Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ২৪ জুলাই ২০১৯, ০৯ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

এত বড় বাজেট এত উন্নয়ন তারপরও মানুষ কেন সুখী হতে পারছে না

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ২১ জুন, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

প্রতি বছরের মতো বাজেট নিয়ে এবারও পক্ষে-বিপক্ষে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। এর ভাল ও মন্দ দিক নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষ বাজেটের গুরুগম্ভীর বিশ্লেষণ খুব কমই বোঝে। সাধারণ অর্থে তারা শুধু বোঝে বাজেট মানেই হচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়া এবং কমা। কোন জিনিসের দাম বাড়লো আর কোন জিনিসের দাম কমলো, বাজেটের কারণে তাদের জীবনযাপনের বাজেট কমবে না বাড়বে এবং সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পাবে কিনাÑএ হিসাবটাই বেশি বোঝে। এর বেশি কিছু তারা বোঝে না বুঝতেও চায় না। দেশের লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। এটা সরকার যারা পরিচালনা করেন এবং যারা দেশের অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা করেন, তাদের ব্যাপার। সাধারণ মানুষের এমন চিন্তা কোনো রাষ্ট্রের জন্যই কল্যাণকর নয়। এর মাধ্যমে এটাই বোঝায় যে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই। এর ফলে জনগণ ক্ষমতার উৎসÑএ কথা অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এ কথা যুগের পর যুগ ধরে অর্থহীন এবং তাত্তি¡ক কথা হয়েই রয়েছে। বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা জনগণের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি, মতামতের মূল্য খুব কমই দেন। তারা মনে করেন, আমরা যেভাবে চালাব, জনগণও সেভাবেই চলবে। অর্থাৎ জনগণের সুখ-শান্তি এবং কল্যাণের বিচার, সরকারে যারা থাকেন তাদের সুখ-শান্তি দিয়ে বিচার করা হয়। এটা অনেকটা সামন্ত যুগের মতো। প্রাসাদে বসে সোনার থালায় খানাপিনা করে প্রজাদের সুখ-দুঃখের বিচার করার মতো। এভাবে কি প্রজাদের সুখ-দুঃখ অনুভব করা যায়? সামন্তযুগীয় রাজাদের কাজই ছিল প্রাসাদে বসে কীভাবে প্রজাদের কাছ থেকে বেশি বেশি খাজনা আদায় করা যায়। অবশ্য এমন রাজাও ছিলেন যারা প্রাসাদ ছেড়ে ছদ্মবেশে প্রজাদের সুখ-দুঃখ দেখা ও বোঝার জন্য পথে পথে ঘুরতেন। এমন রাজা-বাদশা এই দুনিয়ায় এখন নেই। আমাদের দেশেও নেই। রাজা-বাদশাদের যুগ শেষ হয়ে গেছে। তবে তাদের আচার-আচরণ সরকারের মধ্যে রয়ে গেছে। শুধু ধরণ বদলেছে। মুখে জনগণের সেবক বললেও কাজে তার ফল দেখা যায় না। বরং দেখা যায়, বাজেটের মাধ্যমে এবং নানাবিদ উপায়ে জনগণের অর্থ পকেট থেকে বের করে নেয়ার প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে। সরকার চালানো এবং উন্নয়নের কথা বলে এ অর্থ বের করে নেয়া হয়। অর্থাৎ বাজেট সরকার চালানো, টিকে থাকা এবং একটি শ্রেণীকে খুশি করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যদি এমন হতো সরকার প্রত্যেক মানুষের স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করার জন্য আলাদাভাবে বাজেট করে দিয়েছে, তাহলে কতই না ভাল হতো! দেখা যেত বাজেটের সময় এলেই জনগণ খুশিতে মেতে উঠত। এখন বাজেট ঘোষণার কথা শুনলেই একটি শ্রেণী খুশিতে আটখানা হয় আর সাধারণ মানুষ আঁতকে উঠে। সাধারণ মানুষ ধরেই নেয় তাদের পকেট টানাপড়েন এবং পকেট কাটার সময় হয়েছে। অনেকে হয়তো বলতে পারে, প্রত্যেক মানুষের জন্য সরকারের পক্ষে কি আলাদা বাজেট করা সম্ভব? পৃথিবীর কোনো দেশ কি এমন বাজেট করে? এসব প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, করে না। তবে তারা যা করে তা হচ্ছে, তারা সাধারণ মানুষের অসুবিধা হয় এবং একটি শ্রেণী বেশি সুবিধা পায় এমন বাজেট করে না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। ছোট্ট দেশ ভুটানের কথাই ধরা যাক। দেশটি জনগণের উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে জিডিপি’র পরিবর্তে জিএনপি’কে (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) গুরুত্ব দেয় বেশি। এর মাধ্যমে জনগণের সুখ-শান্তি নির্ধারণ করে। ফলে এ অঞ্চলের মধ্যে ভুটান সবচেয়ে সুখ-শান্তির দেশ। আর আমাদের সরকার আছে বাজেটের আকার কত বড় করা যায় এবং জিডিপি’র হার কত বেশি দেখানো যায়Ñএ ক্রেডিট নেয়ার চিন্তা নিয়ে। এই বাজেটের অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে জনগণের পকেটে হাত দিয়ে তাদের সুখÑশান্তি হারাম করে দেয়া হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশের ৯০ ভাগ সম্পদের মালিক মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ। দেশের জন্যসংখ্যা যদি ১৬ বা ১৭ কোটি হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৯০ ভাগ সম্পদ মাত্র ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন এদের চিহ্নিত করে যদি বাজেটের অর্থের সংস্থানের বিষয়টি ভাবা হতো, তাহলে অর্থের সংস্থানের জন্য সাধারণ মানুষের উপর এত ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করার প্রয়োজন পড়ত না, কষ্টও হতো না। বরং দেখা যাচ্ছে, যারা ধনী তাদের আয়ের সারচার্জ বা ট্যাক্স আদায়ের সীমা আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে এই ১ জুলাই থেকে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, কেনা-কাটায় কতভাবে যে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ ভ্যাট দিতে হবে তার কোনো হিসাব নেই। যারা ভ্যাট নেবে তাদের সাথে কিছুদিন হাউকাউ করবে, তারপর কিছু করতে না পেরে থেমে যাবে। মনে অশান্তি নিয়েই জীবনযাপন শুরু করবে। জীবনযাপনের বাজেটে কাটছাঁট করে টানাপড়েনের মধ্যে চলতে হবে। এ কারণেই বাংলাদেশ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনোমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) বিশ্ব শান্তি সূচকÑ২০১৯ তালিকায় ৯ ধাপ পিছিয়ে গিয়েছে। ৯৩ থেকে ১০১Ñএ চলে গেছে। সংস্থাটি বিশ্বের ১৬৩টি দেশের ওপর এ জরিপ চালায়। গত বছর জাতিসংঘের প্রকাশ করা ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টেও ১৫৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৫। অর্থাৎ যতই দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ ততই অসুখী হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এত বড় বাজেট প্রণয়ন, এত উন্নয়ন কাদের সুখী করার জন্য? আর উন্নয়নই যদি হবে, তবে দেশের মানুষ সুখী হতে পারছে না কেন?

দুই.
সুখের সংজ্ঞা এবং সুখী হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক। অঢেল সম্পদের মাঝে থেকে যেমন অসুখী হতে পারে, তেমনি স্বল্প সম্পদের মাঝেও মানুষ সুখী হতে পারে। তবে এ যুগে সুখের মূল সংজ্ঞাটি সম্পদ ও অর্থ কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সারাবিশ্বই এর ওপর জোর দিচ্ছে। এজন্য এখন বলা হয়, বিশ্বে এখন চলছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে যে যত এগিয়ে যেতে পারবে, সেই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। এখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ বজায় রেখে সুখী হওয়ার সুযোগ নেই। আমরাও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এ প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছি। ‘যে যেভাবে পারো অর্থ কামাও’ এমন একটা আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারের নীতির মধ্যেও তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকার বাজেটসহ মানুষের মাথাপিছু আয়, জিডিপি এবং উন্নয়ন বেশি বেশি দেখানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। যা নেই তাও দেখানো হচ্ছে। সরকার তার কৃতিত্ব দেখানোর ঘোরে মানুষের সুখÑশান্তির বিষয়টি উপেক্ষা করে চলেছে। বিশ্ব হ্যাপিনেস রিপোর্ট দেখলেই তা বোঝা যায়। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় শামিল হতে গিয়ে আমাদের চিরায়ত যে পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা যে ক্রমেই বিলুপ্তর দিকে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল করছে না। সুশাসনের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন পত্র-পত্রিকায় যে হারে রোমহর্ষক খুন-খারাবি, ধর্ষণ, মাদকের বিস্তার, দুর্নীতি, ক্ষমতার দাপটের মতো গা শিউরে উঠার মতো সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তা থেকে বোঝা যায়, আমাদের পরিবার ও সামাজিক শাসন-বারণ তলানিতে চলে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান এ অবনতিতে মানুষের সুখ-শান্তি হারাম হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অসুখী হচ্ছে। আইইপি যে মাপকাঠিতে সুখী দেশের তালিকা তৈরি করেছে তার উপাদান হচ্ছে, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন, অর্থনৈতিক মূল্য, ট্র্যান্ড এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে দেশগুলোর নেয়া পদক্ষেপ। অন্যদিকে, জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশন নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন)-এর জরিপে সুখের মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, দাতব্য সেবা এবং দুর্নীতিহীনতা। এ মাপকাঠির দশ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ৪.৬৪৩ পয়েন্ট। জরিপে দেখানো হয়েছে, যেসব দেশে বৈষম্য বা ভেদাভেদ কম, সে দেশের মানুষ বেশি আনন্দে থাকে। বিশেষ করে যেসব দেশে সামাজিক সহায়তা বেশি, বিপদে সমাজ বা রাষ্ট্রের সহায়তা পাওয়া যায়, সেসব দেশের নাগরিকরাই বেশি সুখী। আমাদের দেশে এ মাপকাঠি নিচের দিকে। তবে এ কথাও সত্য, জরিপ বা পরিসংখ্যানে সবসময় সত্যিকারের চিত্র প্রতিফলিত হয় না। এটা একটি ধারণামাত্র। সার্বিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য এ জরিপ এক ধরনের পরিমাপক। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ চিরকালই একটি দুঃখী দেশ। এদেশের মানুষকে শত শত বছর ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হয়ে নিপীড়ন-নির্যাতন সইতে হয়েছে। এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে অনেক সংগ্রাম ও রক্ত দিতে হয়েছে। অবশেষে নিজের দেশে সুখে-শান্তিতে বসবাসের লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তারপরও এদেশের মানুষ সুখের সন্ধান পায়নি। সুখের সন্ধান যে পায়নি, তা ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে তলানিতে থাকা থেকেই বোঝা যায়। তার চেয়েও বড় বিষয়, এখনও আমাদের শাসক গোষ্ঠী বক্তৃতা-বিবৃতিতে বাংলাদেশকে একটি সুখী সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার কথা অহরহ উল্লেখ করছে। এ থেকেই বোঝা যায়, বাংলার জনগণ দুঃখের মধ্যে আছে। তাদের সুখের জন্য যে ত্রিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন-তা সোনার হরিণ হয়েই রয়েছে। অথচ ভুটান তার জনগণকে কতই না সুখে রেখেছে এবং দিন দিন সুখের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। আইইপি বিশ্ব শান্তি সূচকÑ২০১৯ তালিকায় শান্তির শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় ঢুকে পড়েছে। গত বছরের ১৯তম থেকে ১২তম স্থানে চলে এসেছে। গত একযুগে ৪৩ ধাপ এগিয়েছে। আর আমার কেবল দিন দিন পিছিয়েই যাচ্ছি। মানুষকে সুখে রাখার জন্য ভুটান জিডিপি’র পরিবর্তে জিএনএইচÑকে (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) বেশি গুরুত্ব দিয়ে বাজেট করে। ভুটান সরকার তার জনগণের সামষ্টিক জীবনযাপনের মান, আয়, সম্পদ এবং বাড়ির প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করে এই জিএনএইচ নির্ধারণ করে। অর্থাৎ দেশটির সরকার তার প্রত্যেক জনগণের পারিবারিক, সামাজিক, আয়-ব্যয় এবং সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রেখে তার বাজেট প্রণয়ন করে। দেশটির এই জিএনএইচ পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ অন্যান্য দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের সরকার মানুষের সুখ-শান্তির বিষয়টি উপেক্ষা করে কেবল উন্নয়নের রোল মডেল হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বড় অংকের বাজেট তৈরি এবং তার অর্থের সংস্থান করতে সাধারণ মানুষকে চিড়েচ্যাপ্টা করে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করে না, যে উন্নয়ন করা হচ্ছে তা যদি দেশের মানুষকে শান্তিতে রাখতে না পারে, তবে তা দিয়ে কি লাভ?

তিন.
বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ কতটা সুখী আর কতটা অসুখী, তা তারা বলতে পারছে না। বলার মতো কোনো প্ল্যাটফর্মও নেই। আমাদের সুখের কথা বলে দিচ্ছে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান। তারা আমাদের দেশে এসে হাজার খানেক মানুষের মতামত নিয়েই সুখী-অসুখীর রায় দিয়ে দিচ্ছে। এখন হাজার খানেক মানুষের সুখ-দুঃখের উপর ভিত্তি করে ষোল কোটি মানুষের সুখ-দুঃখের বিচার করা কতটা যৌক্তিক, তা পাঠকরাই ভাল বলতে পারবেন। হতে পারে কিছু মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে এ জরিপ করা হয়। তবে তা যে সঠিক হবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এই সময়ে যদি বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখের হিসাব করা হয়, তবে অনেকেই একমত হবেন, তারা ভাল নেই। এই ভাল না থাকার মূল কারণ হচ্ছে, সুশাসন। দেশে যে সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, তা একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের দিকে তাকালেই এটা বোঝা যায়। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে পরিলক্ষিত হবে, দেশে এক ধরনের ‘জোর যার মুল্লুক তার’ প্রবণতা বিরাজ করছে। যারা ক্ষমতাবান, তাদের কথাই সঠিক, মানতে হবে এবং এর বাইরে যাওয়া যাবে না, এমন একটা প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীনদের এই নিরঙ্কুশ আধিপত্য এবং থ্রেটের মধ্যে সাধারণ মানুষ রয়েছে। দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার ও লুট হয়ে গেলেও তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। শেয়ার বাজার থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেল আর ৩৩ লাখ মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ল, কেউ কেউ অত্মহত্যা করলেওÑএর কোনো প্রতিকার হয়নি। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঋণ খেলাপি হয়ে গেলেও তা আদায়ে অনেক নমনীয়তা প্রদর্শন এবং সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়। দেশর মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে, তাদের কাছ থেকে নেয়া টাকা একটি শ্রেণী কীভাবে লুট করে নিচ্ছে এবং তাদেরকেই বেশি সুবিধা দেয়া হচ্ছে। যে দেশে জনগণের অর্থ নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা হয়, সে দেশের মানুষ কিভাবে সুখে থাকে? এর উপর জনগণকে যতভাবে টানাপড়েনের মধ্যে ফেলা যায়, তার প্রক্রিয় তো রয়েছেই। এক পা আগালে দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছে। তাদের জীবনযাপন হয়ে পড়েছে বানরের তৈলাক্ত বাঁশে উঠানামার মতো। তবে ক্ষমতার কাছাকাছি ও প্রভাবশালী মহলের কিছু লোক যে মহাসুখে আছে, তাতে সন্দেহ নেই। তারা এ দেশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করলেও তারা এ দেশকে সুখের আবাস মনে করে না। তাদের সব সুখ হয়ে আছে বিদেশ। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকায় তারা বসতভিটা বানিয়েছে। অনেকের সুইস ব্যাংকে অঢেল টাকা জমা আছে। তাদের আচরণ অনেকটা ইংরেজদের মতো। ইংরেজরা যেমন ইংল্যান্ডের বাসিন্দা হয়ে এ দেশ দুইশ’ বছর শাসন করেছে এবং সম্পদ নিয়ে গেছে, তেমনি আমাদের দেশেরও কিছু লোক এ কাজ করে চলেছে। লুটপাটের কথা বাদ দেয়া যাক। আমরা যদি মানুষের নিরাপত্তার দিকে তাকাই, তাহলে মানুষের চেহারায় আতঙ্কই দেখব। অপহরণ, খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস এতটাই বেড়েছে যে কে কখন অপহরণ বা খুনের শিকার হবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যর অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নতুন নয়। যাদের দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তারা যদি ভয়ংকর হয়ে উঠে, তাহলে মানুষ সুখে থাকে কীভাবে! বিষয়টি শ্বাপদসংকুল পরিবেশে মানুষের ত্রস্ত ও শংকিত হয়ে বসবাসের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কী সুখে থাকা যায়? এর পাশাপাশি তো সামাজিক অপরাধ রয়েছেই। হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, নীতি-নৈতিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয় মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে যে নিজের সন্তানকে পর্যন্ত খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। পুরো সমাজ ব্যবস্থায় এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্রের পরিচালকরা যদি সঠিক পথে না থাকে বা সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে না পারে, তবে অনিবার্যভাবে তার প্রতিক্রিয়া দেশের রন্দ্রে রন্দ্রে পড়তে বাধ্য। মাথা যদি ঠিক না থাকে, শরীর ঠিক থাকার কোনো কারণ নাই। আমরা যদি রাজনীতির দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সেখানে যারা বিচরণ করেন, তারা সুখে আছেন, এমন কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবে না। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের কথা বাদ দেয়া যাক। তাদের দুঃখের সীমা নেই। তবে সরকারে যারা আছেন এবং যেভাবে আছেন, তারা কি সুখে আছেন? শান-শওকত ও ক্ষমতা-প্রতিপত্তির মধ্যে থেকেও কি শঙ্কার মধ্যে নেই? বিশেষ করে যারা জনসাধারণের ভোটের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে, তাদের শঙ্কা তো স্বৈরাচার সরকারের চেয়েও বেশি থাকে। কারণ ক্ষমতাচ্যুত হলে এর জবাব জনগণকে অবধারিতভাবে দিতে হবে। এটা অবশ্য পরের কথা। তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে দেশ জোরজবরদস্তির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়, সে দেশের মানুষ কোনোভাবেই সুখে থাকতে পারে না।

চার.
দেশ ও দেশের মানুষকে সুখী করার জন্য সর্বপ্রথম যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন, তা আজও প্রতিষ্ঠা কারা যায়নি। এখনও এ নিয়ে আলোচকরা এন্তার আলোচনা করছেন। তাদের কথাবার্তা আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। সুশাসন আর প্রতিষ্ঠা হয় না। কেবল দুঃশাসনই গ্রাস করে চলেছে। এর ফলে মানুষের প্রাণহানি, অপহরণ, নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে এক ধরনের লুটপাটতন্ত্র কায়েম হয়েছে। জনগণের পয়সা মেরে খাওয়ার সংস্কৃতি চালু হওয়া এবং কীভাবে তাদের জীবনে টান ধরানো যায়, তার প্রক্রিয়া চলছে। এক ‘বর্গী’ শ্রেণীর হানা যেন বিস্তৃত হয়েছে। সব লুটপাট করে তারা নিজেরা সুখে থাকতে চাচ্ছে। অন্যদিকে জনগণের সামনে উন্নয়নের কিছু ‘প্ল্যাকার্ড’ তুলে ধরে আশ্বস্থ ও সান্ত¦না দেয়ার অবিরাম প্রচেষ্টা চলছে। দেশকে এক ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের সুখে থাকার কারণ থাকতে পারে না। দেশের মানুষ কতটা সুখে আছে তা বোঝার জন্য কোনো হ্যাপিনেস রিপোর্টের প্রয়োজন নেই। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মানুষগুলোর চেহারার দিকে তাকালেই যে কেউ বুঝতে পারবেন। কিংবা পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষের জীবনযাপন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও তা বোঝা যাবে। এসব মানুষের কাছে সুখ সোনার হরিণ হয়েই রয়েছে। তাদের কাছে লক্ষ-কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা আতঙ্ক ছাড়া আনন্দ বয়ে আনে না।
darpan.journalist@gmail.com

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বাজেট

২৯ জুন, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ