Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নারী সাংবাদিকতার পথিকৃত নূরজাহান বেগম

একজন কালোত্তীর্ণ যুগসষ্ট্রা, কিংবদন্তির নাম

প্রকাশের সময় : ৩১ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নারী জাগরণে বেগম রোকেয়ার আদর্শের অনুসারী বেগম সুফিয়া কামাল, তারপর যার নাম আসে তিনি হলেন আলোর দিশারী নুরজাহান বেগম। একটি প্রদীপ নিভে গেল। এই সুন্দর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন তিনি। তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের সাথে সাথে বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। নূরজাহান বেগম একটি নাম, একটি ইতিহাস। সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যে তার অনেক অবদান। বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ঐতিহ্যবাহী ‘বেগম’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি। গত ২৩-৫-২০১৬ সোমবার সকাল ১০টার দিকে তিনি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সোমবার বাদ মাগরিব তাকে রাজধানীর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী করবস্থানে দাফন করা হয়। দুই মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন খান ও রীনা ইয়াসমিন ছাড়াও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। গত ৫ মে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নূরজাহান বেগমকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৭ মে তাকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। নূরজাহান বেগমের চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার খোঁজসহ চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই অগ্রজ নারী সাংবাদিক ছয় দশক ধরে ‘বেগম’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। মহীয়সী এই নারীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক শোকবাণীতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক জানিয়েছন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ আরও অসংখ্য সংগঠন।  নারীদের মধ্যে বছরের পর বছর যে গ্লানি জন্মেছিল, জড়তা ও মানসিকতায় স্থবিরতা এবং যে অন্ধকার জন্মেছিল সেগুলোকে দূর করে সেখানে আলোর প্রদীপ জ্বেলেছিলেন নূরজাহান বেগম। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিশুকাল কেটেছে ঐ গ্রামে। তিন বছর বয়সে তার বাবার সাথে চলে যান কলকাতায়। সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। তার পিতা ছিলেন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন। মায়ের নাম ফাতেমা খাতুন। তার ডাক নাম ছিল নূরী। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে সাড়ে তিন বছর বয়সে মা আর মামা ইয়াকুব আলী শেখের সঙ্গে তিনি কলকাতায় তার বাবার কাছে চলে আসেন। সে সময় মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন থাকতেন ১১নং ওয়েলেসলি স্ট্রিটের একটি দোতলা বাড়িতে। এই বাড়ির দোতলার একদিকে ছিল তার সওগাত পত্রিকার অফিস। নিচতলায় ছিল প্রেস ‘ক্যালকাটা আর্ট প্রিন্টার্স’ আর অন্যদিকে থাকা খাওয়ার ঘর।  ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। ঐ সময় লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে দাঙ্গাদুর্গতের জন্য যে ক্যাম্প স্থাপিত হয়- নূরজাহান বেগম সেই ক্যাম্পে প্রথম সমাজ সেবার কাজে হাতেখড়ি নেন। এই দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত এতিম শিশু ও বিধবাদের আশ্রয়দানের জন্য ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মুসলিম উইমেন্স অ্যান্ড অরফানেজ হোম’। নূরজাহান বেগম এই হোমের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় বেগম ক্লাব স্থাপিত হয় এবং তিনি এই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই বেগম ক্লাবই পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে ঢাকা মহিলা সমাজের স্বাধিকার আন্দোলন এবং  মহিলাদের জন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিম-ল গড়ে তোলার কাজে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। মুসলিম ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি ল’ প্রবর্তনে এই ক্লাবের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।  বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই যখন নূরজাহান বেগম বিএ শ্রেণীতে পড়তেন। তার বাবা নাসিরুদ্দীন প্রতিষ্ঠিত বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল। প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে এর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নূরজাহান বেগমের মতো যারা সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি বেবোর্ন কলেজে পড়তেন তারা সবাই মিলে বেগম-এর জন্য কাজ করতেন। বেগমের শুরু থেকে নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তিনি বিয়ে করেন রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই)কে। বেগম-এ নারীদের ছবি আঁকতে, লেখার জন্য উৎসাহী দিতেন নূরজাহান বেগম, যাতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। যারা লেখা পাঠাত, তাদের ছবিও ছাপাতেন বেগম পত্রিকা। নূরজাহান বেগমের লেখাপড়ার প্রথম হাতেখড়ি হয় মায়ের হাতে। আর বাবার কাছে শেখেন তাকে আরবি। বড় হয়ে তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর তিনি বেলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর পঞ্চম শ্রেণীতে আবার আগের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয় ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণী থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত তিনি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করেন এবং ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। তারপর আই এ ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। তার আই এ তে পড়ার বিষয় ছিল দর্শন, ইতিহাস ও ভূগোল। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিল সাবেরা আহসান ডলি, রোকেয়া রহমান কবির, সেবতি সরকার, জ্যোৎস্না দাশগুপ্ত, বিজলি নাগ, কামেলা খান মজলিশ, হোসনে আরা রশীদ, হাজেরা মাহমুদ, জাহানারা ইমাম। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি কলেজে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। লেডি ব্রেবোর্ন থেকে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে আই এ পাস করে বি এতে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে তিনি ১৯৪৬ সালে বি এ ডিগ্রি লাভ করেন। পারিবারিক সূত্রে তিনি বাবা মোহাম্মদ নাসিরদ্দিন কাছে সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ নেন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা শেষ হবার একবছর আগে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য সওগাত পত্রিকা অফিসে বসতে শুরু করেন। পরীক্ষা শেষ হলে তিনি সওগাত পত্রিকার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করেন। মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মাসিক ‘সওগাতে’ ‘জানানা মহল’ নামে প্রথম মহিলাদের জন্য একটি বিভাগ চালু করেন। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠ চক্রের সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে রোকেয়া পদক পান। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি থেকে শুভেচ্ছা ক্রেস্ট লাভ করেন। ২০০২ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পান। ২০০৩ ও ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে নারী পক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক ও কন্যা শিশু দিবস উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে তিনি সংবর্ধনা লাভ করেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে পত্রিকা শিল্পে তার অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন ইনার হুইল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮ সম্মাননা পান তিনি। এছাড়াও তিনি সংবর্ধিত হয়েছেন বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, চট্টগ্রাম লেডিজ ক্লাব, চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিজ ক্লাব, ঋষিজ শিল্প গোষ্ঠী, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র প্রভৃতি সংগঠনের মাধ্যমে। স্বর্ণপদক পেয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, লেখিকা সংঘ, কাজী জেবুনন্নেসা মাহাবুবুল্লাহ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ সাংবাদিক ফোরাম, রোটারি ক্লাব প্রভৃতি সংগঠন থেকে।
বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে নূরজাহান বেগমের বাড়িতে এক ব্যতিক্রম ধর্মী আড্ডার আয়োজ করা হয়েছিল। সেটি ছিলো ২০০০ সালের ঘটনা। আমরা সব নারী সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরে ছিলাম। নারী সাংবাদিকদের অগ্রযাত্রা উন্নয়ন ও দিক নির্দেশনা নিয়ে তিনি আমাদের সাথে খোলা মেলা আলোচনা করে ছিলেন। আজও মনে পড়ে নারিন্দার ৩৮ নং শরকৎ গুপ্ত লেনের ঐ বাড়িটির কথা। অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল ও বিনয়ী এই মহিয়সী নারী, নারী সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল নারী সাংবাদিকদের প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি ডিসিশনমেকিং ও নির্বাহী পদে নারীদের এগিয়ে আসতে উল্লেখ করে ছিলেন। শৈশবের স্মৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন
“আমার জন্ম চাঁদপুরের চালিতাতলী গ্রামে। সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত আমি গ্রামেই ছিলাম। মনে পড়ে, শৈশবে একবার আমি পুকুরের পানিতে পড়ে যাই। তখন বাবা বলেছিলেন ওদের কলকাতায় নিয়ে যাই। কেননা বাচ্চা এভাবে পানিতে পড়ে গেলে একটা দুর্ঘটনা ঘটবে। ওই সময় আত্মীয়স্বজন আমাদের কলকাতায় যেতে দেয়নি। এরপর আবারও আমি খালে পড়ে গিয়ে পানিতে হাবুডুবু খেয়ে বেঁচে যাই। পরপর বড় দুটো দুর্ঘটনা ঘটার পর আব্বা বড় মামাকে চিঠি  লিখলেন, ‘যে অমুক তারিখে কলকাতার শিয়ালদাহ ইস্টশনে আমি অপেক্ষা করব। আপনি আপনার বোন এবং আমার মেয়েকে নিয়ে চলে আসবেন।’ আব্বা কোনো বাধা মানলেন না। সেই সাড়ে তিন বছর বয়সে আমরা কলকাতায় চলে গেলাম। শৈশবের আরেকটি ঘটনা মনে পড়লে, আমার জন্মের পর সবাই আমাকে আদর করে ডাকত নূরী। স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় আব্বা আমার নাম রাখেন নুরুন্নাহার। একবার নানি আমাদের কলকাতার বাড়িতে বেড়াতে এসে আমার নাম রাখেন নূরজাহান বেগম।”
৪ জুন ৯১ বছরে পা দিতেন আমাদের নন্দিনী নূরজাহান বেগম। ২১ বছর বয়সে বেগম পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত হন এবং মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বেগম পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। উদ্যম আর ইচ্ছাশক্তির উজ্জ্বল প্রমাণ পরিশ্রমী মানুষটি। তিনি আরো প্রমাণ করেছেন কাজের মধ্যেই তারুণ্য। তাই তিনি চির তরুণ। তার প্রতি আমাদের বিন¤্র শ্রদ্ধা। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় এ দেশের অনগ্রসর নারী সমাজের সার্বিক কল্যাণে সাপ্তাহিক বেগম বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাছাড়া বর্তমানে যেসব মহিলা সাহিত্য ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছেন তাদের অনেকেরই লেখালেখির হাতেখড়ি হয় এই পত্রিকাটিতে। নূরজাহান বেগম আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার স্মৃতি আর অবদানের কথা আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে  থাকবে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বেগম পত্রিকা প্রকাশনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব  নিয়েছেন। প্রধান মন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি এই মহীয়সী নারীর স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখার জন্য একটি জাদুঘর বা কোন স্থানের নামকরণ করা হোক।

য়  ফাহমিদা আহমদ/নাহার ইসলাম/শাহনাজ পলি/সেলিনা শামস



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ