Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬, ১৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

ট্রাম্পের বাণিজ্য প্রত্যাহারের তালিকায় মোদি

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১৩ জুন, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে ২০১৬ সালে লড়াই করার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয়-আমেরিকান ভোটারদের কাছে টেনেছিলেন এই বলে যে, তিনি তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমির ‘বিরাট বিরাট ফ্যান’। তিনি ভারতকে ‘অবিশ্বাস্য দেশ’ ও ‘প্রধান কৌশলগত মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ভারতীয়-আমেরিকানদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, ট্রাম্প নির্বাচিত হলে ভারত হবে হোয়াইট হাউসের ‘সত্যিকারের বন্ধু।’

ট্রাম্প যদি নিজেকে ভারতের ‘সত্যিকারের বন্ধু’ মনে করে থাকেন, তবে তিনি বেশ মজার পন্থায় তা প্রদর্শন করছেন। গত মাসে বিপুল বিজয় পেয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করার মাত্র এক দিন পর ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন বাজারে ভারতের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের সুবিধাটি বাতিল করে দেন। এর ফলে ভারতের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ হারাল। এটি ভারতের জন্য বিপর্যয়কর আঘাত না হলেও (ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৮৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও পরিষেবা আমদানি করে থাকে) কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পরিচিত দেশটির বিরুদ্ধে এটি মনোভাব কঠোর করার প্রতিকীচিত্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো মিলন বৈষ্ণব বলেন, নতুন সরকারকে হোয়াইট হাউস এই নতুন বার্তা পাঠাতে চেয়েছে যে, তারা অযথা সময় নষ্ট করতে চায় না। ভারতের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বাতিলের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে এর জটিল সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে মোদির নতুন সরকার। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মতপার্থক্য যাতে না বাড়ে তা নিশ্চিত করাই এই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়লে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে।

দুই দেশের মধ্যে আরেকটি বিরোধের বিষয় হলো ইরান থেকে তেল কেনা। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়ে রেখেছে যে, নয়াদিল্লির ঐতিহ্যগতভাবে অন্যতম তেল সরবরাহকারী ইরান থেকে ভারত যদি তেল কেনে, কিংবা রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়, তবে অবরোধ আরোপ করা হবে।
নয়া দিল্লির ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো সঞ্জয় বাড়ু হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ট্রাম্প যদি এই পথে চলতে থাকেন, তবে তিনি ১৫ বছরের মধ্যে সম্পর্ক গুঁড়িয়ে দেবেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দিনের অবিশ্বাসের পর আমরা আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু আস্থার ওই সম্পর্ক এখন চাপের মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, এটা ব্যক্তিগত নীতি পরিবর্তনের বিষয় নয়। বিষয় হলো আমাদের উদ্বেগগুলো তাকে বোঝানো। আমাদের সমস্যাগুলো যদি আপনি না বোঝেন, তবে কিভাবে কৌশলগত অংশীদার হবেন?
স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ঐতিহাসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে ছিল। ওই সময় নয়া দিল্লি ছিল জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা, মস্কোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলত। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। সমৃদ্ধ, সামরিকভাবে শক্তিশালী ভারত উদীয়মান চীনের মোকাবিলায় আঞ্চলিক মিত্র হতে পারবে বলে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক এস্টাবলিশমেন্ট মনে করার পর এই পরিবর্তন ঘটে।

বর্তমানে ওয়াশিংটনের বহুল আলোচিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান হাতিয়ার বিবেচনা করা হয় ভারতকে। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হচ্ছে, নয়া দিল্লি ১৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার মধ্যেই মার্কিন কোম্পানিগুলো ভারতের বাজারে প্রবেশ করা কঠিন দেখতে পাচ্ছে। তবে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সিনিয়র ফেলো আলিসা আয়ারেস মনে করেন, ওয়াশিংটনের উচিত হবে না এই সমস্যাকে আরো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্যে ছায়াপাত করতে দেয়া।

তিনি বলেন, ভারত একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশ। ফলে সে আনায়াসেই চীনের সাথে ভারসাম্যের ব্যবস্থা করতে পারে। ভারতের সাথে আরো শক্তিশালী সম্পর্ক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমাদের উচিত হবে এসব বাজার উন্মুক্তকরণ নিয়ে অব্যাহতভাবে কাজ করা। সম্পর্ক নষ্ট করা উচিত হবে না। তবে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ট্রাম্পের আচ্ছন্নতা ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মোটামুটি মানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নতুন করে আলোকপাত করেছে।

আয়ারেস বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি ও শুল্ক নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিমাপের ট্রাম্পের উদ্যোগটি আসলে তার বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির অংশবিশেষ। তবে ভারতের জন্য আরো কঠিন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন যদি বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ভারত অসাধু পন্থা অবলম্বন করছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে। চীনের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনে ইউএস-ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিলের সহ-সভাপতি অমি হারিয়ানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে এ ধরনের আচরণ করছে। বিষয়টি গোপন নয়। এখন ট্রাম্প প্রশাসন এমন কিছু করার উদ্যোগ নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সার্বিক সুসম্পর্কের মধ্যে উদীয়মান বাণিজ্যিক উত্তেজনা ভালো কোনো পরিমাপক নয়। প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত খাতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরালো হওয়ার বেশ সুযোগ রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক ইস্যুতে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে মারাত্মক চাপের ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো জোরালো করার ভারতের আগ্রহে ভাটা পড়তে পারে। কারণ গুদামঘরগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে। বড়ু বলেন, ট্রাম্প তার শত্রুদের চেয়ে মিত্রদের উপরই বেশি আঘাত হানছেন। সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর।



 

Show all comments
  • রিমন ১৩ জুন, ২০১৯, ৩:৪৬ এএম says : 0
    ভালো
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মার্কিন


আরও
আরও পড়ুন