Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

একটি গ্রন্থাগার এবং বইপ্রেমীর ঈদ

র ম জা ন মা হ মু দ | প্রকাশের সময় : ৩১ মে, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

সীমান্ত গ্রন্থাগারের সামনে দাঁড়িয়ে। এখানেই কোন এক বিকেলে নিতুলের সাথে আমার পরিচয়। বয়স চৌদ্দ, ও খেলাঘর আসর করে। সীমান্ত গ্রন্থাগার ও খেলাঘরের ভবন দুটো পাশাপাশি । গ্রন্থাগারে আমাদের পড়াশোনার চাইতে গল্পই বেশি হতো।

কোন একদিন নিতুল বলল, ‘বন্ধু তুমি কি জানো সীমিান্ত গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা কে?’ লাজুক ভঙিতে বললাম, ‘তা-তো জানি না !’
‘Ñএর প্রতিষ্ঠাতা হলেন নাসিম আলী, যাঁকে সবাই কচি ভাই নামে চেনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সামান্য কিছু বই নিয়ে তিনি এ গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু করেন।’
‘Ñবাহ্, তুমি তো দেখছি অনেক কিছু জানো!’

‘Ñহুম জানতে হবে না ! এ এলাকায় এ গ্রন্থাগারটি-ই তো জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে । কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন এক সময় এ গ্রন্থগারের একজন নিয়মিত পাঠক ছিলেন। ধরো, আজকের ইমদাদুল হক মিলন হওয়ার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থাগারের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
এভাবেই প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন বিষয় নিতুলের সাথে আলাপ চারিতায় জানতে থাকলাম, দীননাথ সেন, অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ, আশালতা সেন, রজনীকান্ত চৌধুরী, আনন্দচন্দ্র রায় সম্পর্কে। পরে এদের সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারি গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বিভিন্ন বই থেকে।

তানজিম হাসান এখানে স্বেচ্ছাসেবক গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করছে। কাগজ-কলমে সাড়ে ছয়শ সদস্য থাকলেও, নিয়মিত পাঠক সংখ্যা আর কম। গ্রন্থাগারে আসা যাওয়ার মধ্যে তানজিমের সাথে ভালো একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। দিন দিন গ্রন্থাগারটির সম্পর্কে আমার কৌতূহল বেশ বাড়তে থাকলো, কৌতূহল বাড়ার ক্ষেত্রে বড় অবদান হলো নিতুলের। এটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পেছনে সত্যেন সেন, জ্ঞান চক্রবর্তী, নিবেদিতা নাগ ও নেপাল নাগের ভূমিকা রয়েছে। অথচ আজ এটির কি জীর্ণদশা ! ১৯৭৬ সালে সীমান্ত গ্রন্থাগারে নজরুল জন্মজয়ন্তীতে জাতীয় কবিকে সপরিবারে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিলো। এ বিষয়গুলো জেনে গ্রন্থাগারটির প্রতি আমার ভালোলাগা আরো দ্বিগুন হয়ে যায়। এর সাথে জড়িত ছিলেন একসময় লেখক-শিক্ষাবিদ ড. হায়াৎ মাহমুদ, সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার, আবেদ খান, অভিনেতা শওকত আকবর, আলী যাকের ও সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদসহ দেশ বরেণ্য অনেকেই। অথচ সে গ্রন্থাাগারের বইগুলোতে কি-না আজ পাঠকের অভাবে ধুলোবালি জমে আছে ! তানজিম হতাশার স্বরে বলল, ‘ভাই, নিতুল না থাকলে ঐতিহ্যবাহী এ গ্রন্থাগারটি আমার পক্ষে একা রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হতো না।’
সতীশ সরকার রোডের বাঘবাড়িতে ছোট্ট একটা ভাড়া বাসায় নিতুলদের বসবাস । আমার কনিষ্ঠ বন্ধু তালিকায় নিতুল খুব বেশি দিন হয়নি যে যোগ হয়েছে। তবুও আমাদের মধ্যে বেশ সম্পর্ক । আমার মন খারাপের সময়গুলো ওর সাথে গল্পে বেশ কেটে যায়। বেশকিছু দিন ধরে নিতুল খেলাঘরে আসছে না। তানজিমকে জিজ্ঞেস করতে বলল, ‘হয়তো ঈদের কেনাকাটা কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত।’ কিন্তু আমার কাছে কেনো জানি ওর না আসার পেছনে অন্যকারণ মনে হলো। শরীল ক্লান্তি লাগছিলো, তব্ওু ইচ্ছে করছে একবার বাঘবাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেই। কে.বি. রোড ধরে বাঘবাড়ি যেতে হয়। আমি সেদিক ধরে সোজা পুবে হেঁটে চলছি। লিচুতলা মসজিদের সামনে আসতেই পরিচিত কারোকন্ঠ পেছন থেকে ভেসে আসলো। খুব সংক্ষিপ্ত শব্দ ‹মাহিন›। আমি হকচকিয়ে গেলাম, দুপুরের এ বেলায় আমাকে ডাকার মতো রাস্তায় কেউ অপেক্ষা করে না! কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার হনহন করে হেঁটে চললাম, আমাকে যে নিতুলের বাসা খুঁজে বের করতে হবে ।

আধঘন্টার ভেতর নিতুলের বাসা খুঁজে বের করলাম। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক দরজা খোঁলে দিলেন। ওনিই নিতুলের বাবা। নিতুলের কথা জিজ্ঞেস করতেই অভিমানের সুরে বললেন, ‘দেখো না বাবা। পাগলামির একটা সীমাথাকা উচিত। জিদ ধরে বসে আছে এবার সে ঈদ শপিং করবে না। তার শপিংয়ের টাকা তার হাতে দিতে হবে। সে-কিনা গ্রন্থাগারের পুরনো ছেড়া বইগুলো বাঁধাইয়ের ব্যবস্থা করবে। এটা কি তার কাজ? এ কাজ করার জন্য তো অনেকেই আছে। তুমি একটু বুঝাও তো বাবা।’

আমি নিতুলের রুমে প্রবেশ মাত্রই ওর গুমরা মুখে কিছুটা হাসির আভার দেখা মিলল। নিচু স্বরে বলল, ‘আমার এক কথা, এবারের ঈদ আমি গ্রন্থাগারে কাটাবো। বইগুলো গুছাবো, ধুলোবালি পারিস্কার করবো, ক্যাটালগিং করবো, পুরনো বইগুলো বাঁধাই করাবো। বাবা যদি টাকা না দেন, তবে আমি বাড়ি হতে বের হয়ে যাবো। কাউকে কিছু বলবো না।’

প্রযুক্তির এ যুগে বইয়ের প্রতি, গ্রন্থাগারের সাথে কারো যে এতো গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে; নিতুলের সাথে পরিচয় না হলে হয়তো জানা হতো না।
বিদায়ের আগ মুহূর্তে নিতুল ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘বন্ধু জানো? আমাদের এ গ্রন্থাগারটি সরকারি সম্পত্তির উপর দাড়িয়ে আছে। সীমান্ত গ্রন্থাগার ও খেলাঘর আসর সরকার হতে নিজ নিয়ে এ সম্পত্তি ব্যবহার করছে। অনেকের লোলুপ দৃষ্টি এ সম্পত্তির দিকে। এদের কেউ কেউ এ সম্পত্তি দখল করে ফ্ল্যাটবাড়ি ও বহুতল বিপণি বিতান বানাতে চায়। কিন্তু আমি তা হতে দিবো না। আমি প্রতিদিন এখানে আসা নতুন পাঠকদের সাথে গল্প করে সখ্যতা গড়ে তুলি, যাতে সীমান্ত গ্রন্থাগারটি বেঁচে থাকে। তুমি কি আমার পাশে থাকবে বন্ধু?’ একজন কিশোরের মনে বই ও গ্রন্থাগারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে আমি বিস্মিত হলাম। আমি কেনো জানি নিতুলের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। শুধু ওর হাতের উপর দু’টো হাত রেখে উঠে দাঁড়ালাম। দরজা পেরিয়ে বাহির হলাম, ততোক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এক পা দু’পা করে সতীশ সরকার রোডে নেমে এলাম। পেছনে তাকিয়ে সোডিয়ামের আলোতে দেখি নিতুল আমার দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ঈদ


আরও
আরও পড়ুন