Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২২ জুলাই ২০১৯, ০৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৮ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

কবিতা

জাহানারা আরজু | প্রকাশের সময় : ২৭ জুন, ২০১৯, ১২:৩৭ এএম

পদ্মাপাড়ের গাঁথা

সেই পদ্মা, রূপবতী পদ্মা, ছুঁই ছুঁই করছে এখন
মসজিদ-মাদ্রাসা-ডাকঘর-হাসপাতাল হাট-বাজার-
ফলবতী আম কাঁঠালের বাগান, কবরস্থান, বুকভরা
শস্য-শীষ নিয়ে ডুবে গেছে সাধ্যের ক্ষেত খামার,
সোনাভানের সচ্ছল সংসার, রঙিন ফুল তোলা শিকা,
বেড়ায় টাঙ্গানো জোড়া পাখি ‘সুখে থাক’, ফুলের ওপর
ঝিমধারা কালো ভ্রমর, তুলো আর মাছের আঁশের রাজহাঁস
নিপুণ হাতের সূচিকর্ম- যে ছবিরা একদিন কথা বলত একান্তে
সুখ দুঃখের কবিতার মতো, ডুবে গেছে সব!
একদা বিত্তশালী যাঁরা ছিলেন মোড়ল-মাতব্বর প্রধান,
কোথায়ও কেউ নেই আর, চলে গেছে দূর দূরান্তে একটি
আশ্রয়ের খোঁজে নতুন জনারণ্যের ভিড়ে, কেউ বা খুঁজে নিয়েছেন
সামান্যতম আশ্রয়- আচ্ছাদন, ঠিকানাহীন বৃত্তে একটি ডেড়ায়-
ঝলমলে এই শহরের পাশে বস্তির ছই ঘরে পড়ে থাকা
ডাস্টবিনের জঞ্জালের মতো! ওরা ফিরে আসে দিনান্তে
এই অস্থায়ী ঠিকানায়, লোনাঘাম জমাট বাঁধে ওই শিড়াওঠা বাদামি চামড়ায়।
দু’মুঠো ভাতের জন্য কিশোর ছেলেটি ঝাঁট দেয় মুখ বুজে
দোকান ঘর, লেখাপড়ার বইখাতা পড়ে থাকে অবহেলায়
ছিন্ন কাঁথায়। কিশোরী কন্যাটি ফুল বিক্রি করে বড় রাস্তার
মোড়ে। হয়তো একদিন বিকৃত লালসার শিকার হয় কোনো এক
মানুষ নামী পশুর থাবায়- ফুলের কুঁড়ির মতো দেহখানি তার
ঝরে যায় অবহেলায়!
একদা সচ্ছল গৃহিণীর হাতে উঠেছে ঘর মোছা বালতি,
কাপড় কাঁচার কর্কশ চাপের হাত নিয়ে ঠিকা ঝি এর
খাতায় উঠেছে নাম- সেদিনের গৃহকর্তার পায়ের তলায়
রিকশার চাকায় আগুন জ্বলে অবিরাম-
পেটে জ্বলে তার চেয়েও বেশি ক্ষুধার আগুন বেঁকে গেছে
পিঠ অকালবার্ধক্যের ছোবলে ছোবলে!
এতসব গ্রাস করেও মোহময়ী পদ্মা বয়ে চলে খলবল,
মাঝে মাঝে চর জাগা চর ঝকঝকে রুপোর থালার মতো
মেলে ধরে খেয়ালি বৈভব তার-
দীর্ঘদিনের সময়ের সেতু পার হয়ে পদ্মাপাড়ে এসে
চেয়ে থাকি অপলক, কী ভীষণ সংহার আর সৌন্দর্যের
প্রতীক ওই প্রমত্তা নদী, জীবনের ভাঙাগড়ার মতো
নিয়ত ভাঙছে এপার আর ওপার-
ক্ষুধার্ত গহ্বরে হারিয়ে গেছে কত স্বপ্নের ফুলদল, বাগান, বাথান, জনপদ!
নতুন আশ্বাসে জেগে উঠবে নাকি আবার ওপারের বালুচর
তাই কি ঘরছাড়া মানুষেরা চেয়ে থাকে রুপোলি ঢেউ এর
জলপরীর দিকে, দূরাগত বন্দরে পৌঁছানোর প্রত্যয়ী একদল নাবিকের মতো?

 

জাহাঙ্গীর ফিরোজ
একটি শহর ছিল

অতৃপ্তি সারাক্ষণ কাছে কাছে থাকে
তৃপ্তি সে তো প্রেমময় আসে কখনো কখনো
ক্ষণিক সঙ্গ পেয়ে দূরে সে দাঁড়ায়
মাঝখানে যেটুকু বিশ্রাম সেও স্মৃতিকাতরতা
পথশ্রম, ধুলো ওড়ে মনের শহরে।

একটা শহর ছিল বেগানা শহর
তিন প্রহরের ঘড়ি- পথ পেরিয়ে দেখেছি একটি গ্রাম
দুলছে দোদুল দোলায়
মান-কচুদের সবুজ পাতার নিচে।
সেখানে বাঁশ ঝাড়, শুকনো মরা পাতার ক্রন্দন
ছাইয়ের গাদায় বনমোরগের ছানা
জিরিয়ে নিচ্ছে ক্লান্ত পথের ছাঁয়ায়।

স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের ডানা থেকে ভয়
খসে পড়ে
শিশিরের লাজুক অশ্রুকণায়।
আমাদের প্রেম-ভালোবাসা
আশা ও নিরাশা
বাংলা ভাষায় প্রকাশ করেছি সেই
গহীন প্রাচীন আবেগে।

এ আবেগ ধরে রাখি মনে
সবুজের বনে
মোরগের ডাকে লাল সূর্য উঠেছে।

 


মাহবুবা করিম
হাত থেকে হাত খসে যায়

পথের ভিড়ে
তোর আঙুল পাকড়ে আছে সিগারেট
ঠোঁট ভিজে উঠছে চায়ের কাপে,
মনে হয় আচমকা ভাঙা মন্দিরে
বহু তপস্যার পর তোর দ্যাখা পেলাম।।
আর তুই থ
উরুর উপর থ
দুচারটে খুচরো কথা ফেলে
হাত থেকে হাত খসিয়ে
চিরতরে হাত বদল হয়ে গেলি।

অথচ ভেতরে কাৎরাচ্ছে আমি নামক নীল ব্যথা।
অথচ আমি তুই তোর কাছে ফেলে এসেছি একজোড়া অভিমানী চোখ।

 

 

মাহমুদ কামাল
চিহ্ন

পদচিহ্ন বলে দেয় কে গেছে সম্মুখে
মানুষ, শ্বাপদ।
ফুলের চিহ্ন তার সুখদ গন্ধ
চিবুকের কালো তিল প্রকৃতির বিলোল সুষমা
নদী তার চিহ্ন রেখে এঁকে দেয়ে ধু-ধু বালিচর
চিহ্নগুলো মানবীয় করে দেয় সকল প্রশ্নের।

এখন তেমন আর চিহ্নসূত্র নেই।
দ্বিচারিণী, নাকফুল, ধর্ষিতা অথবা সিঁদুর
এখন পৃথক কোনো দ্রষ্টব্য নয়।
ভিড়ের ভেতর আজ খুঁজে পাওয়া যায় না লক্ষ্য
এক সুরে হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, নীতি ও দুর্নীতি
পার্থক্যবিহীন পোশাক, হাঁটাচলা অভিন্ন ব্যক্তিত্ব
এক মাপে গীত কিংবা অভিনীত সকল নাটক
রুচি ও অরুচির পাশবিক মিলিত চিৎকারে
চিহ্নরা কোথায় গেল কোন বনবাসে?
নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে আজ বিভাজন করে দাও
মানুষ, শ্বাপদ।

 

 

রওনক জাহান তানি
সামাজিক দায়বদ্ধতা

অবলীলায় অবধারিত কাজগুলো
করে যাই অবচেতন মনে।
ভিত্তিহীন প্রজন্মের গড্ডালিকা
প্রবাহে গা ভাসাই।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিচ্ছিন্ন বৈশিষ্ট্যের
বেড়াজালে আবদ্ধ হই।
অদৃশ্য মুঠোতে বন্দী হয়ে যাই
থাকি তামাদ্র নেশায় আছন্ন।
অতলান্তিক আবর্তনে ঘূর্ণায়মান
কাঠামোতে সীমাবদ্ধ।
বয়ে চলা জীবন সা¤প্রতিক
ঘটনার বহতা বাড়ায়।
অজান্তে অবলীলায় বাহক হই
সামাজিক দায়বদ্ধতার।

 

 

জামালউদ্দিন বারী
কালান্তর

কালান্তরের হিসাব বুঝিনি
পাটিগণিতের অংকে শিখিনি
মহাকালের ধারাপাত।
জীবনের ধ্রæব চেতনা
সভ্যতার ক্যানভাসের অমলিন চিত্রকল্প নয়
প্রাগৈতিহাসিক ফসিল এবং
আধুনিক মানুষের মগজে
নিউক্লিক তথ্যকোষে শুধুই আকালের ইতিহাস।
একাকী মানুষ
একেকজন ধ্যানমগ্ন সাধক যেন
চেতনার দেয়াল পেরিয়ে
সমর্পিত অবিনশ্বর আত্মার ক্রন্দনে।
বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা
পিছিয়ে পড়া মানুষের সম্মিলিত অভিযাত্রায়
স্বপ্ন ও ভাঙ্গনের সংগ্রাম
কোনোদিন থেমে যায়নি।
পুরনো মশালে শুধু জ্বেলে রাখা চিরায়ত আগুন।

 

আলী এরশাদ
মূল্যায়ন

মাটিকে শাসন করে পরাক্রম রাজার মতন
মাটির গভীর থেকে তুলে আনে বাঁচার রসদ।
কাকডাকা ভোরে ওঠে ডুব দেয় কাজের ভেতর
গায়ে মেখে ধূলিকণা ঘরে তুলে সোনার ফসল।
চাহিদার ঢালা হাতে কৃষক করে না হা হুতাশ
রোদে পুড়ে জলে ভিজে সকলের খাবার জোগায়।
অথচ তারাই আজ উপবাসে প্রহর কাটায়
ফসল কাটার পর বেচে সব ঋণের জ্বালায়।
যাদের নখের নিচে ধূলিকণা লাগে না ভুলেও
কৃষককে শোষে খেয়ে তারা আছে রাজার মতন।

ফসল ফলিয়ে যদি ঋণ বাড়ে বছর বছর
কৃষক কী প্রয়োজনে মাঠে গিয়ে দিবে তার শ্রম?
কাটা হয়ে বিধে যদি ঘামে শ্রমে ফলানো ফসল
কৃষক কী জন্য তবে হাতে নিবে লাঙল কোদাল?
কৃষিকাজ ছুড়ে ফেলে যোগ দিবে নতুন পেশায়
বিনালাভে এ জগতে কে আছে তুলার বোঝা বয়?
কৃষক বিমুখ হলে হবে না মোটেও সুখকর
জেনে রেখো প্রসাধনী পোশাক ফ্যাশন আগে নয়।
সকলের ঊর্ধ্বে হোক অচতুর কৃষকের স্থান
কৃষকেরা কর্মগুণে মৃত্তিকার প্রকৃত সন্তান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন