Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬, ২৪ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

আল্লাহ্র অস্তিত্ব : আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন তত্ত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২৮ জুন, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

বার

চুতুর্থ, নৈতিক যুক্তি ঃ এই যুক্তিটির মূল বক্তব্য হলো, সাধারণত দেখা যায় এ জগতের ধার্মিকগণ প্রায়ই অসুখী থাকেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে ধার্মিককে সুখী করা সম্ভব নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে এ কাজ কার? একমাত্র আল্লাহ্ই ধার্মিকতা ও সুখের সমন্বয় সাধন করতে পারেন। ধার্মিক ব্যক্তি ইহজীবনে সুখী না হলেও পরজীবনে আল্লাহ্ তাকে সুখী করতে পারেন। অতএব, আল্লাহ্র অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে হয়।
আল্লাহ্র অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ব্যাপারে একটা কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, পরীক্ষাগারে বা বাস্তব যাচাই পদ্ধতিতে কোন জিনিসকে যেমন প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায়, আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণটি ঠিক সেরকম নয়। তবে একথা ঠিক নয় যে, অদৃশ্যে বিশ্বাসের নাম বিজ্ঞান। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম এবং বিজ্ঞান উভয়েই মধ্যেই অদৃশ্যের কার্যকারিতা রয়েছে। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ৪০”।
ধর্মের মূূল চক্ররেখা চূড়ান্ত বাস্তবতা নির্ণয়ের দিক নির্দেশ করে, অপরদিকে বিজ্ঞান ততক্ষণ পর্যন্ত দৃশ্যমান জ্ঞান, যতক্ষণ তা প্রাথমিক ও বাহ্যিক বিষয় সম্পর্কে কথা বলে। আর যখন তা বস্তুর চূড়ান্ত ও প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয়-যা মূলত ধর্মের রাজ্যভুক্ত তখন তাও ঠিক সেভাবে অদৃশ্য বিশ্বাস এর পন্থা অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ মাধ্যাকর্ষণ নীতির কথা বলা যায়। হরহামেশা আমরা দেখি একটি পাখি মরে গেলে মাটিতে পড়ে, একটি পাথরকে মাটি থেকে উঠাতে গেলে শক্তি খরচ হয়, তেমনি পাহাড় থেকে নামারর তুলানায় পাহাড়ে উঠা কঠিন। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই আমাদের সামনে আসে, সেগুলোর মধ্যে বাহ্যত কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু উপরে উল্লিখিত ইন্দ্রিয়নুভূত ঘটনারাজি এবং যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তবতাসমূহকে একসাথে মিলিয়ে দেখলে সবকিছুর মধ্যে একটা শৃঙ্খলা পরিদৃষ্ট হয়; যার নাম দেয়া যায় মাধ্যাকর্ষণ নীতি। যদিও এই নীতি কখনও বাস্তবে পরিদৃষ্ট চক্ষুষ বস্তু নয়, বিজ্ঞানীরা যে জিনিসটি দেখেছেন, পরীক্ষা করেছেন, তা স্বয়ং আকর্ষণ নীতি নয় বরং অন্য কিছু যাকে তারা যুক্তির খাতিরে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং স্বীকার করেছেন যে, এর মধ্যে এমন কোন বস্তু বিদ্যামান, যাকে তারা মাধ্যাকর্ষণ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।

এই জন্য বলা যায়, বিজ্ঞান যেমন দৃশ্যমান বস্তুকে স্বীকার করে তেমনি অদৃশ্যমান বিষয়ের উপরও বিশ্বাস করে। অদৃশ্যমান বিষয়গুলোর প্রতি যদি আস্থা বা বিশ্বাস করা না হয় তাহলে মাধ্যাকর্ষণ নীতি, পরমাণুর অস্তিত্বের ধারণা- সব মিথ্যা হয়ে যেত।
আসলে একটি অদৃশ্য বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার ফলাফলের কারণে বিজ্ঞানীরা সুদৃঢ বিশ্বাস পোষণ করে পরোক্ষভাবে একথার স্বীকৃতি দেন যে, যে সমস্ত বাস্তবতার উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি, আদিতে তা একটি কল্পিত (Hypohtetical) সিন্ধান্তই হয়ে থাকে। অতঃপর যখন ক্রমান্বয়ে নুতন নতুন বাস্তবতা প্রতিভাত হয়ে এই সিন্ধান্তের সত্যতা প্রমাণিত হতে থাকে তখন তা বাস্তবতা রূপ প্ররিগ্রহ করে, এমনকি শেষ পর্যন্ত আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২”।

ঠিক একই ভাবে আল্লাহ্কে প্রমাণ করতে গিয়ে এরূপ করা হয়না যে, কোন দূরবীক্ষণ যন্ত্রের
Mia, A Contemporary Philosophy of Riligion (Islamic Foundation, Dhaka: 1982), Chapter-VII.
সাহায্যে স্বয়ং আল্লাহ্কে দেখিয়ে দেওয়া হয়, বরং এভাবে এর পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, সৃষ্টিরাজির নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একথার প্রমাণ যে, এর পিছনে কোন প্রজ্ঞাময় সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। এভাবে আমাদের যুক্তি সরাসরি আল্লাহ্ না মেনে পারা যায় না। উপরোক্ত কথাগুলো সামনে রেখে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণের জন্য কুরআন উল্লিখিত কিছু বিজ্ঞান ভিত্তিক আয়াতের পর্যালোচনা করে উক্ত আয়াতগুলো যে বিজ্ঞানের বক্তব্যের সাথে হুবহু সাদৃশ্যমান-এর ভিত্তিতে আল্লাহ্র অস্তিত্বের বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রমাণ দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হবে। কেননা কুরআনের বক্তব্য যদি প্রবক্তা তিনি স্বয়ং আল্লাহ্।

কেননা কুরআন এখন থেকে দেড় হাজার বৎসর পূর্বে নাযিল হয়েছে, আর বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগতের ব্যাখ্যা দিচ্ছে- যা কুরআনের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে তা মাত্র একশত বৎসর পূর্বেই প্রমাণ। তবে এখানে একটি বিষয় প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন আর তা হচ্ছে, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত¡ ও তথ্য সম্বলিত কুরআনের বাণী সংখ্যায় সুপ্রচুর। এত ছোট পরিসরে তার সবটুকু কেন সামান্য অংশও উল্লেখ করা মুশকিল। এখানে সংক্ষেপে মাত্র তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করা হলো ঃ

প্রথমত, পানির প্রসঙ্গটি উল্লেখযোগ্য। কুরআনের দু’টি জায়গায় পানির একটি বিশেষ নীতি প্রকৃতির বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটির পানি মিষ্টি, সুপেয় এবং অপরটির পানি লোনা, খর- উভয়ের মধ্যে তিনি রেখে দিয়েছেন এক অন্তরাল, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” “সূরা ২৫, আয়াত ৫৩”।
অন্য জায়গায়, “তিনি প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া যারা পরষ্পর মিলিত হয়, কিন্তু ওদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা ওরা অতিক্রম করতে পারে না। “সূরা ৫৫, আয়াত ১৯-২০”।

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে পানির যে বহিঃপ্রকাশের উল্লেখ করা হয়েছে তা প্রাচীনতম যুগ থেকে মানুষের জানা থাকলেও এই ঘটনা প্রকৃতির কোন নিয়মের অধীনে ঘটে চলছে তার কারণ অতি স¤প্রতি জানা গেছে। আধুনিক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, তরল পদার্থের মধ্যে পৃষ্ট প্রসারণ (Surface Tension)-এর একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে এবং এই নিয়মই উভয় প্রকার পানিকে পৃথক রাখে। উক্ত আয়াতদ্বয়ে যে বরযাখ বা অন্তরাল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কৃত পৃষ্ঠ প্রসারণ (Surface Tension)-এর দিকেই ইংগিত করছে। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ১৫৯”।

দ্বিতীয়ত, রাত ও দিনের আবর্তন সংক্রান্ত প্রসংঙ্গটি উল্লেখ করা যায়। কুরআনে বলা হচ্ছে, “তিনি দিনকে রাত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন যাতে ওদের একটি অন্যটিকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে।” “সূরা ৭, আয়াত ৫৬৪”।
এই আয়াতে রাত ও দিনের বাহ্যিক আগমন-নির্গমনের কথা বলা হলেও পৃথিবীর আপন কক্ষপথে পরিভ্রমনের একটি অতি সুন্দর ইঙ্গিত রয়েছে। যা আধুনিক পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। এ প্রসঙ্গে রাশিয়ার প্রথম মহাশূণ্য ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা যায়। আর তা হলো, তিনি মহাশূণ্য থেকে পৃথিবীতে এই রূপে দেখেছেন যে, সূর্যের সম্মুখে আপন অক্ষের উপর আবর্তিত হওয়ার কারণে তার উপর আলো ও আঁধারের আগমন নির্গমনের একটি দ্রুত ধারাবহ (Repid Succession) অব্যাহত রয়েছে। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ১৬১। আরো দেখুন, ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল”।

তৃতীয়ত, মহাশূণ্য বিজয়ের কথা বলা যায়। কুরআনে বলা হচ্ছে, ‘হে জ্বীন ও মানব মণ্ডলী, যদি তোমরা প্রবেশ করতে পার আসমান ও যমিনের এলাকায়, তাহলে তাতে প্রবেশ কর। তোমরা এতে
প্রবেশ করতে পারবে না মহাক্ষমতা ব্যতিরেকে।’ “সূরা ৫৫, আয়াত ৩৩”।
উপরোক্ত আয়াতে যে শর্তেÍ (যদি) কথা বলা হয়েছে তা অর্জিত হতে পারে এমন কথা বোঝাচ্ছে। কেননা ‘যদি’ বুঝাতে আরবীতে ‘ইজা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে তা অর্জন করা সম্ভব নয় বোঝায়। উপরোক্ত আয়াতে ‘ইন’ শব্দটি দ্বারা এমন এক যদির ধারণা দেওয়া হয়েছে যা অর্জনযোগ্য। এ প্রসঙ্গে ড. মরিস বুকাইলী বলেন,

“মহাশূন্য বিজয়ের কর্মসূচীতে এই মানুষেরা যে মহাক্ষমতার (সুলতান) বলে সাফল্য অর্জন করবে, ধারণা করা যেতে পারে যে, সেই ক্ষমতা আসবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র তরফ থেকে।” “ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, পৃ. ২৬৯”।
কুরআনে বর্ণিত অসংখ্যা বিজ্ঞান ভিত্তিক আয়াতের মধ্যে এখানে মাত্র দু’একটি আয়াত পেশ করা হলো যা প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। যদি আল্লাহ্ বলে সত্তা না থাকেন তাহলে একন থেকে দেড় হাজার বৎসর পূর্বে সম্পূর্ণ অক্ষর জ্ঞানহীন একজন মানুষের দ্বারা এমন বক্তব্য পেশ করা আদৌ সম্ভব নয়। আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণকে ‘জাগতিক অভিজ্ঞতা ভিত্তিক প্রমাণ’, ‘উদ্দেশ্যমূলক প্রমাণ’, ‘আত্মিক চেতনা ভিত্তিক প্রমাণ’ এবং ‘প্রত্যাদেশ ভিত্তিক’ প্রমাণে বিভক্ত করে দেখানো যেতে পারে। এখন কুরআনের আলোকে উপরোক্ত শিরোনামে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বর্ণনা করা হচ্ছে।

সৃষ্টি জগতের দিকে তাকালে পরিস্কার বোঝা যায় এই জগৎ আল্লাহ্র স্বাক্ষ্য দিচ্ছে। এই জগতে বিদ্যমান এমন একটি বস্তুও নেই যা নিজ থেকেই বিদ্যমান। প্রতিটি ক্ষুদ্র-বৃহৎ বস্তুর পিছনে একজন নির্মাতা অবশ্যই আছে। এর এটা একটা বাস্তবিকই অর্থহীন কথা যে, সৃষ্টিকে স্বীকার করা হবে কিন্তু স্রষ্টাকে স্বীকার করা হবে না। ঠিক একইভাবে এটিও বিশ্বাস করা যায় না যে, এই বিরাট সৃষ্টি জগৎ এমনিতেই সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং এর পিছনে কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। একমাত্র অস্তিত্বশীল স্রষ্টাই এই বগতের প্রতিটি বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন, এবং সেই সৃষ্টির প্রকৃতি, এর গঠনবিন্যাস, এর কার্যকারিতা প্রভৃতির উপলব্ধির দ্বারা এক আল্লাহ্র অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া উপায় যে নেই সেই সত্যটি পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে, “তোমাদের আল্লাহ্ এক ও একক। সেই দয়াবান ও করুণাময় আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই। (এই সত্যটি চিহিৃত করার জন্য যদি কোন নিদর্শন বা আলামতের প্রয়োজন হয় তাহলে) যারা বুদ্ধি বিবেক ব্যবহার করে তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর ঘটনাকৃতিতে, রাত্রদিনের অনবরত আবর্তনে, মানুষের প্রয়োজনীয় ও উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগর দরিয়ার চলমান জলযানসমূহে, বৃষ্টি ধারার মধ্যে, যা আল্লাহ্ বর্ষণ করেন ওপর থেকে তারপর তার মাধ্যমে মৃত ভূমিতে জীভন দান করেন এবং নিজের এই ব্যবস্থাপনা বদৌলতে পৃথিবীতে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন, আর বায়ূ প্রবাহ এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।” “সূরা ২, আয়াত ১৬৩-১৬৪”।
কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে, “তিনি অর্থাৎ আল্লাহ্ আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা। তিনিন তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন......।” “সূরা ৪২, আয়াত ১১”।

কুরআনে আরো বলা হচ্ছে, “হে মানব জাতি। ইবাদত কর তোমাদের রবের যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বে যারা অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের সবার সৃষ্টিকর্তা....।” “সূরা ২, আয়াত ২১; আরো দেখুন, সূরা ১৬, আয়াত ১০-১১; সূরা ৬, আয়াত ৯৯; সূরা ৫০, আয়াত ৯-১১”।
পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, কুরআনের অনেক জায়গায় বলা হয়েছে, এই জগতকে বিনা উদ্দেশ্য সৃষ্টি করা হয়নি। এই জগতে যে নিয়ম শৃঙ্খলা, সামঞ্জস্য, ঐক্য বিরাজমান এদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আল্লাহ বোঝাতে চাচ্ছেন যে, প্রকৃতির সকল ঘটনারাজির ঐক্য বিধানের জন্য নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টা প্রয়োজন। যে ঐক্যের মধ্যে কোন ফাটল বা অসামঞ্জস্যতা থাকবে না। কুরআনে বলা হচ্ছে, “সেই মহান সত্তাই সাত আসমানকে স্তরে স্তরে তৈরি করেছেন। তুমি সেই করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোথাও কোন ক্রটি দেখতে পাবে না। “সূরা ৬৭, আয়াত ৩-৪”।
কুরআনের অন্যত্র বলা হচ্ছে, “আমি আকাশ ও ভূমণ্ডল এবং তন্মাধ্যস্থ যাবতীয় ব্স্তু খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। নিশ্চয়ই আমি উভয়কেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করেছি কিন্তু অধিকাংশ লোকই অনুধাবন করে না।” “সূরা ৪৪, আয়াত ৩৮-৩৯”।

এটিকে দর্শনের পরিভাষায় আল্লাহর অস্তিত্বের তত্ত¡ বিষয়ক প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এটি হলো, মানুষের মনে আল্লাহর ধারণার উপস্থিতিই তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। কুরআনে বলা হচ্ছে, মানুষ বিপদে পড়লে অকস্মাৎ সে আল্লাহ্কে স্মরণ করে, আসমান যমীনের সৃষ্টির ব্যাপারে প্রশ্ন করলেও সে জবাব দেয় যে, মহান আল্লাহ্ই এগুলো সৃষ্টি করেছেন। “সূরা ৪১, আয়াত ৫১; সূরা ৪৩, আয়াত ৯”।
এখানে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে যদি আল্লাহ্র অস্তিত্ব না-ই থাকে তাহলে মানুষের অন্তরে এমন ধারণা কে সৃষ্টি করে? সুতরাং এ থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ্র অস্তিত্ব অত্যন্ত সুষ্পষ্ট।
আল্লাহ্ যুগে যুগে মানব জাতিকে হিদায়েতদানের জন্য নবী রাসূল প্রেরণ করেছেন। “সূরা ৩৫, আয়াত ২৪”।
সেই সাথে ঐসব নবী-রাসুলকে তিনি সঙ্গে দিয়েছেন আসমানী গ্রন্থ। ঠিক এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে পবিত্র কুরআন দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। “সূরা ৬, আয়াত ১৯”।
পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় চ্যালেঞ্জ “সূরা ২, আয়াত ২৩; সূরা ১০, আয়াত ৩৮; সূরা ১১, আয়াত ১৩; সূরা ১৭, আয়াত ৮৮ এবং সূরা ৫২, আয়াত ৩৩-৩৪”।
দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই কিতাব স্বয়ং আল্লাহ্রই বাণী এবং মানুষ ও জ্বীনকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে যে, তোমরা যদি মনে কর এটি আল্লাহ্র বাণী নয় তাহলে তোমরা অনুরূপ একটি অধ্যায় বা সূরা রচনা করে নিয়ে এসো। এই চ্যালেঞ্জ যে মানুষ গ্রহণ করেনি তা নয়। কিন্তু মানুষ অনুরূপ একটি অধ্যায় তো দূরের কথা একটি ছোট সূরাও রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্র অস্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। সব শেষে কোন্ কোন্ ভিত্তির উপরই নির্ভর করে আল্লাহ্র সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা আলোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কুরআনে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তার মধ্যে মাত্র কয়েকটি বিষয়ে অতি সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে ঃ মানুষের দুটি দিক রয়েছে, ১. দৈহিক দিক, ২. আত্মিক দিক। দৈহিক দিকের চেয়ে আত্মিক দিকটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মিক দিকের সঙ্গে খোদ আল্লাহ্র প্রকৃতিগত সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয়। কেননা কুরআনে বলা হচ্ছে, “মানুষ আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন রূহ আমার প্রভুর দির্দেশ। “সূরা ১৭, আয়াত ৮৫”।

অর্থাৎ এখানে একটি বিষয় পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে আর তা হলো, স্বয়ং আল্লাহ্র রুহানিয়াত মানুষের মধ্যে ফুঁকে দেওয়া হয়েছে। এদিক থেকে বলা যায় মানুষের সাথে আল্লাহর একটা আধ্যাত্মিক (ঝঢ়রৎরঃঁধষ) সম্পর্ক রয়েছে। আর এটাই বলা হচ্ছে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে, “তোমরা আল্লাহ্র রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে যাও।” “সূরা ২, আয়াত ১৩৮”।
জ্ঞানগত দিক ঃ পবিত্র কুরআন থেকে জানা যায় মহান আল্লাহ্ হচ্ছেন সকল জ্ঞানের আধার; তিনি সুবিজ্ঞ। ভূমন্ডল ও নভোমণ্ডল এমন কোন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় নেই যে সম্পর্কে তিনি পরিজ্ঞাত নন। “সূরা ৪০, আয়াত ২; সূরা ৪১, আয়াত ৪৭; সূরা ৫৭, আয়াত ৪”।
মূলত জ্ঞনগত দিক থেকে আল্লাহ্কে সর্বজ্ঞানী বলা হয়। এই জ্ঞানের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ তিনি মানুষকে দিয়েছেন। ফেরেশতারা হয়তো এক এক দিক ও বিভাগ সম্পর্কে মানুষ অপেক্ষা বেশী জ্ঞান রাখে। কিন্তু মানুষ জগতের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে কমবেশী জ্ঞানের অধিকারী। “সূরা ২, আয়াত ৩১”।

এই জন্য মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে ফেরেশতাদে আপত্তির মুখে আল্লাহ্ যেমন বলেছেন আমি যা জানি তোমরা তা জাননা। “সূরা ২, আয়াত ৩০”।
অপর দিকে, মানুষ সৃষ্টির পর জ্ঞানের পরীক্ষায়ও ফেরেশতারা মানুষের কাছে পরাজিত হয়। “সূরা ২, আয়াত ৩২”।
সুতরাং বলা যেতে পারে যে, যদিও সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আল্লাহ্ই পরিপূর্ণভাবে জ্ঞান; কিন্তু এটা বলা যেতে পারে যে, সেই জ্ঞানের একটা ক্ষুদ্র অংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও মানুষ তা করছে।
বিশ্ব জাহানের বিশাল সাম্রাজ্যের একচ্ছন্ন কর্তৃত্বের অধিকারী মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন। “সূরা ২, আয়াত ২৫৫”।
তিনি মানুষকে তার একচ্ছত্র কর্তৃত্বের কিছু অংশ দিয়ে এই পৃথিবীতে খেলাফতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। “সূরা ২, আয়াত ৩০”।
এবং অন্য কোন সৃষ্টি জীব বা পদার্থ নয় স্বয়ং মানুষই সেই দায়িত্বের বোঝা বহন করতে সম্মত হয়েছেন। “সূরা ৩৩, আয়াত ৭২”।
সুতরাং বলা যেতে পারে যে, বিশাল সাম্রাজ্যের মধ্যে মানুষ আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়নের ব্যাপারে সে তাঁরই সাহায্যকারী। “মুহাম্মদ ইকবাল : ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুর্নগঠন অনুবাদ সম্পাদক- অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ঃ ১৯৫৭), অধ্যায়-৪; সূরা ৬১, আয়াত ১৪”।

নৈতিক দিক থেকেও মানুষের সাথে আল্লাহ্র সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয়। ইচ্ছার স্বাধীনতা থেকেই নৈতিকতার উৎপত্তি। এদিক থেকে বলা যায় যে, মহান আল্লাহ্ সকল প্রকার ইচ্ছার একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি ইচ্ছার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করেন। তিনি যখন যা খুশী তখনই তা বাস্তবায়ন করেন। যখন কোন কিছু করা ইচ্ছা হয় তথনই তিনি শুধু বলেন, “হও”, আর অমনি তা হয়ে
যায়।” “সূরা ৩, আয়াত-৪৭”। এদিক থেকে বলা যায় যে, মানুষ সীমিতভাবে হলেও নিজ ইচ্ছা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। আর এই স্বাধীনতা ভোগ করে বলেই কুফর বা ঈমান গ্রহন করার পূর্ণ ইখতিয়ার তার রয়েছে। “সূরা ১৮, আয়াত ২৯”। সুতরাং এ কথা বলা যেতে পারে যে, নৈতিকতার সর্বোচ্চ উৎস হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ্ আর মানুষ তার নিজ পরিসরে নৈতিক বোধসম্পন্ন এক সীমাবদ্ধ জীব। এ পর্যন্ত আল্লাহ্ সম্পর্কিত বিষয়ে যতটুকু আলোচনা করা হয়েছে সেখানে একটি বিষয়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দার্শনিক, বিজ্ঞানী সব শ্রেণীর মানুষের মনে আল্লাহ্র ধারণার স্বীকারোক্তি প্রচ্ছন্নভাবে হলেও বিদ্যমান। বিভিন্ন ধর্মে, দর্শনে এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনায় আল্লাহ্র অস্তিত্বের স্বীকৃতি দৃঢ়ভাবে স্বীকৃত- এবং বহু বা দুই নয় এক আল্লাহ্র প্রতিই মানুষের যৌক্তিক আকর্শণ বিদ্যমান। অবশ্য আল্লাহ্ সম্পর্কিত আলোচনা এত ব্যাপক এবং বিশাল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আলোচ্য প্রবন্ধে যেসব শিরোনামে এবং যেসব দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করা হয়েছে তা ছাড়াও মঙ্গল অমঙ্গলের ধারণার সাথে আল্লাহ্র সম্পর্ক, আল্লাহ্র গুণাবলী প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করা যেতে পারে। ‘আল্লাহ্র ধারণা’ বিষয়ে বিস্তারিত পাঠের জন্য প্রবন্ধের শেষে “সহায়ক তথ্য নির্দেশনা” প্রদান করা হলো।

তথ্য নির্দেশনা
* খলিফা আব্দুল হাকীম, ইসলামী ভাবধারা, অনুবাদ- সাইয়েদ আব্দুল হাই (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৭০) পৃ. ৫৪-৯০।
* ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্বিতীয় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০০), পৃ. ৬৩৪-৬৩৬।
* মুহাম্মদ শাহজাহান, আল-গাযালীর দর্শন, উত্তরণ অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, রাজশাহী, ২০০০।
* মুহাম্মদ শাহজাহান, আল-ফারাবীর দার্শনিক চিন্তাধারা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০২ পৃ. ১৫-১৯।
* আল্লামা শিবলী নু’মানী, ইসলামী দর্শন, অনুবাদ- মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮১, পৃ. ২০৭-২১৪।
* মুহাম্মদ আল-গাযালী, ইসলামী আকীদা, অনুবাদ- মুহাম্মদ মুসা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮৬, পৃ. ১-৫৬।
* আল-গাযালী, কিমিয়ায়ে সা’আদাত, অনুবাদ-নুরুর রহমান (এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা : ১৯৯৫।)
লেখক ঃ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান, পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১। মোবাঃ ০১৯৬৩-৬৭১৯১৭



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন