Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার ২০ জুলাই ২০১৯, ০৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ ও বাংলার মুসলমান

মে স বা হু ল হ ক । | প্রকাশের সময় : ২৭ জুন, ২০১৯, ১২:৩৭ এএম

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপন পৃথিবীর ইতিহাসে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা বটে, কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়। পলাশীর রণক্ষেত্রে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইংরেজ শক্তির জয়লাভের রাজনৈতিক তাৎপর্য যতই গভীর হোক না কেন, একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে তা ছিল অতিতুচ্ছ ব্যাপার। ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন শক্তির ঘাতপ্রতিঘাত এবং মোগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগে সুবেদার, নবাব, আমীর, ওমরাদের সংঘর্ষ এবং মুর্শিদকুলি খানের আমল থেকে যে সমস্ত হিন্দু প্রভাবশালী ব্যক্তি নবাবের পৃষ্ঠপোষকতায় দরবারে বিশেষ ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল, তাদের মুসলিম শাসন ক্ষমতা উৎখাত করার ষড়যন্ত্র ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে এই জয়ের ক্ষেত্র প‚র্ব হতেই প্রস্তুত হয়েছিল।
ইংরেজ বণিকরাজ ভারতের সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধিশালী দুটি প্রদেশ বাংলা ও বিহারের ক্ষমতা অধিকার করল বটে, কিন্তু প্রথমেই দেশের সর্বত্র সর্বময় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় সাহসী হল না, তাদের ভয় ছিল দেশের আপামর জনসাধারণ ষড়যন্ত্রকারী বিদেশীদের শাসন সহজে মেনে নিবে না। তাই তারা প্রথমে সাক্ষীগোপাল নবাব মীরজাফরকে সামনে রেখে পেছনে থেকে দেশের বুকে চালাতে থাকে তাদের অমানুষিক শাসন ও শােষণ। রাজস্ব আদায়ের সর্বময় ক্ষমতা রাখলো সম্প‚র্ণভাবে নিজেদের হাতে। প্রকৃত ‘নবাব’ হয়ে থাকল পলাশী যুদ্ধের নায়ক অথর্লোভী রবার্ট ক্লাইভ।
ক্ষমতা লাভের প্রথম থেকেই এই ‘শ্বেত নবাব’ দেশীয় কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারীদের সহায়তায় বাংলা-বিহারের বুক যে লুণ্ঠন প্রক্রিয়া গ্রহণ করে, পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা অতি বিরল। পলাশী যুদ্ধ জয়ের পুরস্কার ও নবাবী লাভের ইনাম স্বরূপ মীরজাফরের নিকট হতে আদায়কৃত ৩২ লক্ষ ৩৪ হাজার পাউন্ড ছাড়াও ১৭৫৭ সাল থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানির কর্মচারীরা বাংলা ও বিহার থেকে উৎকোচ গ্রহণ করেছিল মোট ৬০ লক্ষ পাউন্ড। তাদের এসব লুণ্ঠনের অংশীদার ছিল দেশীয় গোমস্তা, বেনিয়ান, জমিদার ও মহাজন। বলাবাহুল্য, প্রকৃতপক্ষে এদের সবাই ছিল মুসলিম শাসন ক্ষমতা উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হিন্দু জমিদার, মহাজন ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পালিত ব্যক্তি।
ইংরেজ রাজত্বের স্বল্পকালের মধ্যে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে নেমে এলো এক ভয়াবহ দুর্দিন। কোম্পানির শাসন-চক্রের আবর্তে পড়ে মুসলমানরা হারাল তাদের রাজকীয় সম্মান, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আর সামাজিক জীবনের স্বস্তি। যে জাতি মহা গৌরবের সাথে সাড়ে পাঁচশ’ বছর এদেশ শাসন করেছে, সহসা সে জাতির ভাগ্যাকাশে নেমে এলো অচিন্তনীয় দারিদ্র্য আর অজ্ঞতার অন্ধকার।
নবাবী লাভের পর পরই কোম্পানির নির্দেশে মীরজাফর, ৮০ হাজার দেশীয় সৈন্য অপ্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করলেন এবং তাদের সরাসরিভাবে বরখাস্ত করা হল। শুধু আনুষ্ঠানিক ত্রিয়া-কর্ম চালাবার উদ্দেশ্যে সামান্য সংখ্যক সৈন্য রাখা হলো। সর্বশেষ ওয়ারেন হেস্টিংস যখন দ্বৈত শাসন বাতিল করে প্রকাশ্যভাবে দেশের সর্বময় শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করল, তখন সেই সামান্য সংখ্যক সৈন্যও বাতিল বলে ঘোষণা করা হল। ফলে এক বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনসংখ্যা বেকার হয়ে পড়ল। এছাড়া সামরিক সংস্থার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত আরও হাজার হাজার মুসলিম কর্মচারী তাদের চাকরি হারাল। মুসলিম শাসন আমলে রাজস্ব আদায় ছিল সরকারী আয়ের প্রধান উৎস। রাজস্ব আদায়কারী হিন্দু কর্মচারী ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগে সাত শত মুসলমান কর্মচারী ছিল। তারাও চাকরি হারাল। সুবার দেওয়ান অফিস ছিল বিরাট এক প্রতিষ্ঠান। তাতে কর্মরত ছিল হাজার হাজার মুসলমান কর্মচারী। ১৭৬৫ সালে কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর কয়েক বছর পর্যন্ত এসব কর্মচারী নিজ নিজ পদে বহাল ছিল। এক সময় হঠাৎ এ সমস্ত কর্মচারীও তাদের চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ল।
মুর্শিদকুলি খানের আমলে বাংলাদেশকে ১৩টি চাকলা, ১৬৬০টি মহলে বিভক্ত করা হয়েছিল। প্রত্যেক মহলকে বলা হল পরগণা। প্রতিটি পরগণায় একটি করে রাজস্ব অফিস ছিল। আমিল, আমিন, কারকুন, খাজাঞ্ঝী, কানুনগো প্রভৃতি বিভিন্ন পদে বহাল ছিল হাজার হাজার মুসলমান কর্মচারী। তারাও চাকরি হারিয়ে বেকার হল।
মুর্শিদাবাদ নিজামত ছাড়াও জাহাঙ্গীর নগর, আজিমাবাদ ও কটাক নায়েব নিজামত অফিস ও চাকলার ফৌজদারের অধীনে কর্মরত ছিল কয়েক হাজার মুসলমান কর্মচারী। কোম্পানির শাসন চক্রান্তে এসব হতভাগ্য মুসলমানরা চাকরি হারিয়ে বেকার জীবন-যাপন করতে লাগল। সারা দেশের বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানসম‚হে কাজী, মুফতি, মীর আদল হিসেবে কর্মরত ছিল কয়েক হাজার হতভাগ্য মুসলমান কর্মচারী। কোম্পানির শাসনের প্রাথমিক অবস্থায় শাসন বিভাগে মুসলিম আইন-কানুন চালু থাকায় বিচার বিভাগীয় সর্বস্তরে মুসলমানদের বেশ একটা প্রভাব ছিল। মোটকথা যতদিন ফার্সী সরকারি ভাষা রূপে পরিগণিত ছিল ততদিন বিচার বিভাগ ছাড়া অন্যান্য বিভাগেও মুসলমানদের চাকরির হার সন্তোষজনক ছিল।
মুসলমানদের ন্যায় হিন্দুদেরও ইংরেজ পদানত হতে হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হিন্দুরা সন্তুষ্টচিত্তে ইংরেজ শাসন ও অধীনতা মেনে নিয়েছিল। কারণ তাদের কাছে এ পরিবর্তনে লোকসানের কোন প্রশ্নই ছিল না। মুসলিমদের অবসান তারা আন্তরিকভাবে কামনা করে আসছিল। এভাবেই এক শ্রেণীর মানুষবিদ্বেষী হিন্দুদের বিশ্বাসঘাতকতা ও সহযোহিতা গুণেই একটা বিদেশী কোম্পানি সহজে এদেশে রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল।
ইংরেজ প্রভুরাও তাই কৃতজ্ঞতাবশত এদেশে তাদের শাসন বিস্তারে সর্বক্ষেত্রে হিন্দুদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। ১৮১৩ সালে স্যার জন ম্যালকথ সিলেক্ট কমিটির সামনে এক বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “ভারতে হিন্দুদের সহযোগিতাই ইংরেজ নিরাপত্তার প্রধান সহায়।”
অন্যদিকে মুসলমানরা রাজ্য হারাবার সাথে সাথে সমাজের সর্বস্তরে আধিপত্য হারাবার দুঃখ কিছুতেই ভুলতে পারলো না। ইংরেজরাও বুঝলো যে, মুসলমানরা কিছুতেই এ দুঃখ ভুলবে না। সুযোগ পেলেই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হবে। তাই তারা সর্বকাজে সর্বক্ষেত্রে মুসলমানদের অবিশ্বাস করতে লাগল। মুসলমানদের সর্বক্ষেত্রে দাবিয়ে রাখার নীতি গ্রহণ করলো।
১৮৩৭ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক হঠাৎ এক আদেশ জারি করলেন যে, এখন থেকে ফার্সীর পরিবর্তে ইংরেজি হবে সরকারি ভাষা। অফিস-আদালতের কাজ চলবে ইংরেজি অথবা দেশীয় ভাষা বাংলায়। হঠাৎ এ পরিবর্তনে মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে পড়ল। এ পর্যন্ত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সামান্যতম সুযোগ-সুবিধা যতখানি ছিল-এবার তাও হাতছাড়া হল। অফিস-আদালতে মুসলমানদের পরিবর্তে হিন্দু কর্মচারী নিযুক্ত হতে লাগল। কারণ হিন্দুরা প‚র্ব থেকেই ইংরেজ শাসকদের সুনজরে ছিল এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে সচেষ্ট ছিল। মুসলমানরা ছিল ইংরেজি শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে। বাংলা স্কুলগুলোতে হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষার আধিপত্য থাকায় মুসলমানরা কিছুতেই বাংলা স্কুলে শিক্ষা গ্রহণেও অগ্রসর হয়নি।
১৮৬৪ সাল পর্যন্ত সরকারি নির্দেশ ছিল ওকালতি অথবা মুন্সেফগিরির জন্যে ইংরেজি অথবা উর্দু ভাষাই যথেষ্ট। কিন্তু হঠাৎ সরকারি নির্দেশ পরিবর্তিত হল। নতুন নির্দেশ জারি হল, উচ্চ পর্যায়ের ওকালতি অথবা মুন্সেফগিরি পরীক্ষার মাধ্যম হবে একমাত্র ইংরেজি। আইন ব্যবসায়ে মুসলমানদের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, সেখানেও হঠাৎ মার খেল তারা।
সরকারি চাকরি পাওয়ার সব দরজাই বন্ধ হয়ে গেল মুসলমানদের জন্য। মুসলমানদের মধ্যে যারা ইংরেজি শিখে যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করল-তারাও সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট বাধার সম্মুখীন হল। মুসলমান প্রার্থীর সর্ববিধ যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও হিন্দু কর্মচারী নিযুক্ত করা হত। সময় সময় চাকরির বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ থাকত যে, শুধু হিন্দু প্রার্থীদের আবেদন গ্রহণযোগ্য। ‘দ‚রবীন’ নামক কলকাতার একটা ফার্সী পত্রিকা ১৮৬৯ সালের জুলাই মাসে চাকরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের দুরবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলÑ “উচ্চস্তরের বা নিম্নস্তরের সমস্ত চাকরি ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্যান্য স¤প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে হিন্দুদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সরকার সকল শ্রেণীর কর্মচারীকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য, তথাপি এমন সময় এসেছে যখন মুসলমানদের নাম আর সরকারি চাকুরিয়াদের তালিকায় প্রকাশিত হচ্ছে না, কেবল তারাই চাকরির জায়গায় অপাংক্তেয় সাব্যস্ত হয়েছে। স¤প্রতি সুন্দরবন কমিশনার অফিসে কতিপয় চাকুরিতে লোক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, কিন্তু অফিসারটি সরকারি গেজেটে কর্মখালির যে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয় যে, “শূন্য পদগুলিতে কেবল হিন্দুদের নিয়োগ করা হবে।”
মুসলমানদের এমনি দুরবস্থা দেখা দিল যে, কলিকাতায় কদাচিৎ এমন কোন সরকারি অফিস চোখে পড়ত, যেখানে চাপরাশি ও পিয়ন শ্রেণীর উপরিস্তরে একজন মুসলমান কর্মচারী বহাল আছে। অফিস আদালত ও পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কেবল হিন্দু যুবকদের নিযুক্ত করার নির্দেশ ছিল। ১৮৫২ সালের এক হিসেবে দেখা যায় ২৪০ জন সরকারি কর্মচারীর মধ্যে ২৩৯ জনই হিন্দু। একজন ছিল মাত্র মুসলমান। ১৮৭১ সালে হান্টার সাহেব প্রদত্ত আরেক হিসাবে দেখা যায়, সরকারি গেজেটেড পদগুলির মধ্যে ৬৮১টি ছিল হিন্দু। মুসলমান মাত্র ৯২টি।
শৌর্যবীর্য ও বীরত্বে যে জাতি এক সময় সারা পৃথিবীজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, হঠাৎ তাদের এ দুরবস্থার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে হান্টার সাহেব বলেছেন, “হিন্দুরা নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট মেধার অধিকারী কিন্তু সরকারি কর্মক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করার জন্যে যে রকমের সার্বজনীন ও অন্যান্য মেধা থাকা দরকার, বর্তমানে তা তাদের নেই এবং তাদের অতীত ইতিহাসও একথার পরিপন্থী; বাস্তব স্যু হলো এই যে, এদেশের শাসন কর্তৃত্ব যখন আমাদের হাতে আসে তখন মুসলমানরাই ছিল উচ্চতর জাতি; এবং শুধু মনোবল ও বাহুবলের বেলাতেই উচ্চতর নয়, এমনকি রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা এবং সরকার পরিচালনায় বাস্তব জ্ঞানের দিক। থেকেও তারা ছিল উন্নততর জাতি। এ সত্তে¡ও মুসলমানদের জন্যে এখন সরকারি চাকরি এবং বেসরকারি কর্মক্ষেত্র এই উভয় ক্ষেত্রেই প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।”
শুধু চাকরি নয়Ñ শিক্ষা ও ব্যবসায়ক্ষেত্রেও মুসলমানদের অবস্থা ছিল দুর্ভাগ্যজনকভাবে সঙ্কটময়। ইংরেজ শাসনের প্রারম্ভ থেকেই ইংরেজি শিক্ষাকে মুসলমানরা তাদের স্বার্থ ও সামাজিক ঐতিহ্যের পরিপন্থীরূপে গণ্য করে আসছে। দেশী স্কুলগুলোতে যে ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো- তাতে পুরোপুরিভাবে হিন্দু দেব-দেবী ও হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির আধিপত্য ছিল। কারণ শিক্ষকরা সবই ছিল হিন্দু। কাজেই সংগত কারণে মুসলমানরা পৌত্তলিক শিক্ষকের তত্ত¡াবধানে পৌত্তলিক ভাবধারায় প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, যার ফলে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থাকল।
মুসলমানদের এই পিছিয়ে থাকার সুযোগে হিন্দুরা সহজ গতিতে এগিয়ে চলতে দ্বিধাবোধ করলো না। কারণ মুসলমান আমলে সরকারি ভাষা এবং ইংরেজ আমলের সরকারি ভাষা উভয়ই হিন্দুদের কাছে বিদেশী ভাষা। তাদের কাছে উভয় ভাষার মর্যাদাই সমান। জীবনে সাফল্য লাভের জন্য যেমন তারা এক সময় ফার্সী ভাষা শিখতে কার্পণ্য। করেনি তেমনি ইংরেজি ভাষাও তাদের কাছে অনাদৃত হয়নি। মুসলমান আমলে হিন্দুরা যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার সুযোগ পেয়েছে, তা ফার্সী ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা রপ্ত করার বদৌলতেই সম্ভব হয়েছে।
দ‚রদর্শী হলে মুসলমানরা পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়ে তুলতে পারতো। মুসলমানরা তা পারেনি- তার প্রধান কারণ ইংরেজদের ক্রটিপ‚র্ণ শিক্ষাব্যবস্থা। হিন্দুদের তত্ত¡াবধানে হিন্দু শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা না করেনি সরেজ শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হতো এবং রাষ্ট্রীয় কাজে শুধু যদি ইংরেজি ভাষা চালু রাখা হতো, তাহলেও ধর্মীয় কারণে শিক্ষা গ্রহণে মুসলমানদের যে সমস্ত অসুবিধা ছিল তা বহুলাংশে লাঘব হতো।
ভারতে মুসলমান আমলে প্রচলিত শিক্ষা-পদ্ধতি ছিল উৎকৃষ্টতর। এমন এক ব্যবস্থা চালু ছিল যার ফলে প্রতিটি মানুষ কিছু না কিছু শিক্ষা গ্রহণে সমর্থ হতো। মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে হান্টার সাহেব বলেছেন, “বাংলার প্রত্যেকটি সুঘ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এমন একটা পৃথক তহবিলের ব্যবস্থা ছিল, যার ফলে ঐ পরিবারের ছেলেরা ছাড়াও আশপাশে গরিব ঘরের ছেলেরাও বিনা খরচায় লেখাপড়া শিখতে পারত।”
মুসলমান আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসম‚হের জন্যে নিষ্কর জমির ব্যবস্থা ছিল। এই জমির আয়ের উপর নির্ভর করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে ছিল। ইংরেজ আমলে ঐ সমস্ত নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করার ফলে মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থা ধবসে পড়ল। শত শত প্রাচীন পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল।
অপরদিকে হিন্দু সম্পদশালী ব্যক্তি ও খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রচেষ্টায় কলকাতা এবং তার আশপাশে হিন্দুদের জন্যে বহু স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হল। সেসব স্কুল-কলেজে খুবই নগণ্য সংখ্যক মুসলমান ছাত্র শিক্ষার সুযোগ গ্রহণে সমর্থ হল । শুধু হিন্দু ছাত্রদের শিক্ষার জন্য স্থাপিত হল কলিকাতায় হিন্দু কলেজ। অথচ মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কোথাও কোন ব্যবস্থা গৃহীত হল না; উত্থাপিত হল না কোন প্রস্তাব। অবশ্য ইংরেজরা তাদের বিভেদ নীতিকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলার জন্যে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করল বটে, কিন্তু তাতে শিক্ষার কোন প্রকার সুব্যবস্থাই থাকলাে না। হিন্দুদের পরিপোষণ করার যে নীতি ইংরেজ শাসকগণ গ্রহণ করেছিল, তারই ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু জাগরণ সম্ভব হয়েছিল। আর মুসলমানরা উপনীত হল দুর্দশার শেষ সীমায়।
অভাব অনটন, কুশিক্ষা, রোগ ও মহামারীর কবলে পড়ে বাংলার মুসলমান এক চরম দুরবস্থার সম্মুখীন হল। মুসলমানদের দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে হান্টার সাহেব বলেছিলেন, “একশ’ সত্তর বছর আগে বাংলার কোন সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারের দরিদ্র হওয়া ছিল এক অসম্ভব ব্যাপার, আর বর্তমানে তাদের পক্ষে ধনী হওয়াই অসম্ভব ব্যাপার।” ব্যবসায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবস্থা আরও করুণ। ইংরেজদের কুটিল চক্রান্তের আবর্তে পড়ে এদেশে যাবতীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে গেল। ব্যবসায়-বাণিজ্য বলতে কিছুই থাকলো না মুসলমানদের হাতে।
প‚র্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে, মুর্শিদকুলি খানের কাল থেকেই হিন্দুরা মুসলিম শাসন উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ইংরেজ ব্যবসায় সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল অতি নিবিড়। ১৭৩৬ সাল থেকে ১৭৪০ সালের মধ্যে কোম্পানি কলিকাতায় ৫২ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী নিয়োগ করেছিল। তাদের সবাই ছিল হিন্দু। ১৭৩৯ সালে কাশিমবাজারে কোম্পানী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠিত করে। তাদেরও সবাই ছিল হিন্দু। কেবল ঢাকায় নিযুক্ত। ব্যবসায়ীর মধ্যে ২ জন ছিল মুসলমান।
ইংরেজ ব্যবসাযয়-বাণিজ্যের সংগে যুক্ত থেকে আরও এক শ্রেণীর হিন্দু লাভবান হল, তারা । হাজন ও ব্যাংকার। ১৭১২ সালের দিকে কোম্পানির যারা ব্যাংকার ছিল, তারা সবাই হিন্দু। কলিকাতার বাইরে বিভিন্ন ব্যবসায় কেন্দ্রে এক শ্রেণীর মহাজন পোদ্দার বেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বলাবাহুল্য এদের সবাই ছিল হিন্দু। মোটকথা ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবস্থা ছিল আরো শােচনীয়।
মতাবস্থায় সৈনিক, আমীর ওমরাহ, কাযী-মুফতি, উকিল-মোক্তার, কেরানী-চাপরাশি-সর্বশ্রেণীর লাখ লাখ লোক বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ধাওয়া করল গ্রামের দিকে উদ্দেশ্য কৃষিকে আঁকড়ে ধরে কোনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করা। কিন্তু গ্রামের অবস্থা তখন আরও ভয়াবহ। শাসন ক্ষমতা হস্তগণ করার সাথে সাথে ইংরেজ বণিকরা বাংলার প্রাচীন গ্রাম-সমাজের ভিত্তি ভেঙে চুরমার করেছিল। এ কাজে তারা প্রধানত দু›টি অস্ত্র ব্যবহার করল-ভ‚মি রাজস্বের নতুন ব্যবস্থা ও ভ‚মি রাজস্ব হিসেবে ফসল বা দ্রব্যের পরিবর্তে মুদ্রার প্রচলন। এই দুই অস্ত্রের প্রচÐ ধ্বংসকারী শক্তির আঘাতে স্বল্পকালের মধ্যে প্রাচীন গ্রাম-সমাজের ভিত্তি ধ‚লিসাৎ হয়ে গেল। শ্মশানে পরিণত হল বাংলার গ্রাম।
ইংরেজ শাসনের প‚র্ব পর্যন্ত শাসকগণ রাজস্ব আদায় করত গ্রাম-সমাজের নিকট হতে, কোন ব্যক্তি বিশেষের নিকট থেকে নয়। কৃষক রাজস্ব দিত তার উৎপাদিত ফসল দিয়ে। ইংরেজ বেনিয়া কোম্পানির শাসকগণ গ্রাম-সমাজের নিকট থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রথা লোপ করে কৃষকগণের নিকট ব্যক্তিগণভাবে রাজস্ব আদায়ের প্রথা প্রচলন করল। দ্বিতীয়ত মুদ্রাই হল তাদের রাজস্বের একমাত্র গ্রহণযোগ্য রূপ। এভাবে সর্বপ্রথম রাজস্ব হিসেবে ফসল গ্রহণের পরিবর্তে মুদ্রার প্রচলন আরম্ভ হল। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই ইংরেজ শাসকগণ ব্যক্তিগণ মালিকানার পথ প্রস্তুত করল। সর্বপ্রথম তারা মোগল আমলের কিছুসংখ্যক জমিদার ও রাজস্ব আদায়কারী গোমস্তাদের জমির মালিক বলে ঘোষণা করল। যেখানে জমিদার বা গোমস্তা থাকলো না সেখানে জমির মালিকরূপে ঘোষিত হল গ্রাম-সমাজের প্রধান বা অর্থবান ব্যক্তি। পরবর্তীকালে এরাই জমিদার রূপে পরিগণিত হল। তাদের প্রধান কাজ হল-কৃষকের নিকট হতে যত ইচ্ছা খাজনা আদায় করা এবং তা থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রাজস্ব হিসেবে ইংরেজ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। সাথে সাথে, এসব জমিদারের ইচ্ছামত জমি বিক্রয়, নতুনভাবে জমি বণ্টন ও বন্ধক রাখার ক্ষমতাও দেওয়া হল। জমিদারগণ জমির বিলি-ব্যবস্থার মারফত সৃষ্টি করল তাদের সমর্থক গাতিদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদার, তালুকদার নামক উপস্বত্বভােগী। উৎপীড়কের ভ‚মিকা নিয়ে এসব শোষকরূপী পরগাছা চেপে বসল চাষিদের কাঁধের উপর। সবার উপরে থাকল স্বৈরাচারী ইংরেজ বণিকরাজ।
বহুমুখী শোষণ-উৎপীড়নের চাপে পড়ে বাংলার অসহায় কৃষক সমাজ সর্বস্বান্ত হয়ে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়াল।
বাংলার কৃষক মানেই মুসলমান, আর জমিদার এবং বিত্তবান ব্যক্তি মানেই হিন্দু-এ স্যু সর্বজনবিদিত। মুর্শিদকুলি খানের আমল থেকেই এদেশের রাজস্ব আদায়কারী গোমস্তাদের অধিকাংশ ছিল হিন্দু। ইংরেজ সরকার যে সমস্ত গোমস্তাদের জমিদাররূপে অভিহিত করলেন তাদের অধিকাংশ ছিল হিন্দু। এছাড়া ক্ষমতা হারিয়ে, চাকরি খুইয়ে মুসলমানরা যখন. দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে হতাশাগ্রস্ত, হিন্দুরা তখন ইংরেজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বস্তরে ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী। হিন্দু দেওয়ান, গোমস্তা, বেনিয়ান, মুনশী, মুৎসুদ্দিরা কোম্পানি সরকারের কৃপায় নব্য ব্যবসায়ী রূপে পরিগণিত। তাদের আয়ত্তে প্রচুর অর্থ। কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বদৌলতে জমির মালিকরূপে পরিগণিত হল তারাই। শুধু অর্থ গুণে দেব, মিত্র, বসাক, সিংহ, মোঠ, মল্লিক, শীল এমনকি, তিলি আর সাহারাও রাতারাতি জমিদাররূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো। পুরনো জমিদারদের অনেকেই নানা কারণে জমিদারী বিক্রি করেছিল এবং তা কিনে নিল এসব অর্থবান ব্যবসায়ীরা। এছাড়া মুসলমানদের লাখেরাজ, জায়েদাদ দখল করার জন্য। হিন্দু-ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বৈদ্যেরা পাদ্রীদের সহায়তায় এক ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুললো। এর ফলে হঠাৎ একদিন কোম্পানি সরকার এক ঘোষণা জারি করলেন যে, লাখেরাজ সম্পত্তির দলিল-দস্তাবেজ ও সনদ পাঞ্জা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি সরকারের নিকট দাখিল করতে হবে। তা না হলে লাখেরাজ সম্পত্তি কোম্পানি সরকারের বাজেয়াপ্ত হবে। মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই দলীল-দস্তাবেজ সময়মত দাখিল করতে পারলো না। জমি বাজেয়াপ্ত হল। পরে তা কিনে নিল সেসব হিন্দু ধনবান ব্যক্তি।
কাজেই সংগণ কারণেই বাংলার অধিকাংশ জমিদার হিন্দু আর চাষি মানে দরিদ্র মুসলমান। নব্য জমিদারদের খাজনা ও বহুবিধ করের চাপে পড়ে এবং জমিদারের নায়েব-গোমস্তাদের রোষে পড়ে চাষি হল ভিটে ছাড়া। সরকার, জমিদার ও ইজারাদারদের মধ্যে জমির অধিকার হস্তান্তরই চাষিদের দুর্দশার অন্যতম কারণ। জমিদার তার অধিকার স্থায়ীভাবে ইজারা দেয়, ইজারাদার আবার অনুরূপভাবে ইজারা দেয় তার অধিকার। এভাবে খাজনা গ্রাহক ও খাজনা দাতাদের মধ্যে যে সুদীর্ঘ শৃঙ্খলের সৃষ্টি, সেই শৃঙ্খলে আবদ্ধ চাষি শোষণ-নির্যাতনে হল সর্বস্বান্ত।
একদিকে জমিদার-মহাজনের শোষণ-পীড়ন আর অমানুষিক অত্যাচার, অপরদিকে কুশিক্ষা, অভাব-অনটন, রোগ-মহামারী সবকিছু মিলিয়ে চাষিরা এমন এক করুণ ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হল-যার পরিণতি অনিবার্য ধ্বংস।
চাষিদের যখন এমন এক সংকটময় অবস্থা, তখনই নেমে এল দেশজুড়ে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ বাংলা ১১৭৬ সালে সংঘটিত হয়েছিল, তাই ইতিহাসে এই দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে খ্যাত। কোম্পানি সরকার ফসলের পরিবর্তে মুদ্রায় খাজনা আদায়ের রীতি প্রচলন করল। খাজনা দেওয়ার জন্য চাষিকে বিক্রি করতে হত ফসল। বাংলার চাষির ফসল মানেই খাদ্য-ফসল, সেই খাদ্য-ফসল বিক্রয় করেই চাষিকে জোগাড় করতে হত খাজনার টাকা। ইংরেজ বণিকরা এতে মুনাফা লুণ্ঠনের আরেকটা নতুন পথ খুঁজে পেল। তারা বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে খুলে বসল ধান-চালের একচেটিয়া ব্যবসায় কেন্দ্র। এই ব্যবসায় মানেই বাংলার কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। চাষিরা খাজনা আদায়ের জন্য অভাবের তাড়ানায় তাদের খাদ্য-ফসল বিক্রয় করত, আর তা কিনে গুদামজাত করত ইংরেজ ব্যবসায়ীরা। পরে সময় ও সুযোগ মত তা বিক্রয় করত সেই চাষিদের কাছে। চাষিরা মহাজনের কাছে নিজেদের ঘটি-বাটি বিক্রয় করে জমিজমা বন্ধক রেখে ফসল কিনত।
এই ব্যবসায় প্রচুর মুনাফা। ইংরেজ ব্যবসায়ীদের লাভ আরও বেড়ে গেল। ১৭৬৯ সালে ফসল উঠার সাথে সাথে ফসল কিনে গুদামজাত করে রাখল তারা এবং ১৭৭০ সালে তা চড়া দামে বিক্রয় করতে আরম্ভ করল। কিন্তু খাজনা আর নানাবিধ করের চাপে পড়া সর্বস্বান্ত চাষির পক্ষে তা ক্রয় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। মহাজনের কাছে ঘটি-বাটি বিক্রয় করল, জমি বন্ধক রাখল; তবুও বছরের খােরাক জোগাড় করা সম্ভব হল না। ঘরে ঘরে হাহাকার উঠল। দেশের বুকে নেমে এল এক মহাদুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। মৃত্যুর শিকারে পরিণত হল কোটি কোটি মানুষ।
কোম্পানি সরকারের চাকরি নীতি, শিক্ষা নীতি এবং বিভেদ নীতির ফলেই মুসলিম জনসাধারণ এক চরম দুর্দশা ও দারিদ্র্যের কবলে পড়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিল। তদুপরি এ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। পল্লী বাংলার শতকরা ৯৫ জনই কৃষিজীবী। তন্মধ্যে অধিকাংশই হতভাগ্য মুসলমান। দুর্ভিক্ষের কবলে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকলো না। হান্টার তার অহহধষং ড়ভ জঁৎধষ ইবহমধষ গ্রন্থে দুর্ভিক্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “১৭৭০ সালের সারা গ্রীষ্মকাল ব্যাপী লােক মারা গিয়েছে কৃষকেরা তাদের গরু-বাছুর, লাংগল-জোয়াল বিক্রি করে ফেলেছে এবং বীজধান খেয়ে ফেলেছে। অবশেষে তারা ছেলে-মেয়ে বেচতে শুরু করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক সময় আর ক্রেতাও পাওয়া গেল না। তারপর তারা গাছের পাতা আর ঘাস খেতে শুরু করল। ১৭৭০ সালের জুন মাসে কোম্পানির রেসিডেন্ট স্বীকার করেন যে, জীবিত মানুষ মরা মানুষের গোস্ত খেতে শুরু করে। অনশনে শীর্ণ, রোগক্লিষ্ট কঙ্কালসার মানুষ দিনরাত সারি বেঁধে বড় বড় শহরে জমা হতো। বছরের গোড়াতেই সংক্রামক রোগ শুরু হয়েছিল। মার্চ মাসে মুর্শিদাবাদে পানি বসন্ত দেখা দেয় এবং বহুলোক এ রোগে মারা যায়। মৃত ওমরণাপন্ন । রোগী স্তূপাকার হয়ে পড়ে থাকায় রাস্তা-ঘাটে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। লাশের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, তা পুঁতে ফেলার কাজও দ্রæত সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না। প্রাচ্যের মেথর, শিয়াল ও শকুনের পক্ষেও এত লাশ নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব ছিল না।”
সমসাময়িক কালের বিখ্যাত ইতিহাস “সিয়ারে মুতাখখারীন”-এর রচয়িতা ইংরেজ দস্যু ও তার দেশীয় দালালদের শোষণ-উৎপীড়ন ও তাদেরই সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে কোটি কোটি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর মৃত্যু যন্ত্রণায় আকুল হয়ে লিখেছিলেন, “হে খোদা, তোমার দুর্দশাগ্রস্ত বান্দাদের সাহায্যের জন্য একটিবার তুমি ধরা পৃষ্ঠে নেমে আস। এই অসহনীয় উৎপীড়ন আর দুর্দশা হতে তাদের রক্ষা কর।”
বণিকরাজ সৃষ্ট ভয়াবহ এই দুর্ভিক্ষ শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র মানব জাতির ইতিহাস কলঙ্কিত করে রাখবে। ইতিহাস যতদিন থাকবে, মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির স্পর্শ যতদিন থাকবে, ততদিন মানুষ দুঃস্বপ্নের মত স্মরণ করবে বাংলার এ ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষের তাÐবলীলার কথা।
এভাবে ইংরেজ শাসকগণ ও তাদের তাঁবেদার জমিদার-মহাজন পরিবেষ্টিত দুষ্টচক্র হতভাগ্য মুসলমান কৃষক জনসাধারণকে অমানুষিক শশাষণ যন্ত্রণায় তিলে তিলে মারতে থাকে। মার খেতে খেতে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকলো, তখন তারা দেখলো- এখন তাদের সামনে দুটি পথ রয়েছে। শোষণ-পীড়ন আর অত্যাচার-অনাচারকে মেনে নিয়ে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া, নতুবা বিদ্রোহ- বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারের উচ্ছেদ সাধন। হতভাগ্য কৃষক জনসারণ শেষ পর্যন্ত নিরূপায় হয়ে গ্রহণ করলো বিদ্রোহ-বিপ্লবের পথ। দেশের প্রতি কোণায় কোণায় জ্বলে উঠলো বিদ্রোহের লেলিহান শিখা। সংগঠিত হল অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ।
হিন্দু মধ্যশ্রেণী যখন ইংরেজ শাসনের সাথে প‚র্ণ মাত্রায় সহযোগিতা দিয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য, ভ‚মি-ব্যবস্থা, শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার সকল ক্ষেত্রে সুবিধাজনক আসন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যস্ত, কৃষক জনসাধারণসহ সকল শ্রেণীর মুসলমান তখন ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম করে ভারতের বুক থেকে ইংরেজ শাসনের ম‚লোচ্ছেদ করার চেষ্টায় বদ্ধপরিকর। সগ্রামের ভয়াবহতা দেখে ভারতের রাজ প্রতিনিধি এক সময় সখেদে বলেছিলেন, “মহারাণীর শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাই কি মুসলমান ধর্মের একমাত্র অনুশাসন?”
ইংরেজ বণিকরাজ এবং তাদের তাঁবেদার জমিদার-মহাজনের অমানুষিক শাসন-শোষণ ও অত্যাচার-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রথম কৃষক বিদ্রোহফকীর-সন্নাসী বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ আরম্ভ হয় ১৭৬৩ সালে।
‘মাদারী’ ও ‘বোরহানা’ স¤প্রদায়ভুক্ত ফকীরগণ বাংলা, বিহার ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে দল বেঁধে বাস করতো। দেশের নানাস্থানে পতিত জমি বা খাস জমি দখল করে কিংবা মোগল শাসকদের নিকট হতে দান হিসেবে প্রাপ্ত জমিতে চাষাবাদ করে এরা স্থায়ীভাবে বসবাস করতো। আবার বিভিন্ন সময়ে দেশের নানাস্থানে ঘুরে বেড়াতো। কালক্রমে এদেরই একাংশ কৃষকে পরিণত হয়।
১৬৫৯ সালে শাহযাদা সুজা বাংলাদেশের ফকীরদের জন্য এক সনদ জারি করেন। তাতে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল ফকির-সন্ন্যাসীরা বাংলা-বিহার-উড়িষার পতিত জমি, মালিকবিহীন বা করমুক্ত জমি-জমা নিজেদের খুশিমত ভোগদখল করতে পারবে। তারা দেশের যে কোন স্থানে ভ্রমণ করুক না কেন, দেশের জমিদার বা প্রজারা তাদের খাদ্য বস্তু বা রসদ সরবরাহ করবে, কোন প্রকার টাকা বা কর তাদের উপর ধার্য থাকবে না।
যে ফকীর-সন্ন্যাসীরা বিনা খাজনায় জমি-জমা ভোগ দখল করে আসছিল এবং সর্বত্র যাদের অবাধ গতিবিধি ছিল, হঠাৎ ইংরেজ শাসক তাদের জমি-জমা বাজেয়াপ্ত করল, অতিরিক্ত কর ধার্য করা হল তাদের উপর। বিধি-নিষেধ জারি করা হল তাদের চলাফেরার উপর। এমনকি এক সময় তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ জারি করা হল।
এরা একদিকে কৃষক, অপরদিকে ফকীর-সন্ন্যাসী। উভয় দিক থেকেই তারা বিদেশী শাসকদের শোষণ ও উৎপীড়নের শিকারে পরিণত হয়েছিল বলেই তারা নিজেদের জীবিকা ও ধর্ম রক্ষার জন্য বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছিল। এক রকম বাধ্য হয়েই তারা জমিদার-মহাজনদের গোলায় জমানো ধান-চাল লুট করতে বাধ্য হল। লুট করলো ইংরেজ বণিকদের কুঠি-কাছারি। কালক্রমে এদের সাথে যােগ দিল সহায় সম্বলহীন নিরন্ন চাষি, বেকার সৈনিক, বেকার চাকরিজীবী, পেশা হতে বঞ্চিত তাঁতী। ফকীর-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ’ বলে ঘোষণা করে হান্টার লিখেছিলেন “বিদ্রোহীরা অন্য কেহ নহে, এরা হল মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসপ্রাপ্ত সৈন্যবাহিনীর বেকার ও বুভুক্ষু সৈন্যগণ এবং জমিহারা-গৃহহারা বুভুক্ষু কৃষকের দল। এই অন্ন-বস্ত্রহীন বেকার সৈন্য ও কৃষক উভয়েই জীবিকা নির্বাহের শেষ উপায় বিদ্রোহ অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছিল। এরাই গৃহহারা ও সর্বহারা সন্ন্যাসী-ফকীররূপে দল বেঁধে সারা দেশে ঘুরে বেড়াতো। এক সময় এদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত হয়েছিল।”
সরকারি ইতিহাস ও গেজেটিয়ার রচয়িতা এল. এস. এস. ও. ম্যালিও-র মতে, “মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ফলে যে বিপুল সংখ্যক সৈন্য তাদের জীবিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল, তাদের মোট সংখ্যা ছিল প্রায় বিশ লক্ষ।”
অথচ স্বৈরাচারী ওয়ারেন হেস্টিংস এই মহান বিদ্রোহকে নানা সন্ন্যাসী ও ভোজপুরী দস্যু-ডাকাতদের আক্রমণ ও উৎপাত বলে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। তার সাথে সুর মিলিয়েছেন- ঝধহুধংর ধহফ ঋধশরৎ জধরফরৎং ড়ভ ইবহমধষ গ্রন্থের রচয়িতা যামিনী মোহন ঘোষ ও সা¤প্রতিককালের দেশীয় কয়েকজন পÐিত ব্যক্তি। অথচ তারা চিন্তা করে দেখেননি যে-ছিয়াত্তরের মন্বন্তর-এর মত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও এর পরিণতি স্বরূপ ভয়ঙ্কর মহামারীর ফলে বাংলা ও বিহারের দেড় কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল, বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষ ও মহামারী কবলিত বাংলাদেশে কোন ঐশ্বর্য লুণ্ঠনের জন্য সুদীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে (১৭৬৩-১৮০০) আক্রমণ চালিয়েছিল এবং ইংরেজ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ প্রাণ দিয়েছিল?
যাহোক বর্তমানে এ স্যু সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ফকীর-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল ম‚লত কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে যারা সরাসরি অংশগহণ করেছিল-তারা হল বাংলা-বিহারের অগণিত কৃষক ও কারিগর স¤প্রদায়, বিপুল সংখ্যক বুভুক্ষু বেকার সৈন্য বাহিনী এবং ফকীর-সন্ন্যাসীরূপী কৃষক।
এই বিদ্রোহের প্রধান নায়ক ছিলেন মজনু শাহ। বাংলা ও বিহারের বেকার সৈন্যবাহিনী, কারিগর ও সর্বহারা কৃষকদের একত্রিত করে একটা বিরাট বিদ্রোহীবাহিনী গঠন করার কাজে মজনু শাহ যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ইতিহাসে তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন সুদক্ষ সেনাপতিরূপে সৈন্য পরিচালনায় তিনি ছিলেন বিশেষ কৌশলী সংগঠক। তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রাণ, প্রধান নায়ক। সাধারণভাবে মজনু ফকীর নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি।
এই বিদ্রোহের ক্ষেত্র ছিল ঢাকা, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, কোচবিহার, জলপাইগুঁড়ি, মালদহ, পাবনা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলা। গ্রাম-বাংলার প্রতিটি খেটে খাওয়া মানুষ এই বিদ্রোহের সমর্থক ছিল। কোথাও বিদ্রোহীদের সাথে ইংরেজ সৈন্যবাহিনীর যুদ্ধ বাধলে গ্রামবাসীরা লাঠি-বল্লম নিয়ে এগিয়ে আসতো বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্যে। এই বিদ্রোহ দমনের কাজে বহু ইংরেজ সৈন্য এবং বিশিষ্ট কয়েকজন ইংরেজ সেনাপতিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। কোন ব্যাপক গণ-বিদ্রোহের সফলতার জন্যে যে আদর্শ ও লক্ষ্য, যে নেতৃত্ব, যে সংগঠন ও সংগ্রামী অভিজ্ঞতার প্রয়জোন গ্রাম-সমাজের সংকীর্ণ গÐিতে আবদ্ধ মানুষগুলোর মধ্যে তার বিশেষ অভাব ছিল। তাই শেষ পর্যন্ত এই মহান বিদ্রোহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু ব্যর্থ হলেও পরবর্তী কৃষক বিদ্রোহ ও জন-জাগরণের ক্ষেত্রে এ বিদ্রোহ একটা নতুন পথের ইঙ্গিত দিয়ে গেছে। সেই রক্তাক্ত পথ ধরেই পরবর্তীকালে এদেশের বুকে আরও বহু কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল। তাই এই বিদ্রোহ সফল বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদ‚ত।
কোন দেশের উন্নতি বা অবনতি নির্ভর করে সে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর। কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। সুতরাং কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি ও কৃষকই দেশের প্রাণ। ক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন