Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, ০৬ শাবান ১৪৪১ হিজরী

পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক সংঘর্ষ ও অপমৃত্যু

| প্রকাশের সময় : ২১ জুন, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপানে যাচ্ছে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট। দেশের প্রথম বৃহৎ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে এটি হবে দেশের বিদ্যুৎ খাতের মাইলফলক অগ্রগতি। চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মীয়মান ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ ২০১৭ সালে শুরু হলেও চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও উন্নত প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্বলিত এই প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সমাপ্ত করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে চলেছে। গত এপ্রিল মাসেই পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা আগস্ট নাগাদ শুরু হতে যাচ্ছে বলে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। এহেন বাস্তবতায় দুর্ঘটনা জনিত কারণে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাশ গুমের গুজব ছড়িয়ে দেশীয় শ্রমিকদের উত্তেজিত করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং চীনা শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মান ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ নস্যাতের উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপচেষ্টা হিসেবেই গণ্য হতে পারে। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছে এমন একটি প্রকল্পে দুর্ঘটনায় মৃত্যু অনাকাঙ্খিত হলেও এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের দুর্ঘটনাজণিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক চীনা শ্রমিকদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা অনাকাঙ্খিত ও অপ্রত্যাশিত। সংঘর্ষে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এক চীনা শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আরো ৫ চীনা শ্রমিক এবং দুই বাংলাদেশি শ্রমিক আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানা যায়। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সংঘাত সহিংসতা উস্কে দেয়া এবং উন্নত কম্পøায়েন্সযুক্ত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন দিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির অনেক উদাহরণ আছে। এসব ঘটনার সাথে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়া যায় না।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লারে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক সারিন্দ্র দাস বেল্ট ছিঁড়ে পড়ে গিয়ে নিহত হয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শিদের বরাতে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। তিন বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি এবং প্রায় ২ হাজার চীনা শ্রমিক পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছে। তাদের নিরলস পরিশ্রমে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের প্রথম সফল বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চলেছে। এ কৃতিত্ব বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিনিয়োগ, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং উভয় দেশের ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসেরই সাফল্য গাঁথা। পক্ষান্তরে পায়রা বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রকল্পের প্রস্তাব গ্রহণের চার বছর আগে প্রকল্পের কাজ শুরু করেও সুন্দরবনের রামপালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এর অর্থ হচ্ছে, প্রায় চার বছর আগে শুরু করেও ভারতের সাথে যৌথ উদ্যোগের প্রকল্প উৎপাদনে যেতে না পারলেও মাত্র তিন বছরের মাথায় চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের প্রকল্প উৎপাদনে যাওয়ার সাফল্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে। দেশের প্রথম তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে উৎপাদনে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক সংর্ঘষ এবং চীনা শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মনে করার কোনো কারণ নেই। এটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন বিশেষ জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাচ্ছেন। সংঘর্ষের মোটিফ, চীনা শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা থেকে এটাই প্রতিয়মান হচ্ছে, যারা এ ঘটনার সাথে জড়িত তারা চীনা বিনিয়োগ ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বকে ব্যহত করতে চাইছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু চীনা বিনিয়োগই নয়, যে কোনো খাতের বিদেশি বিনিয়োগসহ যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিরুৎসাহিত করতে নাশকতা হিসেবেই গণ্য হতে পারে।

বাংলাদেশের সাথে চীনের অব্যাহত উন্নয়ন অংশীদারিত্ব ও হাজার হাজার কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগকে প্রতিবেশী আরেকটি দেশ হয়তো ভালভাবে গ্রহণ করছে না। চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে চীনের সাথে সুসম্পর্ক নস্যাৎ ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে কারা বেশি খুশি হয়, কাদের ভ‚-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল হয় তা সহজেই অনুমেয়। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে পড়া এবং এসব ঘটনা নিয়ে অপপ্রচারের সাথেও বাংলাদেশবিরোধী একটি চক্রের ইন্ধন ও যোগসাজশের অভিযোগ আছে। গতকাল প্রকাশিত আরেক রিপোর্টে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চায়না হারবার কোম্পানীর ২০-২৫জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে বলে জানা যায়। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা ও একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাৎক্ষনিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনসহ বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকা বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। আমরা আশা করব খুব দ্রæত সেখানে কাজের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসবে এবং আবারো বাংলাদেশ ও চীনা শ্রমিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে।কানো ষড়যন্ত্র বা উদ্দেশ্যপূর্ণ নাশকতা যেন দেশের উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত করতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ইতিমধ্যে সংঘটিত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সাথে যারা জড়িত হয়েছে তাদেরকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ঘটনার নেপথ্য ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করতে হবে। যথাসময়ে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চ‚ড়ান্ত বাস্তবায়িত রূপ লাভ করবে এবং চীন-বাংলাদেশ সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিদ্যুৎ কেন্দ্র

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন