Inqilab Logo

বুধবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮, ২২ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

আসুন, রমজানের শিক্ষায় জীবনকে সাজাই

প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

জালাল উদ্দিন ওমর

সময়ের পরিক্রমায় বছর ঘুরে মুসলিম বিশ্বে আবারো পবিত্র মাহে রমজান সমাগত। আমরা এখন শাবান মাসে শেষ প্রান্তে। শাবান মাস হচ্ছে রমজানের প্রস্তুতির মাস। শবে বরাতও পার হয়ে গেছে। আর কয়েকদিন পরেই রোজা শুরু হবে। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী আগামী ৭ জুন থেকে রোজা শুরু হওয়ার কথা। তার মানে রমজান বিশ্ববাসীর দরজায় কড়া নাড়ছে। রমজানের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। যা কিছু ইসলামের শিক্ষা তাই রমজান আমাদেরকে ট্রেনিং দেয়। বৎসরের ১২টি মাসের মধ্যে রমজান মাস আলাদা বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা এবং গুরুত্ব বহন করে। এই রমজান মাস আল্ল­াহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য একটি বিশেষ উপহার। রহমত, বরকত আর মাগফেরাতের বার্তা নিয়ে রমজান মানবজাতির কাছে হাজির হয়। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দাহ আল্ল­াহর কাছে পাপ মার্জনার সুযোগ লাভ করে। রমজান মাসে মানবজাতি তাকওয়া অর্জন করে। রমজান মাসের ইবাদতের মূল্য আল্ল­াহর কাছে সবচেয়ে বেশি। রোজাদারকে ইফতার করানোর মাঝে আল্লাহ বান্দার জন্য বিশেষ পুণ্যের বরাদ্দ রেখেছেন। এই মাসে তারাবিহ পড়তে হয়, সেহেরি খেতে হয়। দিনের শেষে ইফতারির মাধ্যমে রোজা শেষ করতে হয়। মূলত রোজা হচ্ছে মানবজাতির ট্রেনিং এবং আত্মগঠনের মাস। এই মাস মন্দ কাজ চিরতরে পরিহার করে উত্তম চরিত্র গঠনের মাস। এই মাসে তাকওয়া অর্জন করে, বাকি ১১ মাস ভালোভাবে চলার সুযোগ করে দেয়। রমজান মাসে আল্লøাহ তার প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল করেছেন। এই কারণে রমজান মাস অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। আর কোরআন হচ্ছে বান্দার জন্য আল্ল­াহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব, যা মানবজাতির জন্য পথপদর্শক। এই মাসেই রয়েছে হাজার রাত্রির শ্রেষ্ঠ রাত্রি পবিত্র লাইলাতুল কদর। যে রাত্রির ইবাদত আল্লøাহর কাছে অধিক প্রিয়। সুতরাং রমজান মাস আসার সাথে সাথে মুসলিম সমাজে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। মুসলমানদের চিন্তা চেতনা এবং কর্মে পরিবর্তন আসে। দৈনন্দিন কাজ-কর্মের রুটিনেও পরিবর্তন আসে। অফিস-আদালতে নতুন সময়সূচি চালু হয়। মুসলিম সমাজের সর্বত্রই একটি পবিত্র ও ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার প্রকৃতির নিয়মেই মাস শেষে রমজান চলে যায়। আর মুসলমানরা বছরের পর বছর ধরে রমজান পালন করছে। রমজান আমাদের সংযম শিক্ষা দেয়, নৈতিকতা শিক্ষা দেয়, সততা শিক্ষা দেয় এবং সর্বোপরি মানবকল্যাণ শিক্ষা দেয়। রমজান সবসময় ধৈর্য ধারণের কথা বলেছে, মিথ্যাকে পরিহারের কথা বলেছে, সকল ধরনের পাপকে বর্জনের কথা বলেছে, অশ্লীলতা কে বর্জনের কথা বলেছে এবং অপরের ক্ষতি করা থেকে দূরে থাকার কথা বলেছে। রমজান আমাদের মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছে। লোভ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ পরিহারের কথা বলেছে। বিপদে-আপদে অপরের পাশে থাকার কথা বলেছে। অপরের দুঃখ লাঘবে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বলেছে। কিন্তু মুসলিমজাতির বড়ই দুর্ভাগ্য যে, রমজানের প্রকৃত শিক্ষায় আমরা এখনো শিক্ষিত হতে পারিনি। তাই সংযমের মাস রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরো বেড়ে যায়। একশ্রেণির ব্যবসায়ী কীভাবে অত্যধিক মুনাফা করবে, তার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। অথচ এটা ইসলামের শিক্ষা নয়, রমজানেরও শিক্ষা নয়। অপরদিকে সামর্থ্যবান মানুষেরা প্রায়ই পুরো রমজান এবং ইফতারির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য একসাথে কিনেন। ফলে অটোম্যাটিক্যালি বাজারে এসব পণ্যের সংকট সৃষ্টি হয়, যা পুরোটাই কৃত্রিম। আর এই সুযোগে বেশি চাহিদাকে ইস্যু বানিয়ে ব্যবসায়ীরা এসব পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দেয়। আবার ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং পণ্যের দাম ইচ্ছামত বাড়িয়ে দেয়। ফলে যারা গরিব মানুষ এবং যারা দিন আনে দিন খায়, তারা সেহেরি এবং ইফতারির জন্য ভালো এবং পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারে না। ফলে তারা সেহেরিতেও ভালো খাবার খেতে পারে না, আবার ভালো কিছু দিয়েও ইফতারি করতে পারে না। ধনী লোকেরা যেখানে উদর পূর্তি করে সেহেরি এবং ইফতারি খায়, সেখানে মুসলিম সমাজেরই অনেক মানুষ কোনো রকমে ডাল, ভাত খেয়ে সেহেরি সারে আর পানি পান করে ইফতার করে। সুতরাং এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মজুদদারিতা এবং অতিরিক্ত বিলাসীতার জন্য লাগামহীন অর্থ ব্যয় কোনটাই ইসলামের শিক্ষা নয়।
সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত একসাথে পুরো মাসের বাজার না করে কয়েক দিনের বাজার করা এবং গরিব লোকেরা যাতে ভালো কিছু খেয়ে সেহেরি এবং ইফতার করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। রমজান আসলেই ইফতার পার্টির হিড়িক পড়ে। বড় বড় হোটেলে, জাঁকজকম পূর্ণ আয়োজনে, নানা ধরনের সুস্বাদু খাদ্য দিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন চলে। সমাজের অর্থশালী, বিত্তশালী এবং সামর্থ্যবান লোকেরাই এতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এতিম, মিসকিন, গরিব এবং সমাজের অসহায় ও বঞ্চিত মানুষদের জন্য এরকম ইফতার পার্টির আয়োজন তেমন একটা হয় না। অথচ করতে হবে তাদের জন্যই আর এটাই রমজানের শিক্ষা। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার শেষে মহান আল্লাহ তার সিয়াম সাধনাকারী মুসলমানদের জন্য খুশির উৎসব হিসেবে ঈদ-উল ফিতরের ব্যবস্থা করেছেন। এদিন মন খুলে কোলাকুলি করার দিন। এদিন ধনী-গরিব সকল মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দ এবং খুশির উৎসব চলাটাই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সবার ঘরে এবং সবার মাঝে ঈদের আনন্দ থাকে না। কারণ সেদিন অভাবের কারণে অনেক পরিবারের লোকজন নতুন জামা কিনতে পারে না, আবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও নতুন জামা কিনে দিতে পারে না। আবার অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য সেমাই, পোলাও কিংবা ভালো খাবারও রান্না করতে পারে না। অথচ রমজানের শিক্ষা হচ্ছে, সবাই নতুন কাপড় কিনবে এবং তা পরিধান করেই ঈদ উদযাপন করবে। একই সাথে রমজানের শিক্ষা হচ্ছে, সবার ঘরেই সেমাই, পোলাও রান্না হবে। ধনী লোক এবং তাদের ছেলেমেয়েরা ঈদের জন্য একাধিক নতুন জামা, জুতা এবং আরো অনেক কিছু কিনে, যার প্রত্যেকটিই নামি এবং দামি ব্রান্ডের। অথচ এই সব ধনী লোক এবং তাদের ছেলেমেয়েরা প্রত্যেকই যদি একটি করে জামা এবং জুতা কিনে আর বাকি টাকা দিয়ে গরিব লোক এবং তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য একটি করে নতুন জামা এবং জুতা কিনে দেয়, তাহলে কিন্তু সমাজের সব মানুষেরই নতুন জামা এবং জুতা হয়ে যাবে তখন সবার মাঝেই আনন্দ থাকবে এবং ঈদ-উল ফিতর হবে আনন্দময়। আর এটাই হচ্ছে রমজানের শিক্ষা। সুতরাং আসুন, আমরা সবাই রোজা পালন করার সাথে সাথে রমজানের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হই এবং সেই শিক্ষায় জীবনকে সাজাই।
পবিত্র রমজান মাস যখন আমাদের সামনে সমাগত, তখন মুসলিম ভাইদের প্রতি আমার ছোট্ট একটি আবেদন, তা হচ্ছে আপনারা রমজানকে সম্মান করুন, ঠিকমত রোজা পালন করুন এবং কোন অবস্থাতেই রমজানের পবিত্রতা ক্ষুণœ করবেন না। আমরা যেন কোন অবস্থাতেই রমজানের সিয়াম সাধনার চেয়ে অন্য কিছুকে বেশি গুরুত্ব না দেই। সবার আগে রোজাকে গুরুত্ব দিন। আর অমুসলিম ভাইদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে এমন কোনো পরিবেশের সৃষ্টি করবেন না, যাতে রমজানের পবিত্রতা ক্ষুণœ হয় এবং রোজা পালনে মুসলমানদের কোনো ধরনের অসুবিধা হয়। মনে রাখতে হবে, ধর্ম একটি অতীব পবিত্র জিনিস আর অপরকে ধর্ম পালনে সহযোগিতা করাটা একজন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। অপরদিকে নিশ্চিন্তে এবং নির্বিঘেœ ধর্ম পালন করাটাও একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সুতরাং রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং মুসলমানদের রোজা পালনে সহযোগিতা করাটা সবারই নৈতিক দায়িত্ব। অপরদিকে ইসলাম সবসময় মানবকল্যাণের জন্য মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ পৃথিবীতে একটি সুন্দর, কল্যাণময় এবং সম্প্রীতির সমাজ গঠনের জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। তাই ইসলাম সবসময় সত্য ও সুন্দরের কথা বলেছে, মানবপ্রেমের কথা বলেছে, মানবতার কথা বলেছে, ন্যায় বিচারের কথা বলেছে। একই সাথে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসাসহ যাবতীয় মিথ্যা এবং অন্যায়কে বর্জন করতে ইসলাম মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছে। আসুন, আমরা ইসলামের এই শিক্ষাকে গ্রহণ করি। আমরা সবাই যেন প্রতিদিন একটু হলেও কোরআন পড়ি এবং কেউ যেন কোরআন পড়তে ভুলে না যাই। আমরা যেন সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, জুলুম এবং অবিচার চিরতরে বন্ধ করি।
আসুন, আমরা মাদক ও যৌতুককে চিরতরে বর্জন করি। হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, গীবত এবং পরনিন্দাকে আমরা চিরতরে পরিহার করি। আমরা অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় কাজে এবং বিনোদনের জন্য অনেক সময় অনেক টাকাই ব্যয় করি। আসুন, আমরা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ব্যয় বন্ধ করি এবং সেই টাকাটা এ সমাজের গরিব-দুঃখী, অসহায় ও বিপন্ন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য ব্যয় করি। আসুন, আমরা জাকাতটা ঠিকভাবে আদায় করি এবং জাকাতের অর্থ ইসলাম নির্দেশিত খাতসমূহে ব্যয় করি। ঈদ-উল ফিতরের আগেই ফিতরার টাকা পরিশোধ করি। অন্য কাজে আমাদের সময় এবং অর্থব্যয়টা যেমন স্বতঃস্ফূর্ত, ঠিক ইসলামের বিধান পালন করা এবং ইসলামের নির্দেশিত পথে অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের তেমনি স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। আল্লøাহকে ভালোবাসতে হবে সবার আগে। আল্ল­াহর নির্দেশিত বিধিবিধান পালন করতে হবে সবার আগে। আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল (সা.) প্রদর্শিত জীবন অনুসরণ করতে হবে। না হলে আমরা নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হব, যে ক্ষতি পুষিয়ে আনা কোনো দিনও সম্ভব নয়। এই রমজানই কিন্তু আপনার জীবনের শেষ রমজান হতে পারে। আপনি যে আরো একটি বছর বাঁচবেন, সুস্থ থাকবেন এবং রোজা পালন করতে পারবেন, তার কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নেই। জীবন কিন্তু একটাই। আপনি ইচ্ছা করলেও এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসতে পারবেন না। সুতরাং এই রমজানকে কাজে লাগান, জীবনকে পরিশুদ্ধ করুন এবং ¯্রষ্টার নির্দেশিত পথে জীবনকে পরিচালিত করুন। আপনার সন্তান এবং পরিবারের সবাইকে রমজানের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করুন। সত্য ও সুন্দরের পুজারি হিসেবে মানবজাতির প্রতি আমার বিনীত আবেদন, জীবনের মোহে আমরা যেন আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভুলে না যাই। আমরা যেন হীরাকে বাদ দিয়ে কাচকে সংরক্ষণ না করি। তাহলেই আমাদের জীবন সুন্দর এবং সার্থক হবে। আসুন সত্য ও সুন্দরের পথে নিরন্তর অভিযাত্রায় আমরা সবসময় অবিচল পথ চলি।

 লেখক : প্রকৌশলী ও কলামিস্ট
ড়সধৎথপঃম১২৩@ুধযড়ড়.পড়স



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আসুন


আরও
আরও পড়ুন