Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

দূষণ ও দখলের কবলে বালু নদী

সীমানা নির্ধারণ করেই উচ্ছেদ অভিযান

মো. খলিল সিকদার, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) থেকে | প্রকাশের সময় : ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

দখলকারীরা যত বড় ক্ষমতাসীন হোক না কেন ছাড় নেই : চেয়ারম্যান, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকা থেকে শুরু হওয়া বালু নদী এখন দূষণ ও দখলের কবলে পড়েছে। এক শ্রেণীর প্রভাবশালী নদী দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে নদীর প্রশস্ততা কমিয়ে এনেছে। বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে নদী দূষণ করছে তারা। ওই শ্রেণীর প্রভাবশালীরা এখনো দখল ও দূষণ অব্যাহত রেখেছে। শুধু তাই নয়, এ নদীর শাখা-প্রশাখাগুলো উৎসে পানির সঙ্কট, দখল, দূষণ ও নাব্যতা সঙ্কটে ভুগছে। দূষণের কারণে নদীর পানিতে পচা গন্ধে পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। দূষণের ফলে জলজ পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ছে। এতে করে মৎস্য সম্পদ বিনষ্ট হয়ে গেছে।
গত শনিবার ও রোববার দুই দিনব্যপী বালু নদী পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ একটি প্রতিনিধিদল। নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদারের নেতৃত্বে পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের উপ-সচিব শাহাদাত হোসেন, ঢাকা জেলার এডিসি (রেভিনিউ) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাফ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মতিন, রাজউকের অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান, বিআইডবিøউটিএ’র ট্রেসার আব্দুল হাই, কালীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও শিবলি সাদিক, রূপগঞ্জের এসিল্যান্ড তরিকুল ইসলাম, তেজগাঁও সার্কেলের এসিল্যান্ড এ বি এম কুদরত ই খুদাসহ রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের একটি প্রতিনিধিদলসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, ৫৪ স্থানে দখল ও ২৩ স্থানে দূষণ করছে প্রভাবশালীরা।
নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, যেকোনো মূল্যে নদী বাঁচাতে হবে। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। নদী না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। যারা নদী দখল ও দূষণ করেছেন, তারা যে ব্যক্তি, যে গোষ্ঠী, যে রাজনৈতিক দল বা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আমরা সিএস রেকর্ড দেখে সীমানা নির্ধারণ করে নদী দখলমুক্ত কার্যক্রম শুরু করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে শিগগিরই দখল ও দূষণমুক্ত করে নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
নদী রক্ষা কমিশন সূত্রে জানা যায়, বালু নদীর উৎসমুখ শ্রীপুর উপজেলার মার্টা ইউনিয়নের প্রহলাদপুর মৌজায় যেখানে সৃতী ও পারুলী নদী মিলিত হয়েছে। এই মিলিত ধারা বালু নাম নিয়ে গাজীপুর ও ঢাকার মধ্যে দিয়ে রূপগঞ্জ হয়ে ডেমড়ার শীতলক্ষ্যা নদীতে মিলিত হয়েছে। পুবাইলে অপর গুরুত্বপূর্ণ উপনদী চেলাই ও টঙ্গীতে টঙ্গীরখালে মিলিত হয়েছে। বালু নদীর দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার ও প্রশস্ত ১০০ মিটার। এর শুল্ক মৌসুমের প্রবাহ ৬০ ঘনমিটার ও বর্ষা মৌসুমে ৭৪৪ ঘনমিটার। এর গভীরতা রূপগঞ্জ ও ডেমড়া পয়েন্টে ৫.৮৫ মিটার থেকে ৯.৬৩ মিটার। এর অববাহিকা প্রায় ৭২২ বর্গকিলোমিটারের চেয়েও অধিক। এই নদীর গতিপথে দু’টি পানির লেভেল পরিমাপক স্টেশন একটি পুবাইল ও অন্যটি ডেমরায় এবং একটি প্রবাহ পরিমাপক স্টেশন আছে ডেমরায়। ৫৪ স্থানে দখল, ২৩ স্থানে দূষণ, ৩ স্থানে ডুবোচর, ৩ স্থানে প্রায় ২৫০০ মিটার ভাঙন ও ৩০টি ব্রিজ আছে। প্রায় ৪০টি খাল ও ছোট-বড় মিলিয়ে ৭টি বিলের নদীর সরাসরি সংযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, পুবাইল মৌজার সরকারি মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নদীর জমিতে ভবন নির্মাণ ও বালু নদীতে বর্জ্য সরাসরি নির্গত করছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমির বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে নদীর জমি দখল করে। মান্নান ব্রিকফিল্ড দখলে রেখেছে নদীর জমি।
এএনডি ট্রাউজার ফ্যাক্টরির বর্জ্য আবর্জনার স্ত‚প ও ময়লার পাইপ সরাসরি নদীতে ফেলছে। টঙ্গী সার্কেলে বাবু গার্মেন্টস, আজমেরি গার্মেন্টস, নীলা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, এলইডি স্টার ফ্যাক্টরির বর্জ্যও সরাসরি বালু নদীতে ফেলা হচ্ছে। কোনো প্রকার ইটিভি প্লান ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান এসব দূষণ করছে। রূপগঞ্জ ইউনিয়নের পর্শি এলাকায় ক্রাউন সিমেন্ট ফ্যাক্টরি বর্জ্য ও ময়লার স্তূপ বালু নদীতে ফেলা হচ্ছে। বালু নদীর দুই পাড়ে বসবাসরত স্থানীয় জনগণও বর্জ্য ও ময়লার স্ত‚প সরাসরি ফেলছে। এ ধরনের অভিযোগের শেষ নেই।
লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, এক সময় মানুষ নদীর পানি সংগ্রহ করে রান্নার কাজের ব্যবহার করতো। এমনকি নদীর পানি পান করতেন। আজ সেই নদীর পানি পচা দুর্গন্ধে বিষ হয়ে উঠেছে। আর এ পানি থেকে বিষাক্ত গ্যাস হয়ে মানুষ দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন মিলকারখানায় ইটিপি’র ব্যবস্থা না করে নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলার কারণে দিন দিন নদীগুলো দূষণের কবলে পড়ছে। নদী রক্ষায় আগে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ঢাকা জেলার এডিসি (রেভিনিউ) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা নির্দেশনা পেলে বালু নদীর দুই পাশে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব। বিশেষ করে ঢাকা জেলার পাশাপাশি গাজীপুর জেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে এ উচ্ছেদ অভিযান চলবে। বালু নদী রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। আগে থেকেই দখলদারদের নদী দখলমুক্ত করার জন্য বলা হলো। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর যারা নদী দূষণ করছেন, তারাও নদী দূষণ থেকে বিরত থাকুন। তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নদী


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ