Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬, ১২ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

পুরুষের চেয়ে নারীর আয়ু বেশি

৭২ ছাড়িয়েছে প্রত্যাশিত গড় আয়ু

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১২ জুন, ২০১৯, ৮:৫৭ পিএম

দেশে চিকিৎসা সেবা বেড়েছে। তাছাড়া সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। যে কারণে দেশে গড় আয়ু বা প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল বেড়েছে। ২০১৮ সালের হিসেবে প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৩ বছর বা ৭২ বছর ৩ মাস ১৮ দিন। এ সময়ে পুরুষের প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল হয়েছে ৭০ দশমিক ৮ বছর বা ৭০ বছর ৯ মাস ১৮ দিন। মহিলাদের আয়ুস্কাল দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৮ বছর বা ৭৩ বছর ৯ মাস ১৮ দিন। তুলনায়মূলকভাবে পুরুষের চেয়ে মহিলারা বেশি দিন বেঁচে থাকে। এছাড়া গত ৫ বছরে প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল গড়ে প্রতিবছর শুন্য দশমিক ৩২ বছর হারে বেড়েছে। অর্থাৎ গত ৫ বছরে আয়ুস্কাল বেড়েছে ১ দশমিক ৬ বছর। বুধবার ( ১২ জুন) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্টাটিস্টিকস-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানের চেয়ে বাংরাদেশের প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল বেশি। শুধুমাত্র শ্রীলংকার আয়ুস্কাল আবার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি অর্থাৎ ৭৫ বছর।

‘মনিটরিং দ্যা সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্টাটিসস্টিকস অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি) (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় এ জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০১৭ সালে মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল ছিল ৭২ বছর। এছাড়া ২০১৬ সালে আয়ুস্কাল ছিল ৭১ দশমিক ৬ বছর। তার আগে ২০১৫ সালে আয়ুস্কাল ছিল ৭০ দশমিক ৯ বছর এবং ২০১৪ সালে দেশের মানুষের আয়ুস্কুল ছিল ৭০ দশমিক ৭ বছর।

রাজধানীর আগারগাঁও এ অবস্থিত পরিসংখ্যান ভবনে প্রতিবেদনটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বিবিএস এর মহাপরিচালক কৃষনা গায়েন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত (প্রাক্কলিত হিসেবে) দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার এবং মহিলা হচ্ছে ৮ কোটি ২৭ লাখ জন। দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলামান হচ্ছে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মের জনসংখ্যা হচ্ছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। গত তিন বছরে মুসলাম ও অন্যান্য ধর্মের জনসংখ্যার অনুপাত একই রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মানুষের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার বেড়েছে। ২০১৮ সালে শতকরা ৬৩ দশমিক ১ জন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে গ্রামে ৬২ দশমিক ৪ জন এবং শহরে শতকরা ৬৪ জন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে আধুনিক জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করছে ৬১ দশমিক ৬ জন এবং যেকোন পদ্ধতি ব্যবহার করছে ৬৩ দশমিক ১ জন।

এম এ মান্নান বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে ফলে গড় আয়ু বাড়ছে। মানুষের বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। এটি সরকারের কার্যক্রমের ফসল। এগুলো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য। কেননা খানা প্রধানের যে হিসাব দেয়া হয়েছে তা বাস্তবতার সঙ্গে মিল আছে। এখনো অধিককাংশ খানার বা পরিবারে প্রধান হচ্ছেন পুরুষরা। আগে আমার এলাকায় সারি সারি খোলা পায়খানা ছিল। তখন হাত পা কাপতো। এখন তেমনটি নেই। এখনো ৩২ লাখ মানুষ খোলা জায়গায় পায়খানা করে। এই সংখ্যা কম নয়। আমি ইতোমধ্যেই হাওর অঞ্চলে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপনের প্রকল্প নিয়েছি। আমি মনে করি এটি বেষ্ট বিনিয়োগ।

নজিবুর রহমান বলেন, এখন মানুষ অনেক বেশি সুচিকিৎসা পাচ্ছে। সুশিক্ষাও পাচ্ছে। তাছাড়া জীবন যাত্রার মান বেড়েছে। ফলে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। দেশে যে উন্নত হচ্ছে তার প্রতিফল ঘটেছে এই আয়ুস্কাল বৃদ্ধির মধ্যে। শতকরা ৯০ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এটি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের ফলে সম্ভব হয়েছে। অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রেও সফলতা এসেছে।

এ কে এম আশরাফুল হক বলেন, আগে পুরুষরা বেশি বাঁচত। এখন দেখা যাচ্ছে মহিলারা বেশি বেঁচে থাকতে পারে। কেননা এখন সচেতনতা বেড়েছে। নারীরা আগে পরিবারের সবার শেষে খেতে বসত। ফলে তারা অপুষ্টিতে ভুগতো। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। মহিলারা অনেক সচেতন হয়েছে। তাছাড়া মাতৃ মৃত্যু ও শিশু মৃত্যুও হার কমেছে। ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে।

প্রতিবেদনে শিক্ষার হার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ১৫ বছর ও তার উর্দ্ধে জনসংখ্যার মধ্যে ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। পুরুষদের মধ্যে শিক্ষার হার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মহিলাদের মধ্যে ৭১ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষিত। গত ২০১৭ সালে জাতীয়ভাবে শিক্ষার হার ছিল ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ হিসেবে ২০১৮ সালে শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৭ বছর ও তার উর্দ্ধে জনসংখ্যার মধ্যে স্বাক্ষরতার হার গড় ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ অংশের স্বাক্ষরাতার হার ছিল ৭২ দশমিক ৩ বছর।

২০১৮ সালে স্থূল প্রতিবন্ধীতার হার প্রতি হাজারে ৮ দশমিক ৫ জন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ হচ্ছে ৯ দশমিক ৩ জন এবং মহিলা ৭ দশমিক ৭ জন। একই সঙ্গে এক বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর হার হচ্ছে প্রতি হাজারে জীবিত জš§ নেয়া শিশুর মধ্যে জাতীয় ভাবে ২২ জন। ২০১৭ সালে এ হার ছিল ২৪ জন। এক মাসের কম বয়সের শিশু মত্যুও হার প্রতি হাজার জীবিত জš§ নেয়ার শিশুর মধ্যে ১৬ জন, যা ২০১৭ সালে ছিল ১৭ জন। এক মাস থেকে ১১ মাস বয়সের শিশু মৃত্যুর হার ৬ জন, যা ২০১৭ সালে ৭ জন। এছাড়া ১ থেকে ৪ বছর বয়সের শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৭ জন, যা ২০১৭ সালে ছিল ১ দশমিক ৮ জন। এছাড়া ৫ বছরের নীচে শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৯ জন, যা ২০১৭ সালে ছিল ৩১ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো শতকরা ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার প্রধান দায়িত্ব পালন করে পুরুষরা। মহিলা প্রধান পরিবারের সংখ্যা হচ্ছে শতকরা ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এ সংখ্যা ২০১৭ সালের জরিপেও ছিল। কোন পরির্বন হয়নি। দেশের ৯০ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে, ২০১৭ সালে এ হার ছিল ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করতো। ট্যাপ বা নলকূপের পানি ব্যবহার করে শতকরা ৯৮ শতাংশ পরিবার। স্যানিটারী পায়খানা ব্যবহার কওে ৭৮ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার।

প্রতবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতিকালে বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রথম বিবাহের গড় বয়স কিছুটা নিম্নমুখী। পুরুষদের বিবাহের গড় বয়স ২০১৫ সালে ছিল ২৫ দশমিক ৩ বছর, যা ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কমে হয়েছে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ১ বছর এবং ২৪ দশমিক ৪ বছর। অপর দিকে মহিলাদের বিবাহের গড় বয়স ২০১৪ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৩ বছর, যা ২০১৮ সালে একই অবস্থানে রয়েছে।

এইচআইভি বা এইডস সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। ২০১৮ সালের জরিপে দেখা গেছে, ১৫-৪৯ বছর বয়সী ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ মহিলা এইচআইভি বা এইডস সংক্রমনের সব সব পদ্ধতি সম্পর্কে জানে। ২০১৪ সালে এই হার ছিল ২১ শতাংশ। এছাড়া ২০১৮ সালে দেখা গেছে এইচআইভি বা এইডস সংক্রমনের যেকোন একটি পদ্ধতি সম্পর্কে জানে ৬৮ দশমিক ৯ ভাগ মহিলা, যা ২০১৪ সালে ছিল ৬১ দশমিক ৫ ভাগ। অন্যদিকে মানুষের বিদেশে যাওয়ার হার কিছুটা কমেছে। ২০১৮ সালে এ হার দাঁড়িয়েছে প্রতিহাজারে ৭২ দশমিক ৪ জনে। ২০১৭ সালে এটি ছিল ৭৪ দশমিক ৩ জন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০১৮ সালে সারাদেশের ২ হাজার ১২টি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই নমুনা এলাকার পরিবারের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯৭ হাজার ২৩৩টি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আয়ু
আরও পড়ুন