Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯, ০৮ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৯ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

টাকা ছাড়াও জীবনে আরো কিছু আছে

ক্যান্সারে মৃত চিকিৎসকের শেষ উপলব্ধি

নেক্সটশার্ক | প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

জীবনের ‘ফাস্ট লেনে’ যিনি দিন কাটিয়েছেন, সেই সিঙ্গাপুরের এক ডাক্তার জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করেছিলেন। আর সেটি হচ্ছে অর্থ ও সুন্দর জিনিস জীবনে কোনো সুখ আনে না। টাকা ছাড়াও জীবনে আরো কিছু আছে। ২০১২ সালে লাং ক্যান্সারে মৃত্যুর আগে কসমেটিক সার্জন ডা. রিচার্ড টিও কেং সিয়াং এই বাণী ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এ সপ্তাহে টিওর কাহিনী ইন্টারনেটে পুনরায় প্রকাশ পাওয়ার পর তা সুখের জন্য লড়াইরত বহু মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে।

ডা. টিও এক বক্তৃতায় বলেন, আমি আজকের সমাজের সাধারণ পণ্য। একেবারে কম বয়স থেকেই আমি সব সময় এই প্রভাব ও অনুভ‚তিতে চালিত ছিলাম যে সুখী হতে হলে সফল হতে হবে। আর সফল হতে গেলে ধনী হতে হবে। সুতরাং এ লক্ষ্যেই আমি জীবনকে চালিত করেছি। ডা. টিও ৪০ বছর বয়সে মারা যান। তিনি চক্ষু চিকিৎসা থেকে সরে এসে সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসক (অ্যাসথেটিক্স) হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন।

তিনি আরেক বক্তৃতায় বলেন, উপহাস হচ্ছে যে মানুষ জিপি, ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানদের মধ্য থেকে হিরো খোঁজে না। তারা হিরো খোঁজে ধনী ও বিখ্যাতদের মধ্য থেকে। তিনি বলেন, যে মানুষরা ২০ সিঙ্গাপুরি ডলার (১৫ মার্কিন ডলার) দিয়ে একজন জিপিকে দেখিয়ে খুশি নয়। সেই একই মানুষ লাইপোসাকশনের (মেদ ঝরানো) জন্য ১০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (৭৩১০ মার্কিন ডলার), ব্রেস্ট অগমেন্টেশনের (স্তনের আকার বৃদ্ধি) জন্য ১৫ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার (১০৯৭০ মার্কিন ডলার) ব্যয় করতে দ্বিধা করে না। মিলিয়ন ডলারের মালিক হওয়ার পর স্পোর্টস কার অনুরাগী ডা. টিও সপ্তাহান্তে কার ক্লাব সমাবেশগুলোতে যাওয়া শুরু করলেন। পছন্দসই কার নিয়ে রেসিংয়ে যোগ দিতেন তিনি।

তিনি সৌখিনতম রেস্তোরাঁগুলোতে যেতেন। বিখ্যাত সব লোকদের সাথে পরিচয় হতে থাকে তার যাদের মধ্যে ছিলেন মিস সিঙ্গাপুর ইউনিভার্স র‌্যাচেল কুম ও ফেসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এডুয়ার্ডো স্যাভারিন।
টিওর কমপক্ষে ৪টি স্পোর্টস কার ছিল। একটি হোন্ডা এস ২০০০, নিসান জিটিআর, সুবারু ডবিøউআরএক্স ও ফেরারি ৪৩০। ডা. টিও বলেন, আমি তখন আমার পেশাগত জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আমি ভেবেছিলাম সবকিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে।

তারপর ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানে সুনামি আঘাত করার দিন তার পরিবারকেও আঘাত করল সেই ভয়ঙ্কর খবরটি । টিওর টার্মিনাল লাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বলা হয়েছে, আর তিন থেকে চার মাস। বড় জোর ছয় মাস তিনি বাঁচবেন।

তার মস্তিষ্ক ও মেরুদন্ডে ক্যান্সার ছড়িয়ে যায়। নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে ডাক্তার টিও বলেন, আমি এটা মেনে নিতে পারিনি। আমার মা ও বাবার দিক দিয়ে শত শত আত্মীয় ছিলেন। তাদের কারোরই ক্যান্সার ছিল না।
গভীর হতাশার মধ্যে ডুবে যেতে যেতে তিনি রাতে ঘুমানোর জন্য চিৎকার করতেন।
তিনি বলেন, ভাগ্যের পরিহাস দেখুন। সব কিছু ছিল আমার। সাফল্য, প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে ট্রফি লাভ, আমার গাড়িগুলো, আমার বাড়ি ও সবকিছু। আমি ভেবেছিলাম এগুলো আমাকে সুখ এনে দিয়েছে। কিন্তু সব কিছু আমার থাকলেও কোনো আনন্দ ছিল না।

শেষের দিন যতই এগিয়ে আসতে লাগল তিনি উপলব্ধি করলেন যে ফেরারি বা মিশেলিন-খচিত খাবার তাকে সুখ এনে দিচ্ছে না।

শেষ দশ মাসে আমাকে যা আনন্দ দিয়েছে তা হচ্ছে লোকজনের সাথে, ভালোবাসার জন কারো সাথে, বন্ধু, যে সব লোক আমাকে প্রকৃতই ভালোবাসত, আদের সাথে আমার মিথষ্ক্রিয়া। তারা আমার সাথে হাসত ও কাঁদত। আমি যে যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পাড়ি দিচ্ছিলাম, তারা তা বুঝতে সক্ষম ছিল।
নিজের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে টিও তারই মত অন্য ক্যান্সার রোগীদের প্রতি সমব্যথী হতে শেখেন। এটা এমন কিছু যে অভিজ্ঞতা একজন অর্থলোভী ডাক্তার হিসেবে তার হয়নি।

তিনি তরুণ ডাক্তারদের উদ্দেশে বলেন, আমি নিজে রোগী না হওয়া পর্যন্ত কোনোদিন বুঝতে পারিনি তারা কি কষ্ট ও যন্ত্রণা পায়। যদি আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে আমি যদি বেঁচে যাই তাহলে আমি কি একজন অন্য রকম চিকিৎসক হব? আমি আপনাদের বলছি, হ্যাঁ তাই। কারণ, আমি এখন সত্যই বুঝতে পেরেছি যে রোগীরা কি রকম অনুভব করে। কখনো কখনো আপনাদেরকে কঠিন অবস্থায় তা বুঝতে হবে।

তিনি বলেন, সফল হওয়ায়, ধনী হওয়ায় বা সম্পদশালী হওয়ায় খারাপ কিছু নেই, অবশ্যই না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমার মত অনেকেই তা ভোগ করতে পারে না।

ডা. টিও বলেন, আমি এতটা লোভী হয়ে পড়েছিলাম যে কোনো কিছুই আমার কাছে বিষয় ছিল না। রোগীরা আয়ের উৎস আর আমি এ সব রোগীর কাছ থেকে প্রতিটি সেন্ট নিংড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি।

টিও তার জীবনের শেষ কয়েকমাসে যা শিখেছিলেন তা মৃত্যু পর্যন্ত মেনে চলেছিলেন। তিনি বলেন, আমি যখন মৃত্যুর সম্মুখীন হলাম, আমাকে হতে হল। আমি সব কিছু বাদ দিলাম। যা জরুরি শুধু সেদিকেই দৃষ্টি দিলাম। পরিহাস হল যে আমরা যখন জানলাম যে কীভাবে মরতে হবে তখনি আমরা জানলাম যে কীভাবে বাঁচতে হয়।
প্রায় সাত বছর পর তার বার্তা শুধু তরুণ ডাক্তারদের মধ্যেই অনুরণিত হচ্ছে না, যারা সফল হতে চায় তাদের সবার মধ্যেই অনুরণিত হচ্ছে। তার স্ত্রী মিস টিও বলেন, আমি তার জন্য গর্বিত। আমার ইচ্ছা তার মত হওয়ার। স্রষ্টা আমার কাছে একজন সেরা শিক্ষক পাঠিয়েছিলেন।



 

Show all comments
  • Abdur Razzak ২০ জুন, ২০১৯, ১:২৪ এএম says : 0
    ডাক্তারের সাথে আমি একমত
    Total Reply(0) Reply
  • Mirza Anik Hasan ২০ জুন, ২০১৯, ১:২৫ এএম says : 0
    কিন্তু কজন মানুষ সেই সত্যটা উপলব্ধি করে। সবাই টাকার পেছনে ছুটছে তো ছুটছেই..
    Total Reply(0) Reply
  • Mustafizur Rahman ২০ জুন, ২০১৯, ১:২৬ এএম says : 0
    আল্লাহতায়ালা তাকে হেদায়েত দান করুন, ইসলামের ছায়াতলে আসার তৌফিক দিন।
    Total Reply(0) Reply
  • Monir mamun ২০ জুন, ২০১৯, ১:২৭ এএম says : 0
    মানুষ সত্য ঠিকই বুঝে কিন্তু মৃত্যুর সময় গিয়ে বুঝে যখন বেশি কিছু করার থাকে না।
    Total Reply(0) Reply
  • শহিদুল খান জেএসজি ২০ জুন, ২০১৯, ১:২৭ এএম says : 0
    ঠিক
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ