Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ সফর ১৪৪১ হিজরী

ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক

আজাদ জয় | প্রকাশের সময় : ১০ জুন, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

কৃষক, মজুর, শ্রমিক যাদের নিরলস পরিশ্রমে বাংলাদেশ উন্নয়ন মাপকাঠি ছুঁয়েছে, তাদের মধ্যে দেশের কৃষকরা সব থেকে অবহেলিত। দিন মিজুর নিজেদের শ্রমের মুল্য নির্ধারণ করে। শ্রমিকেরা পারিশ্রমিক বাড়াতে আন্দলোন করতে পারে। কিন্তু কৃষক বছরের পর বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শীতের কষ্ট মাথায় নিয়ে যারা দেশবাসির জন্য খাদ্য উৎপাদন করে, দেশকে খাদ্যপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে যাচ্ছে, আজ তারাই বাংলাদেশে সবচেয়ে অবহেলিত।

চাষীদের বোরো ধান উৎপাদন খরচ নিয়ে আলোচনার আগে কিছু কথা যে না বললেই নয়, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে মূল অর্থকরি ফসল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল পাট, আঁখ, তুলা এবং ধান। লাভের পরিমান উৎপাদন খরচ ও বাজার না থাকায় পাট চাষ প্রায় বন্ধ। ভাল দেশি তুলার চেয়ে টেক্সটাইল মার্কেটে কম দামে নিম্নমানের বিদেশি তুলায় আগ্রহ অসীম। তাই তুলা চাষ বাজার হারাতে হারাতে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিনি আমদানির কারনে আঁখ চাষে আর কোন লাভ আসে না। আমদানির কারণে দেশি চিনি শিল্প এখন লোকসানি খাতে পরিণত হয়েছে। ধান চাষে কৃষকরা যে লোকসানে পড়ছে তা এখন পত্র পত্রিকা খুললে দেখা যায়।

বোরো ধানের পেছনে কৃষকের শ্রম ও ব্যয় বছরে সব থেকে বেশি হয়। চাহিদা বেশি থাকার কারণে এই ধানের উপর লাখ লাখ কৃষকের বছরের আয় নির্ভর করতো। ফলন ভাল কিন্তু সময় শ্রম ও ব্যয় বেশি বলে মহাজনরা এই ফসলে ভাগ কম নেয়। আর কোথায় কি রকম জানি না, তবে আমাদের উত্তরাঞ্চলে প্রায় হালকা চুক্তিতে কৃষকের কাছে জমি ছেড়ে দেন মহাজনেরা। অথচ বোরো ঘরে তুলে মহাজনের ভাগ পরিশোধ করার পর খুব একটা টাকা থাকে না বলে পরবর্তি ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যয় করতে পারে না। মোটা চাল আমদানির কারণে গত সাত আট বছর থেকে বোরো ধান পর্যাপ্ত দাম পাচ্ছে না কৃষকরা।

ধান লাগালেই ধান হয় না। এর পেছনে অনেক পরিশ্রম ও খরচ আছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হলেও দেশের সিংহভাগ মানুষের ধারনা নেই ধান উৎপাদনে মাঠ পর্যায় প্রকৃত খরচ কত। দেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে কৃষক ও কৃষি বিষয়ে বিরক্ত প্রকাশ করতে দেখেছি। তারা হয়তো মনে করেন, চাষারা কারণ ছাড়াই অহেতুক হাঙ্গামা করছে। দেশে সব মাঠে পর্যাপ্ত ধানের উৎপাদন হয়, তারপরও কেন এরা অভাব অভাব করে, এরা আর কি চায়, এদের কারণেই হয়তো চালের দাম বাড়ছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের ধারনা সম্পুর্ণ ভুল। তারা যে চাল খায় সেটা চিকন চাল। বাজারে যেটার দাম আগাগোড়াই বেশি। দাম বেশি হবার কারণ হচ্ছে, দেশের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় এসব ধানের আবাদ হয়, অন্য কোথাও হয় না। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় চিকন ধানের দামটাও সব সময় বেশি থাকে। সামর্থ্যের অভাবের কারণে চিকন চাল সবাই কিনতে পারেনা। যারা এই চাল কিনতে পারেনা তাদের সংখ্যা এদেশে সবচেয়ে বেশি, বলা যায় দেশের নব্বই শতাংশ মানুষ। সে সব মানুষের খাদ্য হচ্ছে মোটা চাল। যা বোরো ধান থেকে সংগ্রহ করা হয়। নিম্ন আয়ের মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটায় কম দামের মোটা চাল, বোরো ধানের চাল। বোরো ধানের দাম কম কিন্তু তা উৎপাদন খরচ সামলাতে হিমসিম খেতে হয় মাঠ পর্যায়ের চাষীদের। প্রশ্ন আসতে পারে, এই ধান উৎপাদনে আসলে কত খরচ হয়? হিসাবটা জানলে, অনেকেই বুঝতে পারবেন, কেন কৃষকরা ধান চাষে প্রতিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? বোরো ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে?

বাংলা বছরের মাঘ মাসের পহেলা তারিখ থেকে তিরিশ তারিখের মধ্যে বোরো ধানের বীজতলা তৈরি করে বিজ ছিটাতে হয়। বিঘা প্রতি বীজ লাগে ৩০০টাকা থেকে ৩৮০ টাকার। সুস্থ্য চারা তৈরি করতে তিরিশ দিন সময় লাগে। এ সময় পানি ও সার প্রয়োগে খরচ হয় বিঘা প্রতি আরো ১০০০ টাকা। এ ধানের জন্য জমি তৈরি করতে এক বিঘা জমিতে দরকার পাঁচশ কেজি গোবর সার, যার মুল্য ১২০০ টাকা। সার জমিতে আনা এবং ছিটানো বাবদ খরচ হয় ৫০০ টাকা। সার পচানোর জন্য জমিতে চাষ ও পানি দিতে হয়, সেখানে পানি ২০০ টাকা এবং পাওয়ারটিলারে চাষ খরচ ৫০০ টাকা। মাটি পাকাতে সময় লাগে সাত দিন। সাত দিন পর আবার চাষ ৫০০ পানি ২০০ টাকার দিতে হয়। তার দুই থেকে তিন দিন পরে রাসায়নিক সার পটাশ ১৫ কেজি ১৮০ টাকা, টিএসপি ১৫ কেজি ৩৬০ টাকা, ইউরিয়া ৫ কেজি ৮০ টাকা। এর পর সাত দিন অপেক্ষা। সাত দিন পর আবার পানি ২০০ টাকা চাষ বাবদ ৫০০ টাকা। বীজ তলা থেকে চারা এনে জমিতে রোপন করতে বিঘা প্রতি ১৬০০ টাকা শ্রমিক মজুরী দিতে হয়। পুরো ফসলের চাষে ন্যুনতম ১২ বার পানি সেচ দিতে প্রতিবার ৩০০ টাকা হিসেবে মোট ৩৬০০ টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে বৃষ্টির পানি এখানে খরচ কিছুটা কমিয়ে দেয়। ধান রোপনের দশম দিনে দশ কেজি ইউরিয়া ১৬০ টাকা, সাথে ঘাস মারার বিষ দেড় পেক বা দেড় কেজি ১২০ টাকা। পঁচিশ দিন পর নুন্যতম ৩০ কেজি ইউরিয়া সার ৪৮০ টাকা তার সাথে এক কেজির এক প্যাক সালফার ৪৮০ টাকা। এর সাত দিনের মধ্যে ৮০ লিটার পানির সাথে মাজরা পোকা মারা বিষ ১৫ গ্রাম, সাথে মেশাতে হবে পাতার পোকার বিষ- ১০০ মিলি, ছত্রাক নাশক ১০০ গ্রাম-মোট খরচ ৫৩০ টাকা। তার ১৫ দিনের মাথায় দানা বিষ প্রয়োগ করতে লাগে বিঘা প্রতি দুই কেজি হিসেবে ৩০০ টাকা। এর ঠিক ১৫ থেকে ২০ দিন পরে আবার মাজরা পোকা মারা বিষ ১৫ গ্রাম তার সাথে মেশাতে হবে পাতার পোকার বিষ ১০০ মিলি, ছত্রাক নাশক ১০০ গ্রাম যার খরচ ৫৩০ টাকা। ধানের শীষ বের হবার পূর্বে আবারও মাজরা পোকার বিষ ১৫ গ্রাম সাথে মেশাতে হবে পাতার পোকার বিষ ১০০ মিলি, ছত্রাক নাশক ১০০ গ্রাম মোট খরচ ৫৩০ টাকা। ধানের শীষ বের হয়ে, হেলে যাওয়ার আগে ছত্রাক নাশক প্রয়োগ করতে হয় ব্লাস্ট প্রতিষেধক জিল ১০০ গ্রাম, কার্বাডাজেম ১০০ গ্রাম সঙ্গে যে কোন গন্ধ যুক্ত তরল বিষ ১০০ মিলি, যাতে খরচ ৪২০ টাকা। শীষ হেলে যাওয়া থেকে পাক ধরার আগে আবারও মাঠে ছত্রাক নাশক প্রয়োগ করতে হয়। ব্লাস্ট প্রতিষেধক হিসেবে জিল ১০০ গ্রাম, কার্বাডাজেম ১০০ গ্রাম সঙ্গে যে কোন গন্ধ যুক্ত তরল বিষ ১০০ মিলি, যার খরচ ৪২০ টাকা। এরপর আসে ধান কেটে ঘরে তোলার পর্ব। ধান কাটা মাড়াই ৬০০০ টাকা বিঘা, স্থান বিশেষে খরচ বেড়ে যায়। উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদন হয় ৪০ থেকে ৪৪ মন। প্রতি বস্তা ২ মন হিসেবে, বিঘা প্রতি ফলন ২০ বা ২২ বস্তা দাঁড়ায়। বর্তমানে হাটে প্রতি বস্তা ধান ১০৫০ টাকা। সে হিসেবে কৃষক এখন বিঘা প্রতি ২১০০০ থেকে ২৩,১০০ টাকা দাম পাচ্ছে। কিন্তু সম্পুর্ণ খরচ হিসেব করলে দেখা যায় বোরো ধানের উৎপাদন খরচ বিঘা প্রতি ২১,২২০ টাকা। তাহলে লাভ হলো কেমন করে।


তবে উল্লেখ করতে হয় পানি ও চাষ ছাড়া রাসায়নিক সার এবং বিষের একই ট্রিটমেন্ট কৃষকেরা দুই বিঘা জমিতে ব্যবহার করে। যাতে তাদের পর্তা পড়ে এবং ভাল ফসল লাভে খুব একটা পার্থক্য হয়না। চার থেকে পাঁচ মাস গাধার মত খেটে দুই বিঘা জমির ফলন বিক্রি করে একজন কৃষক সর্বচ্চ ৪৬০০০ টাকা পায়। তাতে তারা নিজেদের খরচ এবং মহাজনের পাওনা শোধ করে, আবারও মাঠে পরবর্তী ফসল ফলাতে প্রস্তুতি নেয়। তবে নিজেদের জন্য কোন অর্থ সঞ্চয় করতে পারে না। মাসের হিসেবে এই টাকা খুবই সামান্য। জমি খাটিয়ে যেমন মহাজনেরা লাভ করতে পারে না, তেমন শরীর খাটিয়ে কৃষকরাও লাভ করতে পারছে না। পর্যাপ্ত অর্থ হাতে না থাকার ফলে সারাজীবন তাদের টানাটানি ও ধার দেনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বেশির ভাগ কৃষক দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পড়ে পড়ে সমস্ত লাভ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় প্রথম সপ্তহে। তারপরও তারা আবার আশায় বুক বাঁধে। জমিতে হাল দেয় বাংলার সোনার কৃষক বাংলার মাটিতে সোনার ফসল ফলায়। ঝড় ঝঞ্ঝা শীলাবৃষ্টি জাতিয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও তাদের মনবল নষ্ট হয়না। তারা হচ্ছে সোনার বাংলার সত্যিকারের সোনার মানুষ, দেশের আসল নাগরিক। অথচ প্রতিবার লোকসানের বোঝা বইতে বইতে এখন ধান আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে কৃষক।

এদিকে আমলারা অনেকটা না বুঝেই কারণটা রাইসমিল মালিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে। চাপটা এমন লাভ করতে না পারলেও যেন কিডনী বিক্রী করে তাদের ব্যবসা করতে হবে। অথচ আসল ঘটনা হচ্ছে অসময়ে দেশে মোটা চালের আমদানির অনুমোদন। সেই সময়ে দেশে পর্যাপ্ত ধানের ফলন থাকার পরও চাল আমদানি হচ্ছে। আমদানিকৃত চালের সাথে প্রতিযোগিতায় দেশীয় রাইসমিল মালিকরা মার খাচ্ছে। বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ তারা ধান কিনছে না। কিনলে সে ধান ছাঁটাই করে বাজারে বিক্রি করতে পারছে না। লাভ না করতে পারলে কেন তারা বাজারে নামবে, এতে করে বাড়ছে তাদের ঋণের বোঝা যা মিল বিক্রি করেও পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এই সুযোগে কিছু মধ্যসত্ত¡ভোগী ব্যবসায়ী বা দালাল হাট থেকে কম দামে ধান কিনে মজুদ করছে। পরে তারা বিভিন্ন রাইসমিলে ব্যবসায়ীক সুবিধা নিয়ে উচ্চমূল্যে সরবরাহ করছে। দালালরা লাভবান হচ্ছে কিন্তু কৃষক ও মিলার দুপক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সরকারি হিসেবে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হিসেব করলে দেখা যাবে কৃষককরা বছরে সমপরিমান টাকা লোকসানে আছে।

বাংলাদেশে যে কটা সুগার মিল রয়েছে সেগুলোর জমিগুলো দখলমুক্ত করে আঁখ চাষ করলে, দেশের চিনির চাহিদা মিটবে, চিনি কম দামে পাওয়া যাবে, আবার বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে। প্রয়োজন শুধু একটু আধুনিকায়নের। কিন্তু সেদিকে কি কারও নজর আছে? দেশের কিছু কিছু জায়গায় এখনও পাট চাষ হয়। তবে তা এনজিও সংস্থা গুলোর শোরুমের পণ্য তৈরির জন্য, এনজিওগুলোর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। অতিরিক্ত প্রয়োজন মেটাতে তারা বিদেশ থেকে পাট আমদানি করছে। অথচ দেশের পাট গবেষণা চাষ বৃদ্ধির দিকে পাট কর্তৃপক্ষের কোন নজরদারি নেই। নানা সমস্যার কারণে পাট, আঁখ, ধান উৎপাদন এখন বহু সমস্যায় জর্জরিত। সার পানির খরচের চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে অসময়ে চাল আমদানি। ধান চাষও হয়তো পাট, আঁখ, তুলা চাষের মত লোকসানের কারণে কয়েক বছরের মধ্যে হারিয়ে যাবে। যেভাবে কৃষক ধান চাষে লোকসান দিচ্ছে, তাতে এক সময় ধান চাষ ছেড়ে সবাই জমিতে আম, লিচু, কাঠাল গাছ লাগাতে শুরু করবে। উত্তরাঞ্চলের বহু জায়গায় স্থানীয়রা এখন তাই করছে। এই পরিস্থিতি থাকলে একটা সময় এমন আসবে, যখন দেশ খাদ্য সংকটে পড়বে। কারণ রপ্তানি করে বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের মত দেশে কোন কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।

লেখক: সম্পাদক, দিনাজপুর নিউজ



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন