাকাত আদায় করা যায় না। এ ব্যক্তি বা তার মনোনীত প্রতিনিধিকে যাকাতের টাকা প্রদান করে পরে তার থেকে ওই টাকা নিজ পাওনা বাবদ নিয়ে নেয়া যেতে পারে।
যাকাতের টাকা দ্বারা কর্মসংস্থান করে দেওয়া : কেউ কেউ অল্প পরিমাণে যাকাতের টাকা বণ্টন না করে কোনো এক বা একাধিক দরিদ্র ব্যক্তিকে স্বাবলম্বী করার জন্য মোটা অংকের টাকা দেওয়া পছন্দ করে। আবার কেউ ঘর বা দোকান ইত্যাদি নির্মাণের খরচেও যাকাতের বড় অংকের টাকা দিয়ে থাকে। এভাবেও যাকাত আদায় হয়ে যায়। তবে এক্ষেত্রে একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে একত্রে অনেক টাকা না দিয়ে তার প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে দেয়া উচিত। যেন সাথে সাথেই সে যাকাতের নেসাবের মালিক না হয়ে যায় এবং তার প্রয়োজনও পুরো হয়। যদিও একজনকে যাকাতের এত অধিক টাকা দেয়া সাধারণত মাকরূহ। আর এ ধারাটি খুব ব্যাপক হওয়া উচিত নয়। কারণ যে দেশে যাকাত গ্রহণকারী দরিদ্রের সংখ্যা অনেক বেশি সেখানে অল্প কিছু লোককে যাকাতের বড় অংকের টাকা দিয়ে দিলে অন্যদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
চিকিৎসা খরচে যাকাত : মাঝে মাঝেই এমন মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হয় যে, একজন রোগী যাকাতের নেসাবের মালিক, তার জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য ৫ লক্ষ টাকা (উদাহরণস্বরূপ) প্রয়োজন। লোকটির নিকট আছে ২ লক্ষ টাকা। অবশিষ্ট ৩ লক্ষ টাকা তাকে যাকাত দেয়া যাবে কি না? এ যুক্তিতে যে, চিকিৎসা শুরু করলে তো একপর্যায়ে সে যাকাত গ্রহণ করার উপযোগী দরিদ্র হয়ে যাবে।
এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, বিত্তবান লোকদের উচিত এ সকল খাতে যাকাত ছাড়া সাধারণ অনুদান প্রদান করা। যাতে যাকাতের বড় অংকের টাকা সীমিত খাতে লেগে না যায়। অবশ্য যদি এক্ষেত্রে যাকাতের টাকাই কেউ দিতে চায় তবে সে ওই রোগীর নিজস্ব টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার পর (সে দরিদ্রের অন্তর্ভুক্ত হলে) তাকে প্রদান করবে অথবা রোগীর এমন কোনো অভিভাবককে প্রদান করবে যে যাকাত গ্রহণের উপযোগী। পরে লোকটি ওই টাকা স্বেচ্ছায় উক্ত রোগীর চিকিৎসায় ব্যয় করতে পারবে।
যাকাত ট্যাক্স নয় : এ কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে, যাকাত কোনো ট্যাক্স নয়; বরং ইসলামের অন্যতম একটি রোকন, ধনীর ওপর গরিবের হক। তাই সরকার কোনো মালের ট্যাক্স (শরীয়তের দৃষ্টিতে ওই ট্যাক্সের হুকুম যাই হোক) নিয়ে নিলেও অবশিষ্ট মাল নেসাব পরিমাণ হলে তার যাকাত দিতে হবে।
টিভি চ্যানেলে যাকাত : কেউ কেউ ধর্মভিত্তিক টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনার জন্যও যাকাত চেয়ে থাকে, অনেক লোক আবার তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদেরকে যাকাতের অর্থ প্রদানও করে থাকে। মনে রাখতে হবে এটি যাকাতের কোনো খাত নয়। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম যাকাত। তা আদায় করা যেমন ফরজ তেমনি যথাস্থানে উপযুক্ত পাত্রে দেয়াও ফরজ। কেউ কোনো আহ্বান করলেই তাতে সাড়া দেয়ার আগে বিজ্ঞ আলেমদের থেকে মাসআলা জেনে নেয়া খুবই জরুরি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি যাকাত বোর্ড, দাতব্য সংস্থা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
যাকাত থেকে বাঁচার অপকৌশল : অনেকে যাকাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন অপকৌশল (নাজায়েজ হীলা) গ্রহণ করে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ নাজায়েজ এবং আল্লাহ তায়ালাকে ধোঁকা দেয়ার শামিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বর্তমান প্রেক্ষাপটে যাকাতের আরো বহু নতুন মাসআলা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এখানে শুধু উপস্থিত লেখার সময়ে যা মনে পড়েছে সেগুলোর জবাব দেয়া হয়েছে। আরো নতুন কোনো মাসআলার সম্মুখীন হলে মুসলমান ভাইবোনেরা কোনো নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতা থেকে তার উত্তর জেনে নেবেন।



 

Show all comments
  • সিলোডি ফুয়া ৩০ মে, ২০১৯, ২:২৯ এএম says : 0
    দৈহিক ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামাজ, ঠিক তেমনিভাবে আর্থিক ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাকাত। সীমাহীন গুরুত্বের কারণে এই দুইটি ইবাদতের কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে পাশাপাশি বর্ণনা করেছেন।ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
    Total Reply(0) Reply
  • মাহমুদুল হাসান রাশদী ৩০ মে, ২০১৯, ২:৩০ এএম says : 0
    আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে ৮২ স্থানে নামাজের সাথে সাথে যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দৈহিক ইবাদত হিসেবে নামাজ যেমন খুবই জরুরি, তেমনি আর্থিক ইবাদত হিসেবে যাকাতও খুবই জরুরি। এছাড়া নামাজ এবং যাকাত একটি অপরটির সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ও ওতপ্রোতভাবে জরিত।
    Total Reply(0) Reply
  • জয় খান ৩০ মে, ২০১৯, ২:৩০ এএম says : 1
    যাকাতের আবিধানিক অর্থ পরিশুদ্ধ হওয়া,বৃদ্ধি পাওয়া। যাকাতের পারিভাষায়, কোন দরিদ্র মুসলমানকে শরীয়ত কর্তৃক মালের নির্ধারিত অংশের মালিক বানিয়ে দেয়া।
    Total Reply(0) Reply
  • মিরাজ মাহাদী ৩০ মে, ২০১৯, ২:৩১ এএম says : 0
    এক হাদিসে আছে, সদকায় সম্পদ হ্রাস পায় না এবং ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ শুধু বান্দার সম্মানই বাড়িয়ে দেন আর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বনকারীকে আল্লাহ উপরে উঠিয়ে দেন’। (মুসলিম শরীফ,২৫৮৮)
    Total Reply(0) Reply
  • M A Mobarak Manik ৩০ মে, ২০১৯, ১০:৫৮ এএম says : 0
    মাহে রমজান ইবাদতের মওসুম। এ মাসে ইসলামের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সম্পাদিত হয়। ফজিলত, বরকত ও রহমতে ভরপুর এ মাসে মুমিনের হৃদয়-মন ছাওয়াবের ফোয়ারায় জেগে উঠে। রোজা ও যাকাত দুটি পর্যায় ক্রমিক ফরজ। ২য় হিজরীতে রোজা ফরজ হওয়ার পরপরই শাওয়াল মাসে যাকাত ফরজ হয়। আর মাহে রমজানে এ দুটি আনজাম দিতে হয়।
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Ismail ৩০ মে, ২০১৯, ১০:৫৯ এএম says : 0
    ইসলামে যাকাত নামক অর্থনৈতিক ইবাদতের বহু হুকম-আহকাম রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে যে পদ্ধতি অনুসরণ করে যাকাত আদায় করার জন্য বলা হয়েছে তা যথাযথভাবে পালন না করলে এ ফরজ আদায় হবে না।
    Total Reply(0) Reply
  • Najir ahammed ৩০ মে, ২০১৯, ১১:০০ এএম says : 0
    যাকাত আদায়ের খাত সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী এবং মুসাফিরদের জন্য। এ হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।” – (সূরা আত তাওবা : আয়াত ৬০)
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম


আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ