Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯, ০২ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৩ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর জাতীয় বাজেটের প্রভাব

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৫ জুন, ২০১৯, ৯:০৬ পিএম
  • দুই তৃতীয়াংশের অভিমত-পণ্যের দাম বাড়ে
  • ১৭% জানেই না বাজেট কী!

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছেÑদুই তৃতীয়াংশ লোক মনে করেন বাজেট ঘোষণার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে। পাঁচ ভাগের এক ভাগ মনে করেন বাজেটের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব জনজীবনে পড়ে না। আর, ১৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানেনই নাÑবাজেট কী !

দেশের দরিদ্র ও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর জাতীয় বাজেট কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং এতে কী ধরনের ন্যূনতম পরিবর্তন আনা হলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবেÑসে বিষয়ে ব্র্যাক, গবেষণা সংস্থা আইসোশ্যাল ও উন্নয়ন সমন্বয় সম্মিলিতভাবে একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল জানাতে মঙ্গলবার (২৫ জুন) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

আয়োজকেরা জানান, গবেষণার অংশ হিসাবে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো সূচককে সমন্বিত করে একটি নিবিড় ডাটা মডেল তৈরির কাজ চলছে। এই মডেলের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাজেটের সামগ্রিক প্রভাব সম্পর্কে ধারাবাহিক ও নিবিড় সমীক্ষা করা সম্ভব হবে। এই গবেষণা ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলবে।

তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছেÑপ্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আসতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন তা নিরূপণ করা; জাতির অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে সুসমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, কৌশল, পদ্ধতি ও কার্যক্রমে বিদ্যমান সমস্যা ও অন্তরায়গুলোকে চিহ্নিত করা এবং ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ এই সাত বছরব্যাপী বিস্তৃত ডাটা মডেলটিকে আরো সুষ্ঠু ও নিখুঁত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা।

গবেষকরা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সব সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক এবং নীতিগত পদক্ষেপকে আমলে নিয়ে ডাটা মডেলটির তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। পরিবার পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা ও অর্থনৈতিক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব সূচক ও নীতিগত পদক্ষেপ কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করে তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ হচ্ছে এই গবেষণাকর্মের অন্যতম প্রধান কাজের ক্ষেত্র। ফলে, এই ডাটা-মডেলটির প্রধানতম লক্ষ্য জাতীয় অর্থনীতি ও পারিবারিক অর্থনীতির মধ্যেকার জটিল সম্পর্ককে একটি যথাসম্ভব বিশদ ও বুদ্ধিগ্রাহ্য কাঠামোর মাধ্যমে উপস্থাপন করা।

সংবাদ সম্মেলনে একটি প্যানেল আলোচনায় যোগ দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আতিউর রহমান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিআইডিএস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ, আইসোশ্যাল-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. অনন্য রায়হান ও ব্র্যাকের পরিচালক কেএএম মোরশেদ।

ড. আতিউর বলেন, গার্মেন্টস কারখানার একজন শ্রমিক মাঝবয়সে গেলেই তার চাকরি হারাতে পারেন। তখন শূণ্য হাতে বাড়ি ফিরে তিনি নিজ পরিবারেও আগের মর্যাদা পাবেন না। তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই একটি সার্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করা গেলে সব শ্রেণির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবে। জরিপে বেশিরভাগ লোকই মতপ্রকাশ করেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তরুণদের কর্মসংস্থান খাতে সরকারি উদ্যোগ ও ভর্তুকি বাড়ানোর জন্য।

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ধনীর তুলনায় গরিবের উন্নতি হচ্ছে খুবই ধীরগতিতে, তাই বৈষম্য বাড়ছে। এটা কমিয়ে আনার কৌশল উদ্ভাবন করে তা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।

কেএএম মোরশেদ বলেন, বরাদ্দ বাড়ানো উচিৎ এ কথা ঠিক। কিন্তু বাজেটে বিভিন্ন খাতে যতটুকুই বরাদ্দ হয়েছে, তা যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা সঠিক লোকজনের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি নাÑএর সঠিক তদারকিও প্রয়োজন।

ডা. অনন্য রায়হান বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দেব অঙ্ক এবং সুবিধাভোগীর আওতা বৃদ্ধি সরকারের সদিচ্ছার পরিচায়ক। তবে অপচয় রেরাধ করে টার্গেট গ্রুপের কাছে এসব যথাসমযে পৌঁছাতে হবে।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, বিপুল এই গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি জাতীয় সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলনে সক্ষম একটি বিশাল উপাত্তভা-ার। এই লক্ষ্যে গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে দেশব্যাপী একটি দৈবচয়নভিত্তিক খানাজরিপ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত উপাত্তের সঙ্গে ইতিমধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন উপাত্তভা-ারের তুলনা করা হয়েছে। দৈবচয়নভিত্তিক জরিপটির জন্য প্রথমে অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত এই তিন অর্থনৈতিক শ্রেণির খানা নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের সংজ্ঞা ব্যবহার করে খানাগুলোকে বাছাই করা হয়েছে। এই তিন ধরনের খানাকে আবার নারীপ্রধান ও পুরুষপ্রধান খানায় ভাগ করা হয়েছে। সবশেষে খানাগুলোকে নগর ও গ্রাম অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। এভাবে মোট ৪ হাজার ৮০০ খানায় জরিপটি সম্পন্ন করা হয়েছে। জরিপে প্রাপ্ত ফলাফল আবার ইতিমধ্যে বিদ্যমান তথ্য উৎসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

প্রাথমিক জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑসামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা, জাতীয় বাজেটে বিদ্যমান বিভিন্ন অগ্রাধিকার সম্পর্কে জনভাবনা ও প্রান্তিক খানাগুলোতে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিষয়ে জরিপে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য ফলাফল: হচ্ছেÑ ৪ হাজার ৮০০ খানার মধ্যে ১০ শতাংশ অন্তত একটি সামাজিক সুরক্ষা সেবা গ্রহণ করেছে, সামাজিক সুরক্ষা সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ নারী। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা - এই চার ধরনের সামাজিক সুরক্ষা সেবায় অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়েছে বলে এই জরিপে প্রতীয়মান হয়েছে। তুলনায় বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা সেবাগ্রহীতা কম বলে মনে হয়েছে। পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় ও চিকিৎসা ব্যয় মেটানো এবং এসব পরিবারের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও মানসিক কল্যাণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাতীয় বাজেটে বিদ্যমান বিভিন্ন অগ্রাধিকার সম্পর্কে জনভাবনার বিষয়ে জরিপে বেরিয়ে এসেছেÑদুই-তৃতীয়াংশ লোক মনে করেন এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বাড়ে। পাঁচ ভাগের এক ভাগ মনে করেন বাজেটের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব জনজীবনে পড়ে না, অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দৈর্ঘ্য কিছুটা হ্রাস পায়। ১৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বাজেট কী তা জানেন না।

প্রান্তিক খানাগুলোতে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি ও ব্যবস্থার বিষয়ে জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি খানা দুর্যোগকালীন অথবা পরে তাদের সঞ্চয় ভেঙে খরচ করতে বাধ্য হয়েছে। বাকিদের প্রায় সবাই দুর্যোগকালে ধার করতে বাধ্য হয়েছে। এই দুই ঘটনাই দীর্ঘমেয়াদে তাদের পারিবারিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে।

পাঁচ ভাগের এক ভাগ খানা দুর্যোগের কারণে ব্যয় সংকোচন বা আয়ের জন্য বাড়তি কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে তাদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক কল্যাণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: জাতীয় বাজেট


আরও
আরও পড়ুন