Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২২ জুলাই ২০১৯, ০৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৮ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

নৌপথ সচল ও গতিশীল করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৫ জুন, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

এক সময় নদীপথই ছিল দেশের সবচেয়ে বড় যোগাযোগ মাধ্যম। এই পথে মালামাল পরিবহন, আমদানি-রফতানি থেকে শুরু করে যাতায়ত ছিল অন্যতম যোগাযোগ ব্যবস্থা। সারাবিশ্বে এখনও এই মাধ্যম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, নদ-নদীকে কেন্দ্র করেই জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে। প্রকৃতিগত কারণে নদ-নদীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুখ্যাতি অতি প্রাচীন। জালের মতো বিস্তৃত হয়ে আছে অসংখ্য নদ-নদী। এখন সেই দিন আর নেই। নদ-নদী মরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অবস্থাও করুণ। নদীপথে যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য যেখানে ২৪ হাজার কিলোমিটার পথ ছিল, সেখানে এখন রয়েছে ১৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এই পথের সবটুকু যে ব্যবহার উপযোগী তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এই যে হাজার হাজার কিলোমিটার নদীপথ হারিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে তার জন্য পরিবেশবিদরা দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে। এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, উদাসীনতা ও দায়িত্বহীন, সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং যথাযথ তদারকির অভাবেই নদীপথ হারিয়ে যাচ্ছে। সংসদে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ গত রবিবার এক সংসদ সদস্যর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তা স্বীকারও করেছেন। তিনিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন। পাশাপাশি তিনি এ কথাও বলেছেন, সরকার ইতিমধ্যে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ১৬০০ কিলোমিটার নৌপথ ও জলাশয় তৈরি করেছে। আগামীতে ১৭৮টি নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সৃষ্টি করা হবে বলে তিনি জানান। প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য সামনে রেখে পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা যায় নদীপথ প্রাকৃতিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমরা কিছুই করতে পারছি না। তাহলে এ সংশ্লিষ্ট যেসব কর্তৃপক্ষ রয়েছে তারা কি করছে?

এ কথা সবারই জানা, ভারতের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহার এবং বৈরী পানিনীতির কারণে দেশের নদ-নদীগুলো মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। স্বাভাবিক গতি হারিয়ে অনেক নদ-নদী মরে গেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের মতো বড় নদ-নদীগুলো নাব্য হারিয়ে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব নদ-নদী থেকে বিস্তৃত অসংখ্য শাখা নদী মরে গেছে। দেশের উত্তরাঞ্চল মরুকরণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ নদ-নদী কেন্দ্রিক সব প্রতিষ্ঠানকে সচেতন হওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদ-নদীর গতিপথ ও নাব্য ঠিক রাখার কার্যক্রম চালোনো উচিত ছিল। দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নৌ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই তা স্পষ্ট হয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতি বছর নদ-নদীর ড্রেজিং ও ব্যবস্থাপনা বাবদ যে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ব্যয় হয় তা কোথায় যায়? বিশ্লেষকরা বলছেন, বরাদ্দ ও ব্যয়কৃত টাকা কোথায়-কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা তদন্ত করে বের করা দরকার। বলা বাহুল্য, এ খাতের অর্থ নিয়ে নয়-ছয় ও দুর্নীতির বিষয়টি অতি পুরনো। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। এ নিয়ে বহু লেখালেখিও হয়েছে। বাস্তবে এর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদার বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে আছে। এর সাথে রয়েছে উদাসীনতা ও গাফিলতি। এসব কারণেই দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এটা যে দেশের অর্থনীতির জন্য কত বড় ক্ষতি, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করছে না। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শত শত কোটি ডলার খরচ করে নতুন নদী সৃষ্টি করছে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে মরুভূমি খননের মাধ্যমে নদী তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে প্রকৃতির অপার দান আমাদের নদ-নদী টিকিয়ে রাখতে পারছি না। পর্যাপ্ত ড্রেজিংয়ের অভাব, দখল-দূষণের মাধ্যমে তা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে-এই অতি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগানটি পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর তুলে ধরলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর টনক নড়ছে না। টনক যে নড়ছে না তা সংসদে দেয়া নৌ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। তবে আশার কথা, তিনি নতুন নদীপথ সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন। দেখার বিষয় হচ্ছে, এ পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয় কিনা।

সরকার দেশের সড়কপথ উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে। পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নসহ মহাসড়ককে চারলেন এবং আটলেনে উন্নীত করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্প দৃশ্যমানও হচ্ছে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বল্পব্যয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা নৌপথ উন্নয়নে এমন বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিতে দেখা যায় না। এ পথকে সচল ও উপযোগী করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম যে ড্রেজিং ব্যবস্থা, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অথচ রাষ্ট্রের অর্থ ঠিকই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে এবং তা একটি শ্রেণীর দুর্নীতির অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। এ অরাজকতা চলতে দেয়া যায় না। আমরা মনে করি, দেশের নৌপথকে সচল করার জন্য সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ প্রকল্প হাতে নেবে। ড্রেজিং নিয়ে যে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং এ খাতের অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা যথাযথভাবে মনিটর করার উদ্যোগ নেবে। নদ-নদী অবৈধভাবে দখল এবং এর তীর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ জোরালো করতে হবে। ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্ব স্ব জেলার নদ-নদী অবৈধভাবে দখলদারদের নামের তালিকা প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। আশা করি, এসব অবৈধ দখলকারীর নাম জনসম্মুখে প্রকাশ করে তাদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে। এতে কিছুটা হলেও নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরে আসবে। নদ-নদী বাঁচাতে এবং নৌপথ উদ্ধার ও সচল করতে যে ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, তা নিতে হবে। যাতায়াত ব্যবস্থা, পণ্যপরিবহন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গতি বৃদ্ধি করতে নৌপথকে সচল করা অপরিহার্য।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন