Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

নদীভাঙ্গা মানুষের আহাজারি থামান

নজরুল ইসলাম লিখন | প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

ভাঙ্গছে নদী তীর। ভাঙ্গছে মানুষের বাড়ি-ঘর। সাজানো গোছানো জীবনে নেমে আসছে দুঃখের অমানিশা। নদী তীরে বসবাসকারি মানুষের দুঃখ-দুর্দশাও বৃদ্ধি পাচ্ছে সমান তালে। নদীর এপার ভাঙ্গে ওপার গড়ে এইতো নদীর খেলা হলেও সর্বশান্ত মানুষ। বুক চাপড়ে দেশময় যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায়। রেল লাইন পাড়ে অথবা কোন নদী তীরে অথবা কোন মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী ঝুপরি ঘর তৈরি করে কোন রকমে জীবন-যাপন করে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে অথবা ভিক্ষা করে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খায় নদীর ভাঙ্গনে সর্বশান্ত নদী তীরের জনগণ।

জাতীয় দৈনিক পত্রিকার একটি শিরোনাম ‘ভাঙ্গছে নদী কাঁদছে মানুষ।’ পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙ্গনে একের পর এক গ্রাম বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোন ভাবেই থামানো যাচ্ছে না সর্বগ্রাসী রাক্ষুসী পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ভাঙ্গন। মানিকগঞ্জের তিনটি উপজেলার কয়েটি গ্রাম আজ পদ্মা ও যমুনার ভাঙ্গনের কড়াল গ্রাসে। সর্বনাশা পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙ্গনে মানচিত্র থেকে দৌলতপুর, হরিরামপুর ও শিবালয় উপজেলার একের পর এক গ্রাম হারিয়ে যেতে বসেছে। এসব গ্রামের প্রায় ৫ শতাধিক বসতভিটা ইতিমধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ঘ‚র্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে এবার বর্ষা মৌসুমের আগে কুড়িগ্রামের নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। শুরু হয়েছে ভাঙন। বিগত কয়েক দিনের ভাঙনে ২০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সময় পানির তোড়ে ১৭টি স্পটে ২৩ কিলোমিটার ভেঙে যাওয়া বাঁধ এবারও মেরামত করা হয়নি। এর ফলে অতীতের মতো বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কায় পড়েছেন নদীপাড়ের মানুষ। আর শুস্ক মৌসুম পার হলেও বরাদ্দ নেই বলে যথারীতি হাত গুটিয়ে বসে আছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় শুরু হয়েছে ভাঙন। এর মধ্যে নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ী ইউনিয়নের খেলারভিটা এবং কালীগঞ্জ ইউনিয়নের কুমরিয়ারপাড় গ্রামের তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুধকুমারের ভাঙন চলছে। ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাড়িঘর, গাছপালা ও আবাদি জমি। সেই সঙ্গে খেলারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন ও খেলারভিটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একতলা ভবন ভাঙনের মুখে পড়েছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত প্রায় সাত বছরে জেলার ২৯টি পয়েন্টে ২৭ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের বন্যায় ভেঙে যাওয়া ১২টি স্পটে চার কিলোমিটার বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। অবশিষ্ট ফুলবাড়ী, সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলার ভাঙামোড়, সারডোব, চর বড়াইবাড়ী, পাটেশ্বরী, কদমতলা, চৌধুরীপাড়া, চর যাত্রাপুর, ফারাজীপাড়া, বলদিপাড়া, গারুহারা, খেলারভিটা, অনন্তপুর, গুনাইগাছ, নাজিমখান, ডাংরারহাট, সাধুয়া দামারহাট ও গতিয়াসাম- এ ১৭টি স্পটে ২৩ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত করা হয়নি।

অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন পয়েন্টে শুধু মাত্র যমুনার ভাঙ্গনেই কয়েক হাজার বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে ভাঙ্গতে থাকলে এক সময় বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর নামই হারিয়ে যাবে। আর ভাঙ্গন কবলিত অসহায় মানুষগুলো আশ্রয় নিবে বস্তির খুপড়ি ঘরগুলোতে। সহায়সম্বলহীন মানুষগুলো একটুকু আশ্রয়ের জন্যে, একটু খাদ্যের জন্যে, একটা কাজের জন্যে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াবে গোটা দেশময়। দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরও আশঙ্কা রয়েছে।

এদের পুর্নবাসনের কোন সরকারি উদ্যোগ নেই। নেই কোন রকমের সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা। এরা যেন নিজ দেশে পরবাসি। মাঝি ছাড়া নৌকার মতো ঘাটে ঘাটে তারা ঠোঙ্গর খাচ্ছে। কিন্তু কোথাও একটুকু স্থায়ীভাবে আশ্রয় পাচ্ছে না। ফলে নদী ভাঙ্গা এ সব অসহায় মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। না খেয়ে খোলা আকাশের নীচে বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে কোন রকমে বেঁচে আছেন। এমন অনেক পরিবার আছে যাদের নদী ভাঙ্গনের কারণে ৫-৬ বার পর্যন্ত বাড়ির ভিটা পাল্টাতে হয়েছে। আশ্রয় নিতে হয়েছে নতুন কোন জায়গায়। শিশুসহ অসহায় মহিলারা সুদুর পানে তাকিয়ে থাকেন কেউ কোন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কোন অন্ন,বস্ত্র ও খাবার নিয়ে আসছে কিনা?

কিন্তু ভাঙ্গনতো থামছে না। শত শত বিঘা আবাদি জমি, অসংখ্য গাছপালা, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও বসতভিটা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার কড়াল গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বহু আগেই। দেখার কেউ নেই নদী তীরবর্তী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা।

অভুক্ত মানুষ রেখে রাজনীতিবিদরা কাদের জন্যে রাজনীতি করেন এটা সাধারন মানুষের বোধগম্য নয়। ভোট আর ক্ষমতার জন্য মিথ্যে আশ্বাষ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেন নি তারা। নদী ভাঙ্গন কবলিত মানুষদের বাঁচান। যে কোন উপায়ে ভাঙ্গন রোধ করুন। তারা সরকারের কাছে সাহায্য চায়। খাদ্য চায়, থাকার জন্যে একটু জায়গা চায়। নিরাপদ জায়গা। যেখানে ভাঙ্গনের ভয় নেই। ছেলে-সন্তান নিয়েশান্তিতে থাকা যায় এমন একটি জায়গা।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও এর সংস্কার-পুনঃসংস্কারের বিষয়টি নতুন নয়। তবে উদ্বেগের বিষয়, বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এসবের বেশিরভাগই দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় থেকে যায়। ফলে দেখা যায়, যে উদ্দেশ্য নিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয় সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয় না, সাধারণ মানুষ ভুগতে থাকে ভাঙন আতঙ্কে। বোঝাই যায়, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিমাণে দুর্নীতির কারণে এমনটি হয়। লক্ষণীয় বিষয়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের ধুম পড়ে। শুকনো মৌসুমে এ কাজটি করা হয় না। এ কারণে, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির জন্য বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার পুরোপুরি শেষ করা যায় না এবং তা টেকসইও হয় না। এ সময়টি বেছে নেওয়া যে অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিছু অসাধু মানুষের ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অর্থের অপচয় হবে এবং সাধারণ মানুষের জানমাল বিপন্ন হবে, তা মেনে নেওয়া যায় না।

নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে সরকার তেমন কোন ভূমিকা না নিলেও ভাঙ্গন কবলিত এলাকার সাধারন জনগন নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ ও খুঁটির বাঁধ এবং বালি ভর্তি জিওব্যাগ ফেলে নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্থানীয় জনগনকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন থেকে মানববন্ধন, সভা, সমাবেশ, লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসলেও কোন সরকারই ভাঙ্গনরোধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুকনো মৌসুমে যদি বাঁধগুলোর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতো তাহলে কাজও মজবুত হতো, অর্থও সাশ্রয় হতো। এক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুম আসার আগেই ঝুঁকিপ‚র্ণ বাঁধ ও বেড়িবাঁধগুলোর পুরোপুরি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। এছাড়া যেসব বাঁধ নির্মিত হয়েছে সেগুলো সারাবছরই তদারক করতে হবে। কীভাবে বাঁধ টেকসই করা যায়, সে পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে। যেসব বাঁধ যথাযথভাবে নির্মিত ও সংস্কার হয়নি, সেগুলোর কাজ যারা করেছেন তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের সব বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ভ‚মিকা পালন করবে- এমনটাই প্রত্যাশা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন